আমদানিকৃত জ্বালানি তেল দ্রুত ও নিরাপদে গভীর সমুদ্র থেকে খালাস করতে ‘ইনস্টলেশন অব সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) উইথ ডাবল পাইপলাইন’ প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষে এর যন্ত্রপাতির প্রি-কমিশনিং শুরু হয়েছে। পাইপলাইনে ক্রুড অয়েল সরবরাহের মাধ্যমে আগামী ২৫ জুন থেকে শুরু হবে মূল কমিশনিং। সবকিছু ঠিক থাকলে জুলাইয়ের শেষে অথবা আগস্টের শুরুতে দেশে প্রথমবারের মতো অত্যাধুনিক এই প্রকল্পের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এটি চালুর পর বছরে অন্তত ৮শ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
দেশে ক্রমবর্ধমান জ্বালানি তেলের চাহিদা পূরণ করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও চীন সরকারের মধ্যে জি-টু-জি ভিত্তিতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) পক্ষে এর অধীনস্ত কোম্পানি ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। এতে ইপিসি ঠিকাদার হিসেবে কাজ করছে চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড (সিপিপিইসি)।
ইআরএল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ লোকমান দেশ রূপান্তরকে জানান, ‘প্রকল্পটি দেশের জন্য বড় মাইলস্টোন যা জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। গত সপ্তাহে পাইপলাইন নির্মাণসহ সব কাজ শেষে এখন প্রি-কমিশনিংয়ের কাজ চলছে। আগামী ২৫ জুন থেকে পাইপলাইনে ৮৫ হাজার টন ক্রুড অয়েল (অপরিশোধিত জ্বালানি তেল) সরবরাহের মাধ্যমে মূল কমিশনিং কাজ শুরু হবে। সব কিছু ঠিক থাকলে জুলাইয়ের মধ্যে এই কাজ শেষে একই মাসের শেষ দিকে অথবা আগস্টের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই প্রকল্পের উদ্বোধন করবেন বলে আশা করছি।’
‘দ্রুত, সাশ্রয়ে ও নিরাপদে গভীর সমুদ্রে জাহাজ থেকে সরাসরি তেল খালাসের পাশাপাশি এই প্রকল্পের মাধ্যমে ১ লাখ ২৫ হাজার টন ক্রুড অয়েল এবং ৭৫ হাজার টন ডিজেলসহ অতিরিক্ত মোট ২ লাখ টন জ্বালানি মজুদ করার সক্ষমতা বাড়বে। সর্বোপরি জ্বালানি তেল ব্যবস্থাপনা টেকসই করতে এসপিএম কার্যকরী অবদান রাখবে’ যোগ করেন তিনি। এসপিএম প্রকল্পের কমিশনিংয়ের লক্ষ্যে সম্প্রতি জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ খায়েরুজ্জামান মজুমদারের সভাপতিত্বে সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। কাজটি সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য বিপিসির একজন পরিচালককে আহ্বায়ক করে বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে ৮ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।
বৈঠক সূত্র জানায়, কমিশনিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ক্রুড অয়েল, তিনটি টাগবোট, একটি স্পিডবোট ও তেল ছড়িয়ে পড়া রোধে অয়েল বুম এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক সুবিধার প্রয়োজন পড়বে। টাগবোটের সাহায্যে আমদানিকৃত তেলের ট্যাংকার যুক্ত করা হবে এসপিএম-এর সঙ্গে। আর এ কাজের জন্য জনবল আনা-নেওয়া করতে প্রয়োজন পড়বে স্পিডবোট। এক্ষেত্রে বিপিসি ক্রুড অয়েল সরবরাহ করবে। পেট্রোবাংলা, রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ টাগবোট, স্পিডবোট ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি সরবরাহসহ প্রয়োজনীয় সুবিধা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।
বর্তমানে আমদানিকৃত প্রতি লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে করে রিফাইনারি ট্যাংকে পৌঁছাতে সময় লাগে ১২ থেকে ১৩ দিন। সমুদ্র উত্তাল হলে কিংবা অন্য কারণে এই তেল খালাস করতে আরও বেশি সময় লাগে। এসপিএম চালু হলে সমপরিমাণ তেল পরিবহনে সময় লাগবে মাত্র ৪৮ ঘণ্টা। একইভাবে প্রতি ৭০ হাজার টন ডিজেল আনলোড করতে মাত্র ২৮ ঘণ্টা সময় লাগবে। এতে ব্যয় সাশ্রয়ের পাশাপাশি সিস্টেমলস কমবে। এসপিএমের মাধ্যমে বছরে মোট ৯০ লাখ টন জ্বালানি আনলোড করা যাবে।
দেশে ক্রমবর্ধমান জ্বালানি তেলের চাহিদাপূরণ ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০১৫ সালে নভেম্বরে প্রকল্পটি নেওয়া হয়। তিন বছরের মধ্যে এর কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নানা জটিলতায় কয়েক দফা প্রকল্প সংশোধনের পর মেয়াদও বাড়ানো হয়। আর ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকায়।
প্রকল্পের আওতায় কক্সবাজারের মহেশখালী দ্বীপের পশ্চিমে (বঙ্গোপসাগরে) একটি এসপিএম তথা ভাসমান জেটি স্থাপন করা হয়েছে। আমদানিকৃত তেল জাহাজ থেকে সরাসরি পাম্প করা হবে যা এসপিএম হয়ে অফশোর (সাগরের তলদেশে স্থাপিত) পাইপলাইনের মাধ্যমে মাতারবাড়ী এলটিই (ল্যান্ড টার্মিনাল ইন্ড) পর্যন্ত এবং সেখান থেকে অনশোর বা ভূমিতে স্থাপিত পাইপলাইনের মাধ্যমে মহেশখালী এলাকায় নির্মিত স্টোরেজ ট্যাংকে জমা হবে। এসপিএম থেকে ৩৬ ইঞ্চি ব্যাসের ২টি পৃথক পাইপলাইনের মাধ্যমে ক্রুড অয়েল এবং ডিজেল আনলোডিং করা হবে। স্টোরেজ ট্যাংক থেকে পাম্পিংয়ের মাধ্যমে তেল প্রথমে অনশোর ও পরবর্তী সময়ে অফশোর পাইপলাইনের মাধ্যমে চট্টগ্রামে অবস্থিত গহিরা এলটিই পর্যন্ত এসে পুনরায় অনশোর পাইপলাইনের মাধ্যমে কোরিয়ান ইপিজেড (কেইপিজেড) এর ভেতর দিয়ে ডাংগারচর পর্যন্ত এসে কর্ণফুলী নদী এইচডিডির মাধ্যমে ক্রস করে পদ্মা অয়েল কোম্পানির ভেতর দিয়ে ইআরএল-এ পাঠানো হবে।
কর্মকর্তা জানান, প্রকল্পের আওতায় ২২০ কিলোমিটার পাইপলাইনের পাশাপাশি ৯০ একর জায়গাজুড়ে তেল মজুদের জন্য ছয়টি স্টোরেজ ট্যাংক নির্মাণ করা হয়েছে। এরমধ্যে ৩টি ক্রুড অয়েল এবং তিনটি ডিজেল ট্যাংক।
বর্তমানে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি বছরে ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত জ¦ালানি তেল পরিশোধন করতে পারে। প্রতিষ্ঠানটি দ্বিতীয় ইউনিট চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। যার মাধ্যমে এই সক্ষমতা ৪৫ লাখ টনে পৌঁছাবে। বর্তমানে দেশে প্রতি বছর প্রায় ৫০ লাখ টন জ¦ালানি আমদানি করা হয়। দ্বিতীয় ইউনিটের ‘ব্যাংকওয়ার্ড লিংকেজ’ হিসেবে কাজ করবে এসপিএম। এর ফলে জ্বালানি তেল সরবরাহে আরেক ধাপ অগ্রগতি হবে।