চামড়ার রপ্তানি আয়ে অস্থিরতা

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০২৩, ১১:০৯ পিএম

কোরবানির সময়ে প্রায় বিনে পয়সায় পাওয়া চামড়া দিয়ে বছরে বিলিয়ন ডলারের বেশি বিদেশি মুদ্রা আয় করে বাংলাদেশ। তবে এ আয়ের কোনো ধারাবাহিকতা নেই। এক বছর প্রবৃদ্ধি হলে পরের বছরই তা ঋণাত্মক ধারায় নামে। মূলত চামড়া শিল্পনগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতাসহ অভ্যন্তরীণ নানা সমস্যা ও ভূরাজনৈতিক কারণে এ খাতটির রপ্তানি আয়ে অস্থিরতা দেখা দেয়। যদিও তৈরি পোশাকের পর সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে চামড়া খাতকে।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১৮ সাল থেকে টানা দুই অর্থবছরের ঋণাত্মক ধারার পর করোনায় প্রাণ ফিরে পায় চামড়া খাত। এতে করে ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ অর্থবছরে ভালো প্রবৃদ্ধি অর্জন করে চামড়া খাত। তবে সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে অন্য অনেক খাতের মতো চামড়াও প্রবৃদ্ধি হারিয়ে লক্ষ্যমাত্রা থেকে দূরে চলে গেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিদেশে প্রক্রিয়াজাত চামড়া রপ্তানি কমেছে ১৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। পাশাপাশি চামড়ার তৈরি জুতা রপ্তানি কমেছে ৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, হাজারীবাগ থেকে সাভারে চামড়া শিল্প স্থানান্তরের পর থেকেই খাতটির বিকাশ থমকে গেছে। উল্টো সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন না হওয়ায় সেখানে স্থানান্তর হওয়া ট্যানারি শিল্পগুলো ফিনিশড চামড়া রপ্তানি করতে পারছে না। একসময় ইউরোপ বাংলাদেশের চামড়ার প্রধান বাজার হিসেবে থাকলেও কেন্দ্রীয় ইটিপি সম্পন্ন না হওয়ায় সেখানে রপ্তানি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়েই কমমূল্যে সেমি-ফিনিশড চামড়া চীনে রপ্তানি করতে হচ্ছে ট্যানারিগুলোকে। এতে করে চামড়ায় রপ্তানি আয় যেমন কমে গেছে, তেমনি চামড়াসংশ্লিষ্ট শিল্পগুলোও দুর্বল হয়ে পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে এ সম্ভাবনাময়ী খাতটি বাঁচাতে সরকারের বিশেষ নজরের দাবি ব্যবসায়ীদের।

ইপিবির তথ্য বলছে, সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে বিদেশে প্রক্রিয়াজাত চামড়া রপ্তানি হয়েছে ১২ কোটি ৩৪ লাখ ৩৭ হাজার ডলারের। আগের বছরের একই সময়ে এ রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১৫ কোটি ১৩ লাখ ৬৯ হাজার ডলার। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে বিদেশে প্রক্রিয়াজাত চামড়া রপ্তানি কমেছে ১৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। অথচ ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রক্রিয়াজাত চামড়া রপ্তানির প্রবৃদ্ধি ছিল ২৭ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ।

ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাভারের চামড়া শিল্পনগরী কমপ্লায়েন্সে না আসার অজুহাতে বায়াররা এখান থেকে চামড়া কিনছে না। শুধু চীনের কোম্পানিগুলো এখান থেকে কম দামে চামড়া নিচ্ছে। এখন চামড়া শিল্প চীননির্ভর হয়ে গেছে।

কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, সিইটিপি ও ডাম্পিং ইয়ার্ড নির্মাণসহ আরও কিছু টেকনিক্যাল কাজ পায় একটি চীনা প্রতিষ্ঠান। ২০১২ সালের মার্চে কোম্পানিকে ২৪ মাস সময় দিয়ে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু ২০২১ সাল পর্যন্ত তারা ওই কাজ সম্পন্ন করতে পারেনি। পরে প্রতিষ্ঠানটিকে জরিমানা করে তাদের থেকে দায়িত্ব বুঝে নেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত আর সিইটিপি ও ডাম্পিং ইয়ার্ড নির্মাণসহ অন্যান্য কাজ সম্পন্ন হয়নি। এ কারণে বিদেশি বড় বড় বায়ার আমাদের এখানে আসছে না। আমরা ভালো দামে চামড়া বিক্রি করতে পারছি না।

এদিকে সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে বিদেশে চামড়ার তৈরি জুতা রপ্তানিও কমেছে। এ সময় চামড়ার তৈরি জুতা রপ্তানি হয়েছে ৭০ কোটি ৩৮ লাখ ৮ হাজার ডলারের। আগের বছরের একই সময়ে এ রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৭৫ কোটি ৬১ লাখ ৪৮ হাজার ডলার। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে বিদেশে চামড়ার তৈরি জুতা রপ্তানি কমেছে ৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ। অথচ ২০২১-২২ অর্থবছরে এ খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩২ দশমিক ২৪ শতাংশ।

তবে বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়ার জুতা রপ্তানি কমলেও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি ১৭ দশমিক ৪০ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু এরপরও সামগ্রিকভাবে চামড়া, চামড়াজাত পণ্য ও চামড়ার তৈরি জুতার সামগ্রিক রপ্তানি ১ দশমিক ৭৪ শতাংশ কমেছে। যদিও আগের অর্থবছর এ খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩২ দশমিক ৯৮ শতাংশ।

কমপ্লায়েন্স চামড়া শিল্পনগরী গড়ে তুলতে ২০০৩ সালে প্রকল্প নেয় শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিসিক, যা ২০০৫ সালের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। শুরুতে ট্যানারি মালিকদের হাজারীবাগ ছেড়ে যাওয়ার অনীহা প্রকল্পে বাস্তবায়নে বিলম্ব ঘটায়। পরে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দেওয়া ও সরকারের কড়া নির্দেশনার কারণে মালিকরা ট্যানারি স্থানান্তরে রাজি হয়। উন্নত চামড়া শিল্প গঠনে শিল্প মন্ত্রণালয় প্রকল্পের আওতায় সিইটিপি স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ২০১০ সালে প্রকল্প সংশোধন করে। সে সময় সিইটিপি ও ডাম্পিং ইয়ার্ড নির্মাণসহ আরও কিছু টেকনিক্যাল কাজ পায় একটি চীনা প্রতিষ্ঠান। ২০১২ সালের মার্চে কোম্পানিকে ২৪ মাস সময় দিয়ে কার্যাদেশ দেওয়া হয়।

প্রকল্পের চতুর্থ সংশোধনীতে এসপিজিএস কম্পোনেন্টটি বাদ দিয়ে সময় জুন ২০২১ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। কিন্তু নিয়োজিত চীনা ঠিকাদার কোম্পানিটি সময়মতো কাজ সম্পন্ন করতে পারেনি। নানা অজুহাতে এ কোম্পানি সময় বাড়াতে থাকে। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষও কোম্পানিটির কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে। এরই মধ্যে শিল্পনগরীর কোনো সুবিধাই নিশ্চিত না করে ট্যানারিগুলোকে বারবার স্থানান্তরের সময়সীমা বেঁধে দিতে থাকে শিল্প মন্ত্রণালয়। তাতেও কাজ না হওয়ায় উচ্চ আদালত হাজারীবাগের কারখানাগুলোর গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার আদেশ দেওয়ার পর ২০১৭ সালের এপ্রিলে কারখানাগুলো একযাগে স্থানান্তরিত হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত