জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) আবাসিক হল থেকে অছাত্রদের বের করাসহ তিন দফা দাবিতে অনশন কর্মসূচিতে বসা ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষার্থী সামিউল ইসলাম প্রত্যয়সহ তাকে সমর্থন দেওয়া অন্য শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা হয়েছে। গত মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মশাররফ হোসেন হলের সামনে এ ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত পাঁচজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। আরও তিন নারী শিক্ষার্থী লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। ওই হামলার সময় ক্যাম্পাসে লোডশেডিং চলছিল।
হামলা ও লাঞ্ছনার শিকার হওয়াদের অভিযোগ, মীর মশাররফ হোসেন হল ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী হামলায় অংশ নেয়। প্রত্যয়ের দাবির সঙ্গে সংহতি জানানো প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের ওপরও হামলা চালানো হয়।
হামলার শিকার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ৪৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থী তাপসী রাবেয়া বলেন, ‘সামিউলের দাবির সঙ্গে সংহতি জানিয়ে আমরা সেখানে অবস্থান করি। যখন রাতে বিদ্যুৎ চলে যায়, তখন আমাদের ওপর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হামলা চালায়। আমরা যারা নারী শিক্ষার্থী ছিলাম, তাদের গালাগাল করা হয়। অনশনকারী শিক্ষার্থীকে জোর করে অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়, এরপর আবার সেই অ্যাম্বুলেন্স ভাঙচুরও করা হয়।’
তবে হামলায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের জড়িত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি আকতারুজ্জামান সোহেল। তিনি বলেন, ‘হামলায় যদি কোনোভাবে ছাত্রলীগের কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়, তবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
হল থেকে অছাত্রদের বের করাসহ তিন দাবিতে গত বুধবার (৩১ মে) রাত থেকে মীর মশাররফ হোসেন হলের সামনে অনশনে বসেছিলেন প্রত্যয়। তিনি ওই হলটির আবাসিক শিক্ষার্থী। হামলার সময় প্রত্যয়কে মারধরের পর অ্যাম্বুলেন্সে করে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যায় হামলাকারীরা। প্রত্যয়ের অন্য দাবিগুলো হলোÑ বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল থেকে গণরুম বিলুপ্ত করা ও হলের মিনি গণরুমে অবস্থান করা বৈধ ছাত্রদের আসন নিশ্চিত করা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে মীর মশাররফ হোসেন হল থেকে ছাত্রলীগের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী বের হয়ে আসেন। তারা অনশনরত শিক্ষার্থীকে গালাগাল করার পাশাপাশি মারধর শুরু করেন। একপর্যায়ে তার বিছানা-বালিশে আগুন লাগানোর চেষ্টা করে। এরপর অনশনরত প্রত্যয়কে জোর করে অ্যাম্বুলেন্সে উঠিয়ে চিকিৎসা কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। তখন বাধা দিতে গেলে জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি সৌমিক বাগচীকে মারধর করা হয়। এ ছাড়া মাশিয়াত সৃষ্টি, মনিকা নকরেক এবং শারমিন সুর নামে তিন নারী শিক্ষার্থীকেও হেনস্তা করা হয়।
হামলার প্রতিবাদে ওইদিনই রাত ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা। তারা জাবি উপাচার্য অধ্যাপক মো. নূরুল আলমের বাসভবনের সামনে গিয়ে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন। সেখানে পাঁচ দফা দাবি জানান বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবিগুলো হলো মীর মশাররফ হোসেন হলে আসন দখল করে থাকা সাবেক ছাত্রদের রাতের মধ্যে হল ত্যাগ করতে বাধ্য করা, উপাচার্যকে বাদী হয়ে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে মামলা, প্রক্টর ও প্রাধ্যক্ষকে অব্যাহতি, গণরুম ও গেস্টরুম সংস্কৃতির অবসান ঘটানো এবং প্রথমবর্ষ থেকেই প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য হলে আসনের ব্যবস্থা করা। এসব দাবি পূরণে রাত ২টার দিকে উপাচার্যের আশ্বাসে বিক্ষোভ তুলে নেন শিক্ষার্থীরা।
এদিকে গতকাল বুধবার বেলা ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে শৃঙ্খলা কমিটির জরুরি সভা হয়। সেখানে হামলায় জড়িত দুই শিক্ষার্থীকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয় এবং বাকিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এসব সিদ্ধান্ত জানানোর জন্য বেলা ৩টায় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা। এ সময় উপাচার্য আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়েন। দাবি পূরণের জন্য আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের কাছে সাত দিন সময় চাওয়া হয়। তবে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে এক ঘণ্টা সময় দেন। এ সময়ের মধ্যে দাবি না মানলে প্রশাসনিক ভবন অবরোধ করার ঘোষণা দেন তারা। কিছুক্ষণ পরেই বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রশাসনিক ভবনের ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন শিক্ষার্থীরা। তবে পেছনের দরজা দিয়ে উপাচার্য অধ্যাপক মো. নূরুল আলম অন্য শিক্ষকদের নিয়ে বের হয়ে যান।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আ স ম ফিরোজ-উল-হাসান বলেন, ‘ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে আন্দোলনকারীদের কাছে সাত দিন সময় চেয়েছি, কিন্তু তারা এ সময় দিতে নারাজ। শৃঙ্খলা কমিটিতে আলোচনা হয়েছে। দুজন সাবেক শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে।’
তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এ সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। তারা আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গড়িমসি করছে প্রশাসন।
