ওড়িশায় ট্রেন দুর্ঘটনা সিগন্যালের ইচ্ছাকৃত ভুলে!

আপডেট : ০৫ জুন ২০২৩, ০৬:১০ এএম

ভারতের ওড়িশায় গত শুক্রবার সন্ধ্যায় ঘটা ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনাটি ভুল সিগন্যালের কারণে হয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির রেলমন্ত্রী অশ্বিনি বৈষ্ণব। গতকাল রবিবার দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘দুর্ঘটনার আসল কারণ চিহ্নিত করা গেছে। আমি বিস্তারিততে যাব না। তদন্ত প্রতিবেদন আসুক। আমি শুধু বলব আসল কারণ এবং কারা দায়ী সেটি চিহ্নিত হয়েছে। ইলেকট্রনিক ইন্টারলকিং পদ্ধতিতে পরিবর্তন করে যে ভুল সিগন্যাল দেওয়া হয়েছিল সেই কারণে এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে।’

ইলেকট্রনিক ইন্টারলকিং ব্যবস্থায় রেললাইনে ট্রেনের অবস্থান দেখা যায় এবং গতিমুখ নিয়ন্ত্রণের সিগন্যাল দেওয়া হয়। ওড়িশা ট্রেন দুর্ঘটনার প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন বলছে, করমণ্ডল এক্সপ্রেসকে ‘আপ মেইন লাইনে’ সবুজ সিগন্যাল দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু ট্রেনটি সে লাইনে ঢোকেনি। ঢুকেছিল লুপ লাইনে। সেখানে আগে থেকে একটি মালগাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল। তার সঙ্গে সংঘর্ষে করমণ্ডল এক্সপ্রেস লাইনচ্যুত হয়। এর মধ্যেই আবার ডাউন লাইন দিয়ে বালেশ্বরের দিকে যাচ্ছিল বেঙ্গালুরু-হাওড়া সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস। করমণ্ডলের লাইনচ্যুত বগিতে ধাক্কা খেয়ে সেই ট্রেনেরও দুটি বগি লাইনচ্যুত হয়।’ 

কিন্তু মেইন লাইনে সবুজ সিগন্যাল পাওয়া সত্ত্বেও করমণ্ডল এক্সপ্রেস কী করে লুপ লাইনে ঢুকে পড়ল, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বেশ কয়েকটি ভারতীয় গণমাধ্যম রেলের সূত্রের বরাত দিয়ে বলছে, প্রথমে মেইন লাইনে সবুজ সিগন্যাল দেওয়া হলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই তা তুলে নেওয়া হয়, যে কারণে চালক লুপে ঢুকে পড়েছিলেন। স্টেশনগুলোতে লুপ লাইন রাখা হয়, সাধারণত কোনো ট্রেন যেন সেখানে দাঁড়াতে পারে এবং অন্য ট্রেনের জন্য লাইন ছেড়ে দিতে পারে।

রেলমন্ত্রীও রবিবার এই সিগন্যালের বিষয়টিকে প্রধান কারণ জানিয়ে বার্তা সংস্থা এএনআইকে বলেন, ‘দুর্ঘটনার কারণ পয়েন্ট মেশিন, ইলেকট্রনিক ইন্টারলকিং। যে পরিবর্তন ইলেকট্রনিক ইন্টারলিংকের সময় হয়েছিল, সে কারণেই দুর্ঘটনা ঘটেছে। কে সিগন্যাল দিয়ে আবার বন্ধ করে দিয়েছে এবং এটির পেছনের কারণ কী সেটি তদন্তের পর বেরিয়ে আসবে।’

ভারতীয় রেলওয়ে বোর্ডও বিবিসিকে জানায়, দুর্ঘটনার কারণ সংকেতের ব্যর্থতা নয় বরং সংকেত সংশ্লিষ্ট হস্তক্ষেপ বলে ধারণা করা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘রেলের প্রাথমিক রিপোর্টে গত শনিবারই বলা হয়েছিল, ঘটনাস্থলের ১৭এ পয়েন্টটি লুপ লাইনে ঘোরানো ছিল। ফলে করমণ্ডল ঢুকে পড়ে লুপ লাইনে। একই সঙ্গে ওই রিপোর্টের অন্য একটি অংশে বলা হয়েছে, ‘প্যানেল’-এ (যেখান থেকে স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা হয়, এবং যার রেকর্ড থেকে যায়) কোনো ত্রুটি ধরা পড়েনি। প্যানেল দেখে পরিদর্শক কমিটির সদস্যদের মনে হয়েছে, সিগন্যাল ঠিকভাবে দেওয়া হয়েছিল দুটি ট্রেনের জন্যই। প্যানেলে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, করমণ্ডলের সিগন্যাল বা পয়েন্ট কোনোভাবেই আপ লুপ লাইনে ঘোরানো ছিল না। বরং তা সোজা চেন্নাই যাওয়ার জন্য সঠিকভাবে দেওয়া হয়েছিল। দায়িত্বপ্রাপ্তদের তরফে কোথাও যে একটা গাফিলতি কিংবা গরমিল ছিল, তার ইঙ্গিত ছিল শনিবারের রিপোর্ট এবং প্যানেলেই। রবিবার রেলমন্ত্রীও দুর্ঘটনার জন্য কার্যত মানুষের হাতই রয়েছে বলে জানিয়ে দিলেন।’

গত শুক্রবার রাতে দুর্ঘটনা ঘটার পর আহত ও নিহতদের উদ্ধারে ১৮ ঘণ্টা উদ্ধার অভিযান চলে। উদ্ধার অভিযান শেষ ঘোষণা করা হয়েছে। এখন রেললাইন মেরামত ও ক্ষতিগ্রস্ত বগিগুলো সরানোর কাজ চলছে। আগামী বুধবার নাগাদ এই রুটে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানায় ভারতের রেল কর্র্তৃপক্ষ।  

এদিকে তিন ট্রেনের সংঘর্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে ২৭৫ জন নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছে ভারত। যদিও গত শনিবার বলা হয়েছিল, এ ঘটনায় ২৮৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে মৃতদেহ পুনর্গণনা শেষে সংখ্যাটি কমানো হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত