বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হয়েছে। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছেন তিনি। গত সোমবার মধ্যরাতে বুকে হঠাৎ তীব্র ব্যথা অনুভব করলে তার ছোট ভাই শামীম এস্কান্দার ও ব্যক্তিগত চিকিৎসকরা দ্রুত গুলশানের বাসভবন ফিরোজায় ছুটে যান।
চিকিৎসকদের পরামর্শে গভীর রাতে খালেদা জিয়াকে রাজধানীর বসুন্ধরার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দুই-এক দিনের মধ্যে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠাতে আবেদন করবেন স্বজনরা। পরিবারের সদস্যরা আশা করছেন, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে দ্রুত তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর সুযোগ দেবে সরকার।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চেয়ারপারসনের শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হয়েছে। তার চিকিৎসায় এভারকেয়ার হাসপাতাল গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা একাধিকবার তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠাতে বলেছেন। চিকিৎসকদের পরামর্শে চিকিৎসাপত্রসহ খালেদা জিয়াকে বিদেশে নিতে সরকারের কাছে আবেদন করা হয়েছে। আমরা বারবার সরকারকে অনুরোধ করেছি তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে অনুমতি দেওয়ার জন্য। কিন্তু সরকার শুনছে না।’
তিনি বলেন, ‘চেয়ারপারসনের শারীরিক অবস্থা ভালো নয়। কিছু হয়ে গেলে সব দায় সরকারকে নিতে হবে। তাই আবারও সরকারের কাছে অনুরোধ, অবিলম্বে খালেদা জিয়াকে বিদেশে যেতে অনুমতি দিন। তাকে সুস্থভাবে বাঁচার সুযোগ করে দিন। প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে সরে আসুন। জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাবেন না।’
মির্জা ফখরুল দাবি করে বলেন, ‘সরকার খালেদা জিয়াকে আটক করে রেখেছে। মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে তাকে কারাগারে রাখা হয়েছিল। এখন বাসায় এনে তাকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছে।
সোমবার রাত ৩টায় তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন।’
খালেদা জিয়ার মেজো বোন সেলিমা ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তার হার্টে কয়েকটি ব্লক রয়েছে। লিভার সিরোসিসেও ভুগছেন। সোমবার সারা দিন তিনি প্রচ- ব্যথা অনুভব করেছেন। গভীর রাতে ব্যথা বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসকরা তাকে হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। রাত দেড়টার দিকে তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকরা তাকে পর্যবেক্ষণে রেখেছেন।’
তিনি বলেন, ‘সরকার খালেদা জিয়ার সাজা স্থগিত করার পর ছয় মাস অন্তর তার মুক্তির মেয়াদ বাড়াতে আমরা আবেদন করেছি। প্রতিবারই চিকিৎসকদের পরামর্শ মোতাবেক তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার অনুমতি দেওয়ার জন্য সরকারকে অনুরোধ করেছি। সরকার আমাদের কথার গুরুত্ব দেয়নি। এখন তার কিছু হয়ে গেলে সব দায় সরকারকে নিতে হবে। দুই-এক দিনের মধ্যে আবার আবেদন করব। আশা করছি সরকার দ্রুত তাকে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেবে।’
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপি নেতারা বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে বৈঠকে খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠাতে সরকারকে অনুরোধ জানাতে বলেছেন। চেয়ারপারসনের স্বজনরা দুই-এক দিনের মধ্যে সরকারের কাছে আবেদন করবেন। সরকার এবার খালেদা জিয়াকে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেবে বলে আমরা আশা করি।’
গত ২৪ মার্চ খালেদা জিয়ার মুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার শেষ দিন ছিল। ৬ মার্চ তার পরিবারের পক্ষ থেকে সপ্তমবারের মতো মুক্তি এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়ার অনুমতি চেয়ে আবেদন করা হয়। এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির মেয়াদ আরও ছয় মাস বাড়ানো হয়েছে। তবে আগের শর্ত অনুযায়ী তিনি ঢাকার নিজ বাসায় থেকে চিকিৎসা নেবেন এবং এ সময়ে দেশের বাইরে যেতে পারবেন না।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার যে আইনে চেয়ারপারসনকে মুক্তি দিয়েছে, সে আইনেই তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর সুযোগ রয়েছে। বিষয়টি আমরা তুলে ধরেছি। কিন্তু সরকার সংবিধান অনুযায়ী না চলে নিজেদের আইন অনুযায়ী চলছে।’
গত সোমবার গভীর রাতে খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে নেওয়ার পর গতকাল মঙ্গলবার তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও দলের ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন আমাদের চেয়ারপারসন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গঠিত মেডিকেল বোর্ডের তত্ত্বাবধানে তার চিকিৎসা চলছে। এভারকেয়ার হাসপাতালের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সাহাবুদ্দিন তালুকদারের নেতৃত্বে গঠিত মেডিকেল বোর্ড তার কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।’
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলায় দন্ডিত হয়ে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি কারাগারে গিয়েছিলেন। দেশে করোনা মহামারী শুরুর পর পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২০ সালের ২৫ মার্চ তাকে নির্বাহী আদেশে ছয় মাসের জন্য ‘সাময়িক মুক্তি’ দেয় সরকার। এরপর তার দন্ডাদেশ স্থগিতের মেয়াদ সপ্তমবারের মতো বাড়ানো হয়েছে।
