বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারিতে আলোচিত ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুসহ ১৪৭ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সবমিলিয়ে ৫৯টি মামলায় বাচ্চুসহ ব্যাংকের কর্মকর্তা ৪৬ জন ও ১০১ জন গ্রাহককে আসামি করা হয়েছে। চার্জশিটে ২ হাজার ২৬৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। গতকাল সোমবার দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে এসব চার্জশিট অনুমোদন দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন কমিশনের সচিব মো. মাহবুব হোসেন।
তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে বেসিক ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে ২ হাজার ২৬৫ কোটি ৬৮ লাখ ১৪৫ টাকা আত্মসাতে ৫৯টি মামলা হয়। পাঁচজন কর্মকর্তার তদন্ত শেষে, হাজার কোটি টাকার এই ঋণ জালিয়াতি ও আত্মসাতের ঘটনায় ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যানসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, বিভিন্ন কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানের মালিকদের যোগসাজশ, ক্ষমতার অপব্যবহার করে লাভবান হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।’
২০০৯ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংকের গুলশান, দিলকুশা ও শান্তিনগর শাখা থেকে মোট সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার ঋণ অনিয়মের মাধ্যমে বিতরণের অভিযোগ ওঠে। যার অনুসন্ধানে নামে দুদক। ঋণপত্র যাচাই না করে জামানত ছাড়া জাল দলিলে ভুয়া ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ঋণদানসহ নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে বিধিবহির্ভূতভাবে ঋণ অনুমোদনের অভিযোগ ওঠে ব্যাংকটির তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে।
পাঁচ বছর অনুসন্ধান শেষে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগে ২০১৫ সালের ২১, ২২ ও ২৩ সেপ্টেম্বর তিন দিনে টানা ৫৬টি মামলা হয়। রাজধানীর মতিঝিল, পল্টন ও গুলশান থানায় করা এসব মামলায় আসামি করা হয় ১২০ জনকে। এর মধ্যে ঋণগ্রহীতা ৮২, ব্যাংকার ২৭ ও ভূমি জরিপকারী রয়েছেন ১১ জন। অনিয়মের মাধ্যমে ২ হাজার ৬৫ কোটি টাকার ঋণ দেওয়া হয় বলে এসব মামলায় অভিযোগ করা হয়। এর মধ্যে গুলশান শাখা থেকে ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা, শান্তিনগর শাখা থেকে ৩৮৭ কোটি টাকা, প্রধান শাখা থেকে প্রায় ২৪৮ কোটি টাকা ও দিলকুশা শাখা থেকে ১৩০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়। অভিযোগের বাকি অংশের অনুসন্ধান এখনো চলমান। এ ছাড়া বেসিক ব্যাংক সংক্রান্ত বিষয়ে আরও আলাদা চারটি মামলা করে দুদক।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, আবদুল হাই বাচ্চু ২০০৯ সালে চেয়ারম্যান হওয়ার পর থেকে ২০১৩ সালের মার্চ পর্যন্ত বেসিক ব্যাংক ৬ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকার ঋণ দেয়। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকাই নিয়ম ভেঙে দেওয়ার বিষয়টি ধরা পড়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধানে। ফলে ২০১৪ সালে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে অপসারণ করা হয়। ওই বছরের ২৯ মে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কিছুদিন পর ৪ জুলাই শেখ আবদুল হাই বাচ্চু পদত্যাগপত্র জমা দেন। ঋণ কেলেঙ্কারিতে ডুবতে বসা বেসিক ব্যাংকের ২০২১ সালের আর্থিক প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ আবদুল হাই বাচ্চুর দায়িত্বকালটা স্বস্তির ছিল না। অনিয়মের বিষয়ে তদন্ত শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অনিয়মের অভিযোগে দুদক ২০১৫ সালে ৫৯টি মামলা করে। তবে এত বছরে একটি মামলায়ও দুদক অভিযোগপত্র জমা দিতে পারেনি। দুদকের এই ব্যর্থতায় গত বছর ২৮ নভেম্বর হতাশা প্রকাশ করে উচ্চ আদালত। বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি খিজির হায়াত লিজুর হাইকোর্ট বেঞ্চ হতাশা প্রকাশ করে। বেঞ্চ বলে, ‘কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। কিন্তু, দুদক এবং এত বিচারক ও আইনজীবী থাকা সত্ত্বেও কোনো কাজ হচ্ছে না। তারা (দুদক) নীরব কেন? এটা অনেকটা নাটকের মতো। আমরা নাটক দেখছি। এটা মেনে নেওয়া যায় না।’ তখন তদন্ত শেষ করতে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) তিন মাসের সময় বেঁধে দিয়েছিল হাইকোর্ট। এই সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করে বিচারিক আদালতে জমা দেওয়ার আদেশ দেওয়া হয় কমিশনকে। জাতীয় পার্টির সাবেক সংসদ সদস্য বাচ্চুকে ২০০৯ সালে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০১২ সালে তার নিয়োগ নবায়নও হয়। ঋণ কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠলে ২০১৪ সালে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী ফখরুল ইসলামকে অপসারণের পর চাপের মুখে থাকা বাচ্চু পদত্যাগ করেন।
