ফাইলবন্দি প্রকল্পে ভাঙনের সঙ্গে বাড়ছে ক্ষতি ও ব্যয়

আপডেট : ২৬ জুলাই ২০২৩, ০২:০৮ এএম

কুষ্টিয়ায় পদ্মা নদীর তীব্র ভাঙনে মিরপুর ও ভেড়ামারা উপজেলার নদীতীরবর্তী তিন ইউনিয়নের প্রায় ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ ও দেড় কিলোমিটার এলাকায় তীব্র নদীভাঙনের কবলে পড়েছে। ইতিমধ্যে আক্রান্ত ওই তিন ইউনিয়নের চারটি মৌজা সম্পূর্ণ এবং আরও তিনটি মৌজার আংশিকসহ প্রায় ১৫ হাজার একর ফসলি জমি, ঘরবাড়ি, সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা নদীতে বিলীন হয়েছে। এ ছাড়া বিলীনের অপেক্ষায় দেশের উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একমাত্র যোগাযোগ মহাসড়কটি ছাড়াও চরম ঝুঁকিতে পড়েছে দেশের সর্ববৃহৎ সেচ প্রকল্প গঙ্গা কপোতাক্ষ ও ভেড়ামাড়া ৪১০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রটি। অভিযোগ রয়েছে, সময়মতো প্রস্তাবিত উন্নয়ন প্রকল্প (ডিপিপি) বাস্তবায়ন না হওয়ায় বছর জুড়ে বিরতিহীন ভাঙনে ক্ষতির পরিমাণ বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সরকারি ব্যয়ের বোঝা। এ তথ্যের সত্যতা স্বীকার করেই সংশ্লিষ্ট পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, ডিপিপি অনুমোদন পেলেই ভাঙনরোধে স্থায়ী সমাধান সম্ভব হবে।

মিরপুর উপজেলার বহলবাড়িয়া গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত কেরামত মন্ডল বলেন, ‘জাগা জমিন, ঘরবাড়ি, গরু-বাছুর সব এখন পদ্মার প্যাটে। তিন বছর আগেত্তি গাং য্যাকন ভাঙা শুরু করে, তেখন তিন কতজনকে বুল্লাম, কাকুতিমিনতি কল্লাম, কেউ শুনল না, তারা কুনো গুরুত্তই দিলি না, শুরুত্তিন যদি ইরা কোন ব্যাবস্তা লিতি তালি আইজ এই অবস্থা হইতি না। আমার মতো ম্যালা লোক সবকিছু হারাইচে। যে কাম অল্পত্তিন হতি, সেই কাম এখন অনেক বাইড়ি গেছে।’

কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী অসীম কুমার সরকার বলেন, ‘তালবাড়িয়া পদ্মাতীরবর্তী ভাঙনকবলিত এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে বালিভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে তাৎক্ষণিক ভাঙন রোধের চেষ্টা করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। কিন্তু তাতে কোনো কাজে আসছে না। তাই দ্রুত প্রস্তাবিত উন্নয়ন প্রকল্পের (ডিপিপি) অনুমোদনসহ তার বাস্তবায়নই হবে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান।

ভেড়ামারা উপজেলা চেয়ারম্যান আক্তারুজ্জামান মিঠুর অভিযোগ, ‘তিন বছর ধরে দুই উপজেলার প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা ও পুরো জনপদকে রক্ষায় এখনই দরকার স্থায়ী সমাধান। নয়তো এক দিনে জনজীবনে জানমালের অপূরণীয় ক্ষতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সরকারি ব্যয়ের বোঝা হবে আকাশছোঁয়া।’

তালবাড়িয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুল হান্নান মন্ডল জানান, ‘আমার এই ইউনিয়নের ছয় গ্রাম ইতিমধ্যে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এখন এখানে হাজার কোটি টাকা ব্যয় করলেও তো ওইসব ঘরবাড়ি, জায়গাজমি, রাস্তাঘাট, হাট-বাজার কিছুই ফিরিয়ে আনা যাবে না। জরুরি এই ভাঙন বন্ধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।’

কুষ্টিয়া নাগরিক কমিটির সভাপতি ও কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ডা. এস এম মুসতানজিদ বলেন, ‘আমরা জানি প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিউর, আজকে কুষ্টিয়াতে নদীভাঙনের যে সংকট দেখা দিয়েছে, এ সংকট শুরুর দিকে যে আয়তনকে আক্রান্ত করেছিল, তখনই যদি প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন সম্ভব হতো তাহলে ওইদিনে শুরু হওয়া ছোট্ট সংকটটি আজকে এত বৃহৎ অঞ্চল জুড়ে ধ্বংস হতো না। আমরা দেখেছি গত দুই বছর আগে এখানে যে ডিপিপি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য একনেক সভায় পাঠানো হয়েছিল, তার প্রাক্কলনব্যয় ধরা হয়েছিল ৯৮৯ কোটি টাকা, যা অনুমোদন ও বাস্তবায়ন না হওয়ায় চলতি অর্থবছরে ওই একই প্রকল্পের প্রাক্কলনব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৮১৬ কোটি ৪২ লাখ টাকা, যা দ্বিগুণ ছাড়িয়েছে। এবারও যদি প্রস্তাবিত এই উন্নয়ন প্রকল্প (ডিপিপি) অনুমোদনসহ বাস্তবায়ন না হয়ে ফাইলবন্দি থেকে যায়; তাহলে শিগগিরই সরকারি ব্যয় ক্রমবৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মহাসড়ক, সেচ প্রকল্প, ভেড়ামারা বিদ্যুৎকেন্দ্র ও লালন শাহ সেতুসহ সরকারের আরও কয়েক হাজার কোটি টাকার অবকাঠামোসহ স্থাপনা বিলীন হয়ে যাবে পদ্মায়।’

বাপাউবো কুষ্টিয়ার নির্বাহী প্রকৌশলী রাশিদুর রহমান জানান, ‘পদ্মা নদীর এবারের ভাঙন এতই তীব্রতা পেয়েছে, যেখানে পানি উন্নয়ন বোর্ড তাৎক্ষণিক জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু ভাঙনের তীব্রতা ঠেকাতে স্থায়ী প্রতিরক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়ন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। ইতিমধ্যে পাঠানো ডিপিপি প্ল্যানিং কমিশনে যাচাই-বাছাই শেষে একনেক সভায় অনুমোদন পেলেই প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত