চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছর শুরু হয়েছে ১৭ দিন। এই সময়ে সরকার রাজস্ব আয় থেকে আগের বছরের দায় পরিশোধে মনোযোগী হওয়ার কথা। কিন্তু অর্থবছরের শুরুতেই ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হয়েছে সরকারকে। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার দিনে সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে ৩ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা, যার পুরোটাই নেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে। এতে দেশের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার চাপের মুখে পড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ১৬ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। এতে অর্থবছরের প্রথম চার দিনে সার্বিকভাবে সরকারের ব্যাংক ঋণ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা।
বাজেট বাস্তবায়নে সরকার প্রতি বছরই ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেয়। পরে অর্থবছর শেষে রাজস্ব আয় থেকে সেই ঋণ পরিশোধও করে। এ ক্ষেত্রে অর্থবছরের শেষ দিকে সবচেয়ে বেশি ঋণ নিতে দেখা যায় সরকারকে। কিন্তু চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম থেকেই ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেওয়া শুরু করেছে সরকার। যদিও চলতি বছরের এখন পর্যন্ত সরকার নতুন টাকার জোগান থেকে কোনো ঋণ নেয়নি।
এদিকে, সরকারের অব্যাহত ব্যাংক ঋণের কারণে ব্যাংক খাতে সরকারের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৮৩০ কোটি টাকা। এক বছর আগে সরকারের ব্যাংক ঋণ ছিল ২ লাখ ৭৭ হাজার ৩২৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকারের নেওয়া মোট ঋণ ১ লাখ ৬১ হাজার ২৩১ কোটি টাকা। ২০২২ সালের একই সময়ে এই ঋণের পরিমাণ ছিল ৬২ হাজার ৫৫১ কোটি টাকা। আর বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৩৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ১৪ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, বিদায়ী অর্থবছরেও সরকার অন্যান্য খাত থেকে ব্যাংক ঋণেই আগ্রহ বেশি ছিল। বাজেট বাস্তবায়নে সদ্য বিদায়ী অর্থবছর ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১১ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও সরকারের বিদেশি ঋণের প্রবাহ কম থাকা ও রাজস্ব আহরণে ব্যর্থতার কারণে সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ১ লাখ ১৫ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করে। কিন্তু এই লক্ষ্য থেকেও ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বেশি ঋণ নিয়েছে সরকার। বিদায়ী অর্থবছর সরকার ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নিয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা, যার বেশিরভাগই জোগান দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ব্যাংকাররা বলছেন, অর্থনৈতিক সংকট, সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ না পাওয়া ও সঞ্চপত্রের পূর্বের ঋণ পরিশোধ করতে হওয়ায় চলতি অর্থবছরের প্রথম দিক থেকেই ব্যাংকের ওপর ভর করতে হয়েছে সরকারকে। এতে বছরের প্রথম দিক থেকেই ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ না করে নতুন করে ঋণ নিতে হয়েছে। আবার এসব ঋণের বেশিরভাগই জোগান এসেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিভল্বমেন্ট (নতুন টাকার জোগান) ফান্ড থেকে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইএমএফের সাবেক কর্মকর্তা ও বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, এটা অর্থনীতির ওপর খারাপ প্রভাব তৈরি করবে। সরকার এই কাজ করছে দুটি কারণে। একটি হচ্ছে, সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক চাচ্ছে ব্যাংক ঋণের সুদের হার যাতে কোনোভাবেই না বাড়ে। এজন্য কারসাজি করে ব্যাংকগুলোকে বিল বন্ড কিনতে দেওয়া হচ্ছে না। ব্যাংকগুলো যদি বিল বা বন্ড কিনে তাহলে তারা বেশি দরে বিট করবে। আর ঋণের সুদের হার বেড়ে যাবে। দ্বিতীয়ত, সরকার চলতি অর্থবছর সোয়া লাখ কোটি টাকা ছাপানোর চিন্তা করছে। এজন্য তারা এভাবে ঋণ নিচ্ছে।
