প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ২৩ ঘর মামলা জটিলতায়

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২৩, ০৬:৫৫ এএম

মেহেরপুরের গাংনীতে মামলা জটিলতায় চার বছর ধরে আটকে আছে গৃহহীন ও ভূমিহীনদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর ঘর উপহার প্রকল্পের ২৩টি ঘর হস্তান্তর। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার দীর্ঘদিন পরও বরাদ্দপ্রাপ্তরা ঘরগুলো বুঝে না পাওয়ায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান সামগ্রী।

ঘর বরাদ্দ পাওয়া পরিবারগুলোর বলছে, আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে পুনর্বাসনের জন্য নির্মিত ২০টি ঘর প্রশাসন তাদের বুঝিয়ে দেয়নি। আর গাংনী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ভাষ্য, আদালতের নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি সুরাহা না হলে তাদের কিছুই করার নেই।

সরেজমিনে গাংনীর মোহাম্মদপুর গ্রামে দেখা যায়, গ্রামের পশ্চিম পাশে মরা নদীর পাড়ে একটি মাঠের মধ্যে সারিবদ্ধভাবে নির্মিত ২০টি চারচালা নতুন ঘর অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে। বুঝে না পেয়ে বরাদ্দপ্রাপ্তরা ঘরগুলোতে উঠতে না পারায় ঘরগুলোর জানালা, দরজা খোলা। ভেতর নতুন রঙ করা দেয়ালে নানান কিছু লেখা দেখে বোঝা যায়, ঘরগুলো এখন মাদকসেবীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন ঘরের পানিনিষ্কাশন এবং আবর্জনা পরিষ্কারকাজের জন্য লাগানো প্লাস্টিকের সব পাইপ চুরি হয়ে গেছে। গৃহহীনদের থাকার জন্য তৈরি এসব ঘরের অনেকগুলো এখন গবাদিপশুর আবাসস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রতিটি ঘর নির্মাণে সরকারের ব্যয় হয়েছে প্রায় আড়াই লাখ টাকা করে। অথচ অব্যবহৃত পড়ে থাকা ঘরগুলো দেখভালের জন্য কোনো লোক নেই বলে জানায় গ্রামবাসী।

তারা আরও জানায়, চার বছর আগে মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে গৃহ ও ভূমিহীন পরিবারের পুনর্বাসনের জন্য গাংনীর মটমুড়া ইউনিয়নের মোহাম্মদপুর গ্রামের ১ নম্বর খতিয়ানের ৫৯২০ নম্বর দাগে ২০টি এবং ষোলটাকা ইউনিয়নের কাষ্টদহ গ্রামের তিনটি ভূমিহীন ছিন্নমূল পরিবারের জন্য তিনটি ঘর নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সরকার। কাষ্টদহ গ্রামের তিনটি ঘর নির্মাণের কাজ ৮০ শতাংশ শেষ হওয়ার পর স্থানীয় প্রভাবশালী আবুল কাশেম আদালতে জমির মালিকানা দাবি করে মামলা করলে নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে মোহাম্মদপুর গ্রামের ২০টি ঘরের নির্মাণকাজ শেষ হলে প্রশাসন বৈদ্যুতিক সংযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। ঠিক তখন বাধার মুখে পড়তে হয়। গ্রামের প্রভাবশালী বাসিন্দা সাবেক সেনাসদস্য আবুল হোসেন ১ নম্বর খতিয়ানের ৫৯২০ দাগের ওই জমি তার নিজের দাবি করে মামলা করলে আদালত স্থগিতাদেশ দেয়। এতে করে নির্মাণ শেষ হওয়ার পরও ২০টি ঘর গৃহহীনদের মাঝে হস্তান্তর প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়।

বরাদ্দ পেয়েও ঘরে উঠতে না পারা মোহাম্মদপুর গ্রামের মেহেরুন নেছা বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। জমিজমা নেই। ঘরগুলো পেলে ছেলিপেলি নিয়ে একটু শান্তিতে বাস করতি পারতাম।’

আরেক ভুক্তভোগী আলফাতুন খাতুন বলেন, ‘সরকার আমাদের জন্য ঘর করছে ঠিকই। এখন প্রশাসনের লোকজন বুঝে দিতে না পারায় ঘরে উঠতে পারছি না। ফলে ভাড়া ঘরের ভাড়া দিতে গিয়ে এখন মুখে ভাত উঠছে না। ঘরগুলো পড়ে থেকে এমনি এমনি নষ্ট হচ্ছে। অনেক কিছু চুরি হয়ে যাচ্ছে। ঘরগুলোতে এখন মাদকসেবীদের আড্ডা বসে প্রতিদিন।’

বরাদ্দ পেয়েও ঘরে উঠতে না পেরে হতাশা প্রকাশ করেন একই গ্রামের আরেক বাসিন্দা তকলিমা বেওয়া। তিনি বলেন, ‘ঘর নাকি সরকারি জায়গায় না করে মানুষের জায়গায় করছে। তাই জমি মালিকরা মামলা করছে। এ কারণে এখন চোখে ঘর দেখলেও সেখানে যাতি পারছি না।’

মামলার জটিলতা নিরসন করে দ্রুত বরাদ্দপ্রাপ্তদের মধ্যে ঘর হস্তান্তরের দাবি জানান মোহাম্মদপুর গ্রামের বাসিন্দা সাব্বির সারোয়ার। তিনি বলেন, ‘ঘর নির্মাণ শেষ হলো। ঠিক যখন বিদ্যুতের সংযোগ দিতে লোক এলো ওই দিন বাধা এলো। তখন জানা গেল জমি সরকারের না, পাবলিকের। জমির মালিকানা দাবি করে মামলা করায় এখন ঘরে যেতে পারছে না কেউই। আমরা দ্রুত এর প্রতিকার চাই।’

মামলা করার কারণ জানতে চাইলে সাবেক সেনাসদস্য আবুল হোসেন বলেন, ‘আমার বাপ-দাদার পৈতৃক সম্পত্তি ওটা। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ফসল ফলিয়েছি। লকডাউনের সময় জোর করে আমার জায়গা দখল করে ঘর তৈরি করার চেষ্টা করে। পরে আমরা ওই ঘরে বিদ্যুৎ সংযোগ লাগাতে দিইনি। পরে মালিকানা দাবি করে আদালতে মামলা করি। আদালত দলিলপত্র দেখে ২০টি ঘরের ওপর স্থগিতাদেশ দিয়েছে।’

আরেক মামলার বাদী কাষ্টদাহ গ্রামের আবুল কাসেম বলেন, ‘জমির একাংশের মালিক আমি। আমার জমিতে অবৈধভাবে ঘর নির্মাণ করায় আদালতে মামলা করি। আদালত তিনটি ঘরের ওপর স্থগিতাদেশ দিয়েছে। সরকার অর্পিত সম্পত্তিতে ঘর না করে মানুষের সম্পত্তিতে ঘর করলে মানুষ কি ছেড়ে দেবে? স্থানীয় প্রশাসনের ভুলের কারণে গৃহহীনদের জন্য নির্মিত সরকারি ঘর আজ নির্মাণ শেষ হওয়ার পরও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে গাংনীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাজিয়া সিদ্দিকা সেতু বলেন, ‘আমরা জমির সপক্ষে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আদালতে জমা দিয়েছি। জমির মালিকানা নিয়ে স্থানীয় দুজন আদালতে মামলা করেছেন। তাই গৃহ হস্তান্তর প্রক্রিয়া আটকে গেছে। খুব শিগগির আদালতের রায় হওয়ার কথা রয়েছে। আদালতে বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ২৩টি ঘর হস্তান্তর নিয়ে উপজেলা প্রশাসনের কিছুই করার ক্ষমতা নেই।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত