লালমনিরহাটে ১৩ স্কুল বন্ধ সিরাজগঞ্জে ভাঙন আতঙ্ক

আপডেট : ১৬ জুলাই ২০২৩, ০২:৩২ এএম

দেশের উত্তরাঞ্চলে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। সিরাজগঞ্জে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে শত শত মানুষ। দেখা দিয়েছে নদীভাঙন। কুড়িগ্রামে ধরলা ও দুধকুমারের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ৬০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এদিকে গাইবান্ধায় উজানের ঢল আর বর্ষণে ব্রহ্মপুত্র, ঘাঘট, তিস্তা, করতোয়াসহ সব নদ-নদীর পানি বাড়ছে। এ ছাড়া উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ, ইসলামপুর, মাদারগঞ্জ ও সরিষাবাড়ী উপজেলার যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :

সিরাজগঞ্জের ভাঙন আতঙ্ক : বন্যার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় সদর, কাজিপুর, শাহজাদপুর, বেলকুচি ও চৌহালী উপজেলার নিম্নাঞ্চলের অনেক স্থান নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে শত শত মানুষ। জেলার যমুনা, বড়াল, করতোয়া, হুরাসাগর ও ফুলজোড় নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় নদীপাড়ের মানুষ ভাঙন ও বন্যা আতঙ্কে রয়েছে। এ ছাড়া ব্রাহ্মণগ্রাম, আরকান্দি, জারালপুর যমুনা নদীর ভাঙন অব্যাহত থাকায় প্রতিদিনই অসহায় মানুষের বাড়িঘর নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। চৌহালী উপজেলার বিনানুই, সলিমাবাদ, ভূতের মোড়সহ বিভিন্ন স্থানে যমুনা নদীর ভাঙন অব্যাহত থাকায় ভাঙনকবলিত মানুষ অসহায় হয়ে পড়েছে। কাজিপুরে মেঘাই এলাকার মানুষের মধ্যে এখনো আতঙ্ক বিরাজ করছে। বেলকুচি উপজেলার বড়ধূল ইউনিয়নের ক্ষিদ্রচাপড়ী এলাকায় এখনো যমুনার ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। ফলে এসব এলাকার মানুষ চরম দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে।

সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী রনজিত কুমার সরকার জানান, গতকাল দুপুরে সিরাজগঞ্জ হার্ড পয়েন্টে যমুনা নদীর পানি ২৮ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে ১২ দশমিক ৬১ মিটারে দাঁড়িয়েছে। ফলে এ পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ২৯ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, বন্যাকবলিত এলাকার অসহায় মানুষের জন্য ৬৫০ টন চাল ও ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ পেয়েছি। এর মধ্যে ১০ টন চাল শাহজাদপুর উপজেলার ভাঙনকবলিত অসহায় মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। তালিকা তৈরি করছি। অচিরেই তালিকা অনুযায়ী বরাদ্দের সব চাল বিতরণ করা হবে।

লালমনিরহাটে ১৩ স্কুলে পাঠদান বন্ধ : উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে তিস্তার পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এতে প্লাবিত হয়েছে নিম্নাঞ্চল। ফলে পাঁচ উপজেলার তিস্তার তীরবর্তী লাখো মানুষ নির্ঘুম রাত পার করেছে। বন্যার পানির কারণে ১৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে আশ্রয়ণ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

গতকাল সকালে লালমনিরহাটের হাতিবান্ধায় অবস্থিত তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে সকাল ৬টায় পানিপ্রবাহ রেকর্ড করা হয় ৫২ দশমিক ৩৫ সেন্টিমিটার, যা বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এরপর থেকে সকাল ৯টায় ১২ সেন্টিমিটার এবং দুপুর ১২টায় তা আরও কমে ৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। বিকেল ৩টায় ব্যারাজ পয়েন্টে বিপদসীমার ৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।

তিস্তার পানিতে জেলার পাটগ্রামের দহগ্রাম, হাতীবান্ধার গড্ডিমারী, দোয়ানী, ছয়আনী, সানিয়াজান ইউনিয়নের নিজ শেখ সুন্দর, বাঘের চর, ফকিরপাড়া ইউপির রমনীগঞ্জসহ নিম্নাঞ্চলের বহু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। কয়েক হাজার একর আমন ধানের ক্ষেত ও বীজতলাসহ অনেক ফসলি জমি তিস্তার পানিতে ডুবে গেছে। ভেসে গেছে পুকুরের মাছ। ইতিমধ্যে চর এলাকাগুলোর যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে গেছে। এদিকে মহিষখোচা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে একটি বালুর বাঁধের কিছু অংশ ধসে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ভাঙন ঠেকাতে জিও ব্যাগ ফেলছে সেখানে। এ ছাড়া কিছু জায়গায় পানি কমতে শুরু করায় দেখা দিয়েছে ভাঙন।

এদিকে পানিবন্দি মানুষের মধ্যে আদিতমারী উপজেলা প্রশাসন মহিষখোচা ও দুর্গাপুর ইউনিয়নে পাঁচশ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করেছে। এ সময় আদিতমারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার জিআর সারোয়ার বলেন, উপজেলায় পানিবন্দি মানুষের জন্য ১১ টন চাল বরাদ্দ পাওয়া গেছে, যা বিতরণের জন্য ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের মাধ্যমে তালিকা তৈরির কাজ চলছে।

লালমনিরহাট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার স্বপন কুমার রায় বলেন, তিস্তা নদীর পানিতে লালমনিরহাট সদর উপজেলা ও আদিতমারী উপজেলার ১৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পানি প্রবেশ করেছে। এ কারণে সেগুলোর পাঠদান বন্ধ আছে। এই ১৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে আশ্রয়ণকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ উল্যাহ জানান, ইতিমধ্যে সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ ইউনিয়নের পানিবন্দি বন্যাদুর্গত মানুষদের মধ্যে শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। জেলার পাঁচ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তাদের বানভাসি মানুষের সার্বিক খোঁজখবর রাখতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বন্যার্তদের মধ্যে ১১০ টন চাল ও চার লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

কুড়িগ্রামে পানিবন্দি ৬০ হাজার মানুষ : বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে ধরলা ও দুধকুমারের পানি। এতে করে প্লাবিত হয়ে পড়েছে জেলার নিম্নাঞ্চলসহ চরাঞ্চলগুলো। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে অন্তত ৬০ হাজার মানুষ।

উলিপুর উপজেলা বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের বালাডোবা চরের কাদের মিয়া বলেন, ‘আমার বাড়ির চাল থেকে পানি হয়েছে। বউ-বাচ্চাকে উঁচু স্থানে রাখছি। নৌকাযোগে ঘরের অন্য জিনিসপত্র খুলে নিচ্ছি। গতকাল ১০ কেজি চাল পাইছি। চাল পেলে কী হবে রান্না করা খুব কষ্ট। খাবার পানিরও খুব কষ্ট, অনেক দূর থেকে পানি এনে খাইতে হয়। সব মিলিয়ে অনেক কষ্টে আছি ভাই।’

ওই ইউনিয়নের দক্ষিণ বালাডোবা চরের হাসিনা বেগম বলেন, ‘রাত থেকে আমার এক বছর বয়সী বাচ্চাটা অসুস্থ। প্রচুর জ্বর-সর্দি, আশপাশে কোনো ডাক্তার নেই। বাচ্চাটা শুধু কান্না করছে। তার কান্না দেখে খুব কষ্ট লাগছে। তাই আজ নৌকাযোগে মোল্লার হাটে নিয়ে যাচ্ছি। কই আমাদের এখানে তো কোনো সরকারি মেডিকেল টিম আসেনি।’

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, কুড়িগ্রামের নদ-নদীর পানি বৃদ্ধির পর বর্তমানে কিছুটা স্থিতিশীল অবস্থায় থাকলেও এখনো দুধকুমার ও ধরলার পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাঈদুল আরীফ জানান, পানিবন্দি মানুষের জন্য ত্রাণ সহায়তা অব্যাহত রয়েছে। আমাদের কাছে পর্যাপ্ত ত্রাণ মজুদ রয়েছে। গতকাল ৬০০ পরিবারকে ১০ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে।

গাইবান্ধায় নদ-নদীর পানি বাড়ছে, বন্যার শঙ্কা : গাইবান্ধায় বিভিন্ন নদ-নদীর পানি ফের বাড়ছে। উজানের ঢল আর দফায় দফায় বর্ষণে ব্রহ্মপুত্র, ঘাঘট, তিস্তা, করতোয়াসহ সব নদ-নদীর পানি ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। এর মধ্যে ব্রহ্মপুত্রের পানি হুহু করে বেড়ে বিপদসীমা ছুঁইছুঁই। পানি বৃদ্ধির গতি অপরিবর্তিত থাকলে জেলায় বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।

ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে সদর উপজেলার কামারজানি ইউনিয়নের খারজানি ও কুন্দেরপাড়া গ্রাম ভেঙে যাচ্ছে। পাশাপাশি সুন্দরগঞ্জ উপজেলার হরিপুর ইউনিয়ন, কাপাশিয়া ইউনিয়ন, ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের খলায়হারার কিছু এলাকায় ভাঙন শুরু হয়েছে।

গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হাফিজুল হক মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, উজান থেকে নেমে আসা ঢলে গাইবান্ধার নদ-নদীর পানি বাড়ছে। কোনো নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেনি। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে বিপদসীমা ছুঁইছুঁই বা অতিক্রম করতে পারে। সে ক্ষেত্রে বন্যার সম্ভাবনা রয়েছে।

জামালপুরে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি : উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ, ইসলামপুর, মাদারগঞ্জ ও সরিষাবাড়ী উপজেলার যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি পেয়েছে।

জামালপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলার দেওয়ানগঞ্জ, ইসলামপুর, মাদারগঞ্জ ও সরিষাবাড়ী উপজেলার যমুনা নদীর পানি আবারও বৃদ্ধি পেয়েছে। জেলার বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার তিন সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের পরিমাপক আবদুল মান্নান বলেন, এখনো কোনো এলাকা প্লাবিত হয়নি। আগামীকাল থেকে পানি কমার সম্ভাবনা রয়েছে।

গঙ্গাচড়ায় তিস্তার ভাঙনের মুখে বিদ্যালয় : তিস্তা নদীর পানি কমতে শুরু হওয়ায় পাড় এলাকায় তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙন আতঙ্কে দিশাহারা হয়ে পড়েছে তিস্তাপাড়ের হাজারো মানুষ। গতকাল হুমকির মুখে পড়েছে রংপুরের গঙ্গাচড়ার লক্ষ্মীটারী শঙ্করদহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টির ৫০ ফুট দূরে তিস্তার ভাঙন এসেছে। এ কারণে টিন, অ্যাঙ্গেলসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এদিকে, তিস্তার ডালিয়া পয়েন্টে পানি বিপদসীমার নিচে নামলেও রংপুরের গঙ্গাচড়ার তিস্তাপাড়ে ছয় ইউনিয়নে কমেনি পানি। শিশুদের মধ্যে দেখা দিয়েছে পানিবাহিত রোগ। অনেকে আশ্রয় নিয়েছেন রাস্তার ধারে।

বিদ্যালয়ের সহকারী ইলিয়াছ হোসেন বলেন, যেহেতু তিস্তার ভাঙন খুব কাছাকাছি। তাই আমরা ইউএনও, শিক্ষা অফিসার, সহকারী শিক্ষা অফিসারের অনুমতি নিয়ে বিদ্যালয়ের মালামাল সরিয়ে ফেলছি।

উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা নাগমা সিলভিয়া জানান, তিস্তার ভাঙন পাশাপাশি আসায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সেখানের স্থানীয় লোকজন এবং শিক্ষা কমিটির সঙ্গে কথা বলে স্কুলের জিনিসপত্র নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আমরা একটি নিরাপদ স্থান দেখে পুনরায় ভবন নির্মাণের জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করব।

রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, যেহেতু নদীর ভাঙন বিদ্যালয়ের একদম কাছে চলে এসেছে। সেহেতু এ মুহূর্তে সেখানে কাজ করা সম্ভব নয়। তার পরও প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। অনুমতি পেলে কাজ করা হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত