ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ চান চামড়া শিল্পোদ্যোক্তারা

আপডেট : ১৯ জুন ২০২৩, ১১:৫০ পিএম

চামড়া শিল্প অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবে খাতটিতে প্রচুর সম্ভাবনাও রয়েছে। বর্তমানে এ খাতে প্রায় ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এ খাতের কর্মসংস্থান ৩০-৩৫ লাখে উন্নীত করা সম্ভব। কিন্তু দেশি ও ভূ-রাজনৈতিক বিভিন্ন কারণে এ শিল্পের উন্নয়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। চামড়া শিল্পের বিকাশ করতে হলে এ খাতকে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে হবে সরকারকে। পাশাপাশি চামড়া ব্যবসায়ী, ট্যানারি মালিক ও চামড়া শিল্পসংশ্লিষ্ট সবাইকে যৌথভাবে কাজ করতে হবে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ট‍্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ)।

গতকাল সোমবার রাজধানীর পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) মিলনায়তনে ‘চামড়া খাতের টেকসই উন্নয়নে করণীয়’ সেমিনারে এসব কথা বলেন বিটিএ নেতারা। ইআরএফ ও বিটিএ আয়োজিত সেমিনারের সার্বিক সহযোগিতা করে দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশন।

এ সময় বিটিএ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহীন আহমেদ বলেন, ২০১৭ সাল পর্যন্ত আমরা বিশে^র নামি ব্র্যান্ডগুলোর কাছে আমাদের চামড়া রপ্তানি করতে পারতাম। কিন্তু এলডব্লিউজি সনদ না থাকায় আমরা এখন দামি ব্র্যান্ডগুলোর কাছে চামড়া বিক্রি করতে পারছি না। এজন্য চীনের ব্যবসায়ীদের কাছে অর্ধেক দামে চামড়া বিক্রি করতে হচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে খুচরা চামড়া বাজারে। চামড়া থেকে আমাদের রপ্তানি প্রায় ১৫ কোটি ডলার। অথচ ২০১৬-১৭ সালে আমরা ২৩-২৪ কোটি ডলারের চামড়া রপ্তানি করতাম। অর্থাৎ আমাদের চামড়া রপ্তানি অনেকাংশেই কমেছে।

তিনি বলেন, ট্যানারির মালিকরা এখন টিকে থাকার জন্য ব্যবসা করছে। বর্তমানে প্রায় ৭০-৭৫ শতাংশ ট্যানারি খেলাপি। আমাদের হাত-পা বেঁধে সাঁতার কাটতে বলা হচ্ছে। হাজারীবাগে আমাদের ১০০ একর জমিতে কোনো ধরনের উন্নয়নকাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না। আমাদের বলা হলো, সাভারে পরিবেশবান্ধব চামড়া শিল্প করা হবে। প্রথমে বলা হলো, সেখানে প্লট ২০০ টাকা স্কয়ার ফিট। কিন্তু সেই জায়গা এখন নেওয়া হচ্ছে ৫০০ টাকা স্কয়ার ফিট। সে সময় বলা হয়েছিল, ট্যানারির বর্জ্য দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে সেই বিদ্যুৎ দিয়েই ট্যানারিগুলো চালানো হবে। এখন তার কোনো কিছুই দেখছি না। এসব জটিলতার কারণে আমাদের ব্যবসা করাই এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেহেতু আমরা ৮-১০ হাজার কোটি টাকা সেখানে বিনিয়োগ করেছি, তাই সেখানে থেকে আমাদের পেছানোরও কোনো সুযোগ নেই।

শাহীন আহমেদ বলেন, আসছে ঈদে ৮৫ লাখ (৪০ লাখ গরু ও ৪৫ ছাগল) পশু কোরবানি হতে পারে। এখানে পশু কেনাবেচা হতে পারে ৫০ থেকে ৫৫ হাজার কোটি টাকা। গরুর আনুমানিক বাজার মূল্য ১ লাখ টাকা এবং চামড়ার আনুমানিক সাইজ ২২ বর্গফুট। এমন কোরবানির লবণবিহীন কাঁচা চামড়া কেনার মূল্য ৮৫০ টাকা। অন্যান্য প্রসেসিংয়ে ব্যয় হয় ১ হাজার ৯০০ টাকা। একটি পাকা চামড়ার মূল্য হয় ২ হাজার ৭৫০ টাকা। স্থানীয় বাজারে বা বিদেশি রপ্তানিযোগ্য ১০ জোড়া উন্নত মানের জুতা আনুমানিক মূল্য ৫০ হাজার টাকা বিক্রি করা সম্ভব।

বিটিএ চেয়ারম্যান বলেন, চামড়া খাত অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। এরপরও শিল্প খাতে চামড়ার অবদান ২ শতাংশ। এ ছাড়া রপ্তানি আয়ের ৩ দশমিক ৮ শতাংশ আসে চামড়া শিল্প থেকে। অন্যদিকে জিডিপিতে এ শিল্পের অবদান দশমিক ৬০ শতাংশ। বিশ্বে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের বাজারের প্রায় ৩ শতাংশ বাংলাদেশের দখলে। এর মধ্যে ২ শতাংশ গরু ও ৪ শতাংশ ছাগল। ২০৩০ সাল নাগাদ ১২ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া মূল্য সংযোজন ৮০ শতাংশের বেশি হবে। জিডিপিতে চামড়া খাতের অবদান বাড়বে। প্রায় ৩৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে ও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পাবে।

বিটিএর উপদেষ্টা ও মার্সনস ট্যানারি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরিকুল ইসলাম খান বলেন, দূষণ থেকে বাঁচতে হাজারীবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তর করা হয় চামড়া শিল্পনগরী। কিন্তু সেখানেও পরিবেশ সম্মত উপায়ে হচ্ছে না চামড়া প্রক্রিয়াকরণ। এখন কার্যকর হয়নি সিইটিপি বা পানি শোধনাগার। হচ্ছে না পরিবেশ সম্মত বর্জ্য নিষ্কাশনও।

তিনি আরও বলেন, পরিবেশ সম্মত উৎপাদন ব্যবস্থা না থাকায় রপ্তানির বাজার সংকুচিত হচ্ছে। স্বাস্থ্যসম্মত উৎপাদন না থাকায় পাওয়া যাচ্ছে না এলডব্লিউজি এবং আইএসও সনদ। চামড়া খাতের এ সংকটের জন্য দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা দরকার। চামড়া প্রক্রিয়াকরণে পানির ব্যবহার কমানো দরকার।

সেমিনারে জানানো হয়, কোরবানির ঈদেই সংগ্রহ হয় মোট চাহিদার ৫০ ভাগ চামড়া। তাই চামড়ার সঠিক সংরক্ষণ করা দরকার। এ ক্ষেত্রে পশু কোরবানির পর দ্রুত সময়ের মধ্যে চামড়ায় লবণ দেওয়ার বিকল্প নেই।

সেমিনারে স্বাগত ও উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ কাজী ফয়সাল বিন সিরাজ। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিটিএ চেয়ারম্যান মো. শাহীন আহমেদ এবং বিটিএর হেড অব প্রজেক্টস অ্যান্ড প্রোগ্রাম রেহানা আক্তার রুমা। এ ছাড়া প্যানেল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফেরদৌস আরা বেগম, মার্সনস ট্যানারি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরিকুল ইসলাম খান, ট্যানারি শ্রমিক ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট আবুল কালাম আজাদ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত