দ্রুত ডেঙ্গুর টিকা আনতে চায় সরকার

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২৩, ০২:৪৪ এএম

দেশে যত দ্রুত সম্ভব ডেঙ্গুর টিকা আনতে চায় সরকার। সে জন্য কাজও শুরু করে দিয়েছে। সরকারের উচ্চ মহলের নির্দেশে ইতিমধ্যেই যেসব টিকা বাজারে এসেছে এবং আসার সম্ভাবনা রয়েছে এমন টিকাগুলোর সম্ভাব্যতা যাচাই করছে জাতীয় টিকা সংক্রান্ত কারিগরি উপদেষ্টা কমিটি (নাইট্যাগ)। ইতিমধ্যেই কমিটি একটি সভা করেছে। আগামী সাত দিনের মধ্যে আরেকটি সভা হবে। সেই সভায় দেশের ভাইরোলজিস্টদের ডাকা হয়েছে। সেখানে টিকা বাছাইয়ের বিষয়টি চূড়ান্ত হতে পারে।

নাইট্যাগ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা এবং ভাইরোলজিস্টরা জানান, সরকারের ভাবনায় চারটি টিকা রয়েছে। সম্ভাবনার দিক থেকে এগিয়ে রয়েছে জাপানের তাকেদা ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির তৈরি ‘কিউডেঙ্গা’ টিকা। বিশ্বে ডেঙ্গুর দ্বিতীয় টিকা হিসেবে পাঁচ বছর আগে এই টিকা আবিষ্কার হয়। সম্ভাবনার তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ফ্রান্সের ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি সানোফির ‘ডেংভ্যাক্সিয়া’। এটাই বিশে^ আবিষ্কৃত প্রথম ডেঙ্গুর টিকা। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে মেক্সিকোর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় প্রথম দেশটিতে পরীক্ষামূলকভাবে ‘ডেংভ্যাক্সিয়া’ ব্যবহারের অনুমতি দেয়। পাশাপাশি ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের প্যানাসিয়া বায়োটেক টিকার ব্যাপারেও খোঁজ নিচ্ছে সরকার। ভারতে এই টিকার তৃতীয় ধাপের পরীক্ষামূলক প্রয়োগের জন্য আবেদন করেছে সেরাম ইনস্টিটিউট। সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর.বি) টেট্রাভ্যালেন্ট ভ্যাকসিন নামে টিকা নিয়ে গবেষণা করছে। এই টিকা তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ (এনআইএইচ)।

এ ব্যাপারে গতকাল মঙ্গলবার নাইট্যাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. খান আবুল কালাম আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডেঙ্গু টিকার বিষয়ে আমরা আমাদের ইতিবাচক মত দিয়েছি। আমরা নাইট্যাগের ব্যবস্থাপনা কমিটি টিকার বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গেই সভা করেছি। আমাদের সদস্যরা আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে ওয়ার্ক আউট করা শুরু করবে। আশা করছি, আগামী সপ্তাহের সভায় টিকার বিষয়ে একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারব। সভায় দেশের সব ভাইরোলজিস্টকে ডেকেছি।’

ট্রায়াল পর্যায়ে থাকলেও সহজ প্রয়োগ ও কার্যকারিতা বিবেচনায় এখন পর্যন্ত জাপানের কিউডেঙ্গা টিকা সরকারের সুবিবেচনায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন টিকা সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা।

এই টিকার ব্যাপারে নাইট্যাগ চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. খান আবুল কালাম আজাদ বলেন, কিউডেঙ্গা টিকার বিষয়েও খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। এটা ডেঙ্গুর টাইপ-২ ভাইরাস থেকে তৈরি করা এবং ডেঙ্গুর চারটি ধরনের বিরুদ্ধেই কাজ করে। এই টিকা আগে ডেঙ্গু হয়েছিল কি না, সেটার ওপর নির্ভর না করে যে কাউকে দেওয়া যায়।

কিউডেঙ্গা টিকাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এমন একটা টিকা দরকার, যেটা দেওয়ার আগে মানুষের ডেঙ্গু টেস্ট করতে হবে না এবং সব ধরনের ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে কাজ করবে। সে রকম একটা টিকা হলো জাপানের কিউডেঙ্গা টিকা। এই টিকা যদি আমরা নিই তাহলে আমাদের সুবিধা। আমাদের ইপিআই (সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি) খুব ভালো। তারা ভালোভাবেই দিতে পারবে।’

অন্যদিকে ফ্রান্সের ‘ডেংভ্যাক্সিয়া’ টিকা সরকারের ভাবনায় থাকলেও এই টিকার প্রয়োগ জটিলতা ও দাম নিয়ে ভাবনায় ফেলেছে সবাইকে। এই টিকার ব্যাপারে অধ্যাপক ডা. খান আবুল কালাম আজাদ বলেন, এটা ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও দেশটির ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনও (এফডিএ) অনুমোদন করেছে। এশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, লাতিন আমেরিকাসহ অনেকগুলো দেশেই মানুষের ওপর এই টিকা প্রয়োগ হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন তাদের ৯-১৬ বছরের বাচ্চাদের দিচ্ছে। তবে এই টিকার জটিলতা হলো যাদের আগে ডেঙ্গু হয়েছিল, কেবল তাদেরই দেওয়া যাবে। এর জন্য প্রত্যেকের ডেঙ্গুর অ্যান্টিবডি টেস্ট করতে হবে। যাদের কখনো ডেঙ্গু হয়নি, তাদের যদি ডেংভ্যাক্সিয়া দেওয়া হয়, তাহলে মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হবে, খারাপ অবস্থা হতে পারে। ফিলিপাইনে যেমনটা ঘটেছিল। এই টিকাটা যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে ব্যবহার করছে, বাংলাদেশে সেটা সম্ভব কি না, সে জন্য তথ্য-উপাত্ত নিয়ে ট্রায়াল দিয়ে দেখতে হবে।

এখনো গবেষণা ও ট্রায়াল পর্যায়ে থাকা আইসিডিডিআর.বি ও ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের দুটি টিকার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছে নাইট্যাগ। এ ব্যাপারে নাইট্যাগ চেয়ারম্যান বলেন, ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট যুক্তরাষ্ট্রের টেকনোলজি নিয়ে একটি টিকা তৈরির চেষ্টা করছে। তবে সেটার তথ্য-উপাত্ত খুব ভালোভাবে জানা নেই। প্রাণীর শরীরে এই টিকার সফলতা দেখা গেছে। কিন্তু মানুষের ওপর ট্রায়াল এখনো চলছে। মানুষের শরীরের কতটা নিরাপদ ও কার্যকর হবে, সেটার ট্রায়াল দেখে এই টিকার ব্যাপারে জানা যাবে।

এই কর্মকর্তা আরও বলেন, আগামী সভায় আইসিডিডিআর.বির ভাইরোলজিস্টদেরও ডাকা হয়েছে। সেখানে তাদের টিকার ব্যাপারে তথ্য-উপাত্ত দেখা হবে।

নাইট্যাগ চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা সরাসরি কোনো টিকা তৈরি করি না। যারা ইতিমধ্যে টিকা তৈরি করে বাজারে ছেড়েছে, অথবা সম্ভাব্য যেসব টিকা তৈরি হচ্ছে, সেগুলোর মধ্য থেকে যেকোনো একটি টিকা এনে ও সংক্ষিপ্ত ট্রায়াল করে প্রয়োগ করা যায় কি না, সে জন্য কাজ করা হচ্ছে।’

এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘সঠিক টিকা বাছাই ও সিদ্ধান্ত নিতে সাত দিনের মধ্যে আমরা ভাইরোলজিস্টদের একটা মিটিং ডেকেছি। কারণ আমাদের সব চিন্তা করতে হবে। যেমন ডেংভ্যাক্সিয়া টিকা ছয় মাস অন্তর তিন ডোজ দিতে হয়। এর খরচও বেশি, তিন ডোজ দিতে ২১০ ডলারের মতো লাগবে। দেশে যত দিন আমরা নিজেরা টিকা তৈরি করতে না পারছি, তত দিন দেখতে হবে কোনটা সবচেয়ে ভালো।’

তবে টিকার তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়াল দেশে করতে হবে বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া, আফ্রিকা, চীন- একেক দেশের লোকজন একেক ধরনের। এমনকি ভারতেরও অনেক জায়গার লোকজনের সঙ্গে আমাদের মেলে না। কাজেই টিকা এনেই যদি দিতে শুরু করি, তাহলে জটিলতা হতে পারে। সে জন্য থার্ড ফেস ট্রায়াল করতে হবে।’

কবে নাগাদ টিকা পেতে পারে মানুষ এমন প্রশ্নে নাইট্যাগ চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা যদি দেখতাম ডেংভ্যাক্সিয়া যে কাউকে দেওয়া যাবে এবং এটা মানুষের জন্য দ্রুত কাজ করবে, তা হলে এটা দ্রুত আনতে পারতাম। কারণ এটা পাইপলাইনে রয়েছে, ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু কভিডের মতোই অনেকগুলো টিকা পাইপলাইনে রয়েছে। চূড়ান্ত ফলাফল যখন প্রকাশিত হবে, তখন বোঝা যাবে কোনটি বেশি কার্যকর। টিকার কার্যকারিতা যতই হোক, আমাদের জনগোষ্ঠীতে কীভাবে কাজ করে, সেটাও জানতে হবে। এসব মাথায় রেখে আমাদেরও কিছুটা ট্রায়াল দিয়ে দেখতে হবে।’

অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশে এখন ডেঙ্গুর টিকার প্রয়োজন। কারণ আমরা মশা মারার চেষ্টা করছি, কিন্তু পারছি না। মানুষের সচেতনতাও কম। রোগীরা যারা হাসপাতালে যাচ্ছে, তারা হাসপাতালে জায়গা পাচ্ছে না, টেস্ট করতে পারছে না; অর্থাৎ ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের সব কর্মসূচিতেই আংশিক সফল। এখন এর সঙ্গে যদি টিকা যুক্ত করা যায়, তাহলে এখন যেখানে ৫০-৫৫ শতাংশ সফলতা, তখন ৭৫-৮০ শতাংশ সফল হব।’

এ ব্যাপারে নাইট্যাগ চেয়ারম্যান বলেন, নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ডেঙ্গু মহামারীর পর্যায়ে চলে যাবে। নতুন রোগী মানে নতুন ভাইরাস। যত রোগী ও এডিস মশা হবে তত ভাইরাস ছড়াবে, তত বেশি আক্রান্তের হার বাড়বে। সে জন্য আমাদের অবশ্যই এই মুহূর্তে টিকার বিষয়টি ভাবা দরকার।’

৩ দিন ধরে ঢাকার বাইরে রোগী বেশি : তিন দিন ধরে ঢাকার বাইরে বেশি ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যাচ্ছে। সর্বশেষ গত ২৪ ঘণ্টায় (গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২ হাজার ৫৮৪ জন রোগী। তাদের মধ্যে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ১৩১ জন ও ঢাকার বাইরে ১ হাজার ৪৫৩ জন। অর্থাৎ ঢাকার বাইরে ঢাকার চেয়ে ৩২২ জন রোগী বেশি ভর্তি হয়েছে। এর আগে ঢাকার চেয়ে ঢাকার বাইরে গত ৩০ জুলাই ৩৬৩ জন ও ৩১ জুলাই ৩৫৮ জন রোগী বেশি ভর্তি হয়।

এ নিয়ে এখন পর্যন্ত ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল ৫৪ হাজার ৪১৬ জন। তাদের মধ্যে ঢাকায় ভর্তি হয়েছে ৩০ হাজার ৩৩১ জন ও ঢাকার বাইরে ২৪ হাজার ৮৫ জন।

গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ঢাকায় ৯ জন ও ঢাকার বাইরে ১ জন রয়েছেন। এ নিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ২৬১ জন। তাদের মধ্যে ঢাকায় মারা গেছে ২০৫ জন ও ঢাকার বাইরে ৫৬ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ৯ হাজার ২৬৪ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন আছে। ঢাকার সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে বর্তমানে ৪ হাজার ৮৬৯ জন এবং অন্যান্য বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ৪ হাজার ৩৯৫ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত