মোহাম্মদ রফিক

যাপিত ভূগোলের ধ্রুপদি কাব্যকার

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২৩, ১০:৫১ পিএম

এই লেখা যখন লিখছি, তখন মোহাম্মদ রফিকের নশ্বর দেহ বাগেরহাটের কোনো এক গ্রামে মাটির তলায় হয়তো বা ক্ষয়ের অবশেষ। তিনি তো লিখেইছিলেন: এই দেহ কাল হবে, কেউ তাকে ঠিক ছিঁড়ে খাবে। (কীর্তিনাশা) রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছিলেন, যে বিশ্ব কোলের পরে/চিরদিবসের তরে/ তুলে নিল তারে/ তার মুখে শব্দ নাহি/প্রশান্ত সে আছে চাহি/ঢাকি আপনারে... (মৃত্যুর পরে) কিংবা রফিকের আরেক প্রিয় কবি চিলির পাবলো নেরুদা যেমন অনুভব করেন: পল্লবের ছদ্মবেশে মৃত্যু পৃথিবীর মধ্য দিয়ে চলে যায়/মৃত্যু পল্লবে মুখ ঢাকে/মৃত্যুর জিভ খোঁজে সুতো (নিঃসঙ্গ মৃত্যু) অথবা আমাদের কোনো এক প্রান্তিক পল্লীর গীতিকবি বিজয় সরকার গেয়ে ওঠেন, পোষা পাখি উড়ে যাবে/একদিন ভাবি নাই মনে... পৃথিবীর সব ধ্রুপদি ধারার মহৎ কবিদের মতো মোহাম্মদ রফিকের কবিতাও মৃত্যুমুখর, পরতে পরতে তার মৃত্যুর সতেজ উদযাপন। তবে সেই মৃত্যু কেবল ভাবুকতা বা অধ্যাত্মের চেতনার শ্বাস খেয়ে মূর্ত হওয়া নয়, বাংলার চিরবিপর্যস্ত এক জনপদের জীবনে জীবনে প্রকৃতির খেয়ালে কি হেঁয়ালিতে, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যে রচিতও!

মোহাম্মদ রফিকের কবিতা যখন পড়ি শুধু মৃত্যু নয় আমরা এ বঙ্গের নদীবর্তী মানুষের জয়ে-পরাজয়ে গাথা লড়াকু জীবনের আনন্দ-বেদনার এক নান্দনিক উদ্ভাস দেখতে পাই। নদীবিধৌত আপন যে জন্মভূমির কথা তিনি কবিতা করে তোলেন, তার ভাঁজে-ভাঁজে চিহ্নে রেখায় বাংলা ফুটে ওঠে ভাঙনে উত্থানে উচ্ছ্বাসে নীরবতায়। এর আগেও বাংলাকে আমরা পেয়েছি, জসিমউদ্্দীন দিয়েছিলেন, কিন্তু তা ছিল গ্রামীণ জীবনের আবেগ-প্রেম-বিচ্ছেদ-শ্রেণিবিরোধের সরল কাব্যিক বয়ান, কিন্তু মুহুর্মুহু যাপিত ভূগোলের ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ জীবনের ছবি সেখানে ছিল না। জীবনানন্দের বাংলা যাপিত বাস্তবতার সত্য থেকে ঠিকরে বেরোয়নি, এক রোমান্টিক পরিদর্শক ও পরিব্রাজকের দর্শন থেকে বাংলা সেখানে আলুলায়িত, নিদ্রাতুর, স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্নমদির। বাংলাকে আল মাহমুদ দেখেছিলেন আত্মকামবাসনার সঙ্গে যুক্ত করে। সেখানে সবকিছুর পরে আমি বা অহমই মুখ্য। নারী, মাটি, শস্য, নদী, জল সবকিছু তার পৌরুষিক দৃষ্টিভঙ্গির আকাক্সক্ষা ও বাসনার টানে আবর্তিত হয়েছে। কবিতার উন্মাতাল শক্তি দিয়ে আল মাহমুদ শেষাবধি পরাজিত করে গেছেন ভূগোল-বাস্তবতার জৈবনিক রূপের নিজস্ব উদ্ভাসনের আকাক্সক্ষাকে। রক্তপাত, গঞ্জনা, যন্ত্রণার কাব্যিক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক বোঝাপড়ার খেলা আল মাহমুদে নেই। এটা একটা ঝুঁকির ব্যাপার যে কাব্যিক বিশুদ্ধতা তাতে থাকবে কী থাকবে না। কবিতার স্বার্থ কি রক্ষা হবে? ইত্যাদি। কিন্তু মোহাম্মদ রফিক সে ঝুঁকি নিয়েছেন। তিনি আমাদের আধুনিক কালক্ষেত্রপাত্রবোধহীন উদ্বাস্তু বাংলার রোমাঞ্চজাগানিয়া বাতাসে ভাসাননি কাব্যবিহারের নৌকা, তিনি বাংলাকে ছিঁড়েখুঁড়ে আনতে চেয়েছেন তার চাঁছাছোলা কাব্যবল্লমের কোপে কোপে। সে ভাষা এভাবেই প্রশ্ন করে: ‘এইভাবে ভিজে-ভিজে কীর্তিনাশা কতদূর যাবে?/এই দেশে বন্যার কি শেষ আছে?’ আমরা একথা ভাবি নাই। আর কীর্তিনাশা অন্ত্যজ মানুষকে নন্দনের ভাষাভঙ্গির যে আঁটোসাঁটো গড়নে বেঁধেছে, সেটাও রীতিমতো ভাবনীয়। বাংলা কবিতায় নদী ও তার আশপাশের মানুষজন, প্রায়ই কবিমনের রোমান্টিকতার সূত্র ধরে এসেছে, এভাবে নয়। এভাবে বাস্তবতার শত চিত্রের সাথে কল্পভুবনকে জারিত করে নয়, এভাবে কবিকে সেখানকার বাস্তুভিটায় আছড়ে ফেলে নয়, যে কবি শুনতে পানজল ছুঁয়ে শেষ প্রহরের চাঁদে বলে আমি যাই.../কিংবা/জলে-জলে ভাঙা চাঁদ কেঁদে ওঠে বিদায় বিদায়../এই জলে কাদায় লেপ্টালেপ্টি ভাঙা পোড়া চাঁদ বাংলা কবিতার আকাশে দেখা মেলে নাই। অনেক গভীর থেকে ডাক এল, কেউ বুঝল না!/যে যার নির্দিষ্ট পথে পিচ্ছিল সন্ধ্যার মাঠ ভেঙে/হাট থেকে ফিরে এল দাওয়ায় বিরক্ত মুখ ক্লান্ত  উপেক্ষার বোঝা বয়ে/টেমির আলোতে ভেজা অর্ধঘুমে উন্মনা ভাজা ইলিশের পোড়া ঘ্রাণে/ শুধুমাত্র একটি তারা হয়তো তারাও নয় আলোর মতন এই কিছু/ছুটে এসে ঝরে গেল/দক্ষিণের পলাশপুরের বিলে দু-ক্রোশ রাস্তায় পরপারে।//

শব্দ ব্যবহারের এক পরিমিতি ও সাচ্চামি তার ধ্রুপদি কাব্যচরিত্রকে শক্ত ভিত্তি দিয়েছে। এ স্তবকটির শেষে পরপারে শব্দটিকে খেয়াল করুন। এত যে আলো-আঁধারি বা চেনা-না চেনা চিত্রকল্প, তার শেষে পরপারে শব্দটি সবকিছুকে আবার ভাবতে বাধ্য করে। কিন্তু কবিতার রহস্যজটিল স্পন্দনতৃষ্ণার জায়গায় সেটা কোনো বাধাই হয়ে ওঠে না।  কেননা, মারি আর মড়ার দ্যাশে এইক্ষণে কবি নিজের মতন জগৎ সাজিয়ে বেড়ান, যেখানে চাঁদের ভাসানে মেঘ মেঘের ভাসানে মাঠ মাঠের ভাসানে ঘরবাড়ি... এই জন্ম শেষ জন্ম বাতাস একটু ধীরে বও/এমন ছিল না কথা এইভাবে নাও ছেড়ে ফিরে যাবে দেশে/ঘুমের ভেতরে পথ ঘুমের ভেতরে জাগরণ/স্তব্ধ রাত স্তব্ধ জল স্তব্ধ ফিরে চলে/উঠোন পেরিয়ে ঘর ঘরটা পেরিয়ে মাঠ মাঠটা পেরিয়ে/যেখানে যাত্রার শুরু ঘোড়ার খুরের ধ্বনি ঘণ্টা বাজে নির-নিরন্তর/একটি দিনের স্বপ্ন একটি যুগের ছায়া দুঃস্বপ্ন ছায়ার/পালটে যায় মানচিত্র ঢোঁড়া ঠিক উঠে আসে/জল থেকে রোদ্দুরে পোহায়...//আলোর ভেতর থেকে উড়ে গেলে আলো/স্বাদ থেকে অন্য অধীর বিস্বাদ/বুকের সান্নিধ্যে বুক.../ও চাঁদ এমন ভয়ে কে বলো তোমার পথে বাঁধবে না ঘর.../এ চাঁদকে আবার পাওয়া যাবে অন্য বিপর্যাসে :‘ওগো চাঁদ তোমার ধিক্কারে বাজে বিবাগী আকুল চিৎকার.../চাঁদেতে লেগেছে অগ্নি হায় সে আগুন আজ জল/চোখের আগুনে জলে পথ পেল আষাঢ়পূর্ণিমা/’ বাংলার এই চাঁদ যেন মানুষের যতেক সংকট-আনন্দের ভেতর দিয়ে জীবন্ত হয়ে ওঠা এক মনুষ্যবৎ অস্তি, যা কাব্যে এতকাল বিরলই ছিল। প্রকৃতি আর জনপদের দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের ব্যুহ ছেড়ে এবার তিনি মানুষের রাষ্ট্রীয়-সামাজিক বিন্যাসের নাভিশ্বাস তোলা জালটিকে ছিঁড়তে চাইলেন! বললেন‘সব শালা কবি হবে; পিঁপড়ে গোঁ ধরেছে, উড়বেই;/বন থেকে দাঁতাল শুয়োর রাজাসনে বসবেই।/যদি/হঠাৎ আকাশ ফুঁড়ে তৃতীয় বিশ্বের গঞ্জে-গাঁয়ে/হুট করে নেমে আসে জলপাই লেবাস্যা দেবতা;/পায়ে কালো বুট; হাতে রাইফেলের উদ্যত সঙ্গিন...’ মোহাম্মদ রফিক ওভাবেই তার কবিতার বিষয়-ভঙ্গি-উদ্দেশ্য সব পাল্টিয়ে ফেলেন। নিজের তৈরি করা জগৎকে চুরমার করে ভেঙে চোখ রাঙিয়ে ফোঁসফোঁস করে দাঁড়ান। তবু কী আশ্চর্য, বক্তব্যধর্মী কবিতাটিতেও কোথাও ছন্দপতন নেই, কোথাও একেবারে নগ্ন হয়ে বের হয়ে আসেনি কাব্যবস্তু, চলন মাত্রা গড়ন সব ঠিকঠাক।

সেই খোলা কবিতার পরপরই তিনি লেখেন কপিলা। মিথ, রূপকথা, লোককথার টুকরো টুকরো সমধর্মী উপাখ্যানকে আশ্রয় করে সমকালের দৈন্য হতাশা কূটনীতি নষ্টামি ক্ষুধা দারিদ্র্য গার্হস্থ্য এবং রাষ্ট্রকে নিয়ে বিশাল এক ক্যানভাস। অনেকগুলো কন্ট্রাস্ট, আইরনি, মেটাফোর, উৎপ্রেক্ষা... কখনো সব মিলে একটা মহাকাব্যিক ভাববিস্তার; কখনো একটি আখ্যান কখনো বা একটি নাট্যকাব্য... অনেকভাবেই কপিলাকে বর্ণনা করা যায়। কিন্তু কপিলা যা বলতে চায়, তার এককেন্দ্রিক অর্থগত টানের ভেতর দিয়ে তার আধুনিক কাব্যিক টেক্সচুয়াল মর্যাদা। নানান ছন্দে নানান মাত্রাবিন্যাসে কখনো অক্ষরবৃত্তে কখনো গীতলয়ে কখনো নিখাদ কঠিন গদ্যে কপিলার কাব্যশরীর বিন্যস্ত। এত এত ভাঁজ, কিন্তু কখনোই মনে হয় না, আমরা বিচ্যুত বা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছি। একটি বাস্তবতার রাজনৈতিক অভিমান ও ক্ষোভকে কবি অতীত ও বর্তমানের মিশেলে, অলীকপ্রায় ভাষিক পরম্পরার সাজে ঝলমলে করে তুলেছেন। বাংলা কবিতায় মলয় রায় চৌধুরীর জখম-এর কথা হয়তো মনে হতে পারে, কিন্তু সেটা শ্লেষের ধরনে, প্রেক্ষিতগুলোর ভূমি বিচারে নয়। জখম ছিল কেবল আধুনিক রাজনৈতিক মানুষের বিক্ষুব্ধ হৃদয়ের শ্লেষ, ব্যঙ্গ ও রূপকল্পময় হাহাকারের কাব্য, কপিলা সে ক্ষেত্রে অনেকগুলো উপাখ্যানকে নিয়ে একটি নির্দিষ্ট ভূগোলের প্রধান কিন্তু শ্রেণি-অর্থে তুচ্ছ মানবমণ্ডলীর ভাগ্য নিয়ে গড়া কাব্যিক মেটাফোর। বৈশ্বিক হানাহানি, যুদ্ধ ও স্নায়ুসংগ্রামের নানান ঘটনার পাশাপাশি বাংলার লৌকিক জীবনের ক্ষুধার নৈরাশ্যের অন্ধকারের পদাবলি কপিলা। এমে সেজায়ারের দেশে ফেরার খাতার সাথে কেবল তা তুলনীয় হতে পারে।

কাল রাতে জ্যোৎস্নার আদিম টানে উঠে চলে গাঙ/স্বপ্নের ভাঙনে ডোবে ঘুমের প্রাসাদ দুই পাড়.../রাতের কিনার ফুঁড়ে কালো জল চিৎকারে ফাটে/অন্ধকার নক্ষত্রের বিস্ফোরণ ছুঁয়ে ছোটো ডিঙি/গলুয়ে নিকষ মূর্তি ধরে আছে হাল/পাটাতনে ভাঙা চাল মাটির সানকি দুটো হাঁড়ি.../কপিলার জলজ সংসারে/ফোঁসে যক্ষপুরী/আন্ধা কালা কুয়োর বসত ছিঁড়ে লক্ষ-লক্ষ কেউটের ছোবল/ভেলার ভাসান জুড়ে ফণা তোলে নিশুত শিথানে/এলোকেশে ঢেকে যায় ধানখেত শস্যের আবাদ ভূমি ভুবনডাঙায়...’ কপিলার বিষাদমণ্ডল ছেড়ে আদিবাসী ধর্ষিতা মেয়ে মাতি কিসকুকে নিয়ে তার নামেই কবিতা লেখেন রফিক। জাতিরাষ্ট্রের অবক্ষয় ও দাপটকে যেন চ্যালেঞ্জ করেন তিনি। নিজেকে কাঠগড়ায় দাঁড় করান। সে কাঠগড়ার সামনে দাঁড়ানো একমাত্র সেই মেয়েটিই মাতি কিসকু। যে দুরন্ত স্পর্ধায়, শ্লেষে কবিকে ডাকে :/ কবি ওই দঙ্গল থেকে উঠে এসো, ওখানে তোমার কী কাজ!’ টিয়ে রং জ্যোৎস্নার উঠানে সে ডাকে কবিকে। সে তার বুকে কান পেতে শুনতে বলে মাংসের পাতিলজুড়ে যেখানে ভাত ফুটছে! কবি আহত হন, দিশাহারা হন না। তিনি আত্মশ্লাঘা ভরে বলতে পারেন: আমূল বন্য বৃক্ষের শূল বিঁধে গেছে পিঠে পাঁজরায় স্বদেশমৃত্তিকা।

উপমাপ্রয়োগের ধরন, ভাষা-ব্যবহারের ভঙ্গি, রূপ-নির্মাণের কারিগরি, বিষয়-ভাবনার সূত্র কোনোটাতেই রফিক ঔপনিবেশিক নন। উপনিবেশের বর্তমান ইশারাই হলো ব্যক্তিক হীনম্মন্যতার বীজ পুষে রাখা, আত্মবিকাশ ও প্রকাশের অনুকূল-প্রতিকূলকে বুঝে নিজস্ব হতাশা ও নৈরাশ্যের বিস্তার ঘটানো এবং সর্বোপরি নিজের সবকিছুকে নিয়ে দোনোমনার অবসাদ। সে জন্যই ঔপনিবেশিক কবিরা নিজেকে বিচ্ছিন্ন কোনো সত্তা ভেবে ভূগোল জমিনদেশবিহীন এক অন্ধপ্রকোষ্ঠে নিক্ষেপ করে আত্মরতির সুধা পান করে বেদনা-ভোলানো-আনন্দ পান। মোহাম্মদ রফিক একটিবারের জন্যও সেই প্রকোষ্ঠে ঢোকেননি। বরং প্রতিমুহূর্তে সমঝোতা আর মোকাবিলা করেছেন সামষ্টিক জীবনের সুন্দর আর বৈকল্যের সঙ্গে। সে জন্য তার চাঁদ ‘পদ্মা-যমুনার বালুজল মাখামাখি খাটে বিছানো শয্যায়/মধ্যরাতে আড়াআড়ি শুয়ে থাকে (ঘাট আরিচায়) কিংবা তা তারপরওএখনও আশা নিয়ে ঝোপের আড়ালে ‘ধুতুরার বোঁটা ছুঁয়ে পাপড়ি মেলে’। তাই দেশকে তিনি নিজের (একজন কবির) কাব্যতৎপরতার নিয়ামক হিসেবে দেখেননি, কবিতার বিষয় বা ভাব হিসেবে দেশ-এর সামনে নিজেকে নান্দনিক কারিগর হিসেবে বসিয়ে তাকে রোমান্টিক বা সিম্বলিক কিছু করে তোলেননি; ক্রম সঞ্চরণশীল, ক্রিয়াশীল, জৈবনিক আধার ভূগোল হিসেবে তার সকল সংঘটনকে অবশ্যই একটি বিশেষ অঞ্চলের ভূ-সাংস্কৃতিক (Echosocial) প্রেক্ষাপটে এবং তা বাংলাদেশের প্রতীকী সামগ্রিক রূপ হিসেবে নান্দনিক ও দার্শনিক প্রেক্ষিত থেকে নতুন করে চেনানোর প্রয়াস করেছেন এবং তা করতে গিয়ে নিজের মতো করে একটি ভাষাকেও ভালোবেসেছেন, প্রতিষ্ঠা করেছেন এক বিষয়-আস্তীর্ণ ভাষা (Content-dominated language), বিষয়ী-শাসিত ভাষা (Form-dominated language) নয়।

সেই ভাষা আর বয়ানরীতিকে তিনি অন্তিমেও ছাড়েননি। শেষদিককার রচনা গাথাকাব্যতেও তার চূড়ান্ত প্রকাশ দেখা যায়। ‘তুমি-আমি, অভিশাপ বয়ে-বয়ে ফিরি,/লখিন্দর ও বেহুলা, নদ্যা ও মহুয়া, একই কথা,/কিংবদন্তি রূপকথা উপকাহিনির,/এক যুগে একখানে সাপ অন্য যুগে অন্যখানে ছুরি/যুগান্তরে একখানে বিষ যুগে-যুগে অন্যখানে রক্ত/অভিশাপ তবু মুক্ত হয় না কখনো...’ (অভিসার, অভিষেক)

যেন সমকালের দেশ, রাষ্ট্র, বিশ্ব, রাহুর আগ্রাস, অবিচল নঞর্থক বেগ, মানুষের অসহায়ত্ব, প্রেমের সংবেদনের পরিহাস, ব্যর্থতাই দায়ী হয়ে ওঠে কবির কলমে। মিথের ভেতর থেকে কেবল পুরাণের বা লোকায়তের প্রসঙ্গকে আপ্ত করে নয়, পুরাণের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত নিজের সমস্ত বর্তমান, তার আত্মা, তার শরীর, বাসনা সবকিছুকে খুঁজে বুঝে এবং যুঝে মোহাম্মদ রফিক আধুনিককালের এই ধ্রুপদি কাব্যদ্বয় রচনা করলেন। হ্যাঁ, ধ্রুপদি তো নিশ্চয়ই। সুসংযত রীতি, গাম্ভীর্যপূর্ণ ভাষা আর ঐতিহ্যের অনুবর্তনের যেসব শর্তে খচিত ধ্রুপদিবাদ, তার মণিদীপ্ত স্মারক মোহাম্মদ রফিকের কাব্যে জ¦লজ¦ল করছে সততই।

অন্য অনেক নন্দনকারের মতোই রবীন্দ্রনাথও বলেছিলেন, ক্ল্যাসিক মানে একটি সর্বাঙ্গসুন্দরতার পারফেকশনের ফর্মে অবিচল প্রতিষ্ঠা। মোহাম্মদ রফিক তার জীবনের আদি-অন্ত সেই ক্ল্যাসিক বা ধ্রুপদি ধারারই অনুবর্তী ছিলেন। তবে সেই অনুগমন চিরায়ত ঐতিহ্যের স্ফটিকবিছানো পথে পথে নয়; বাংলার মেঘ-কাদা-জলের, ঝড় ও ঝঞ্ঝার মানবান্বিত চলমান আখ্যানকে কাব্য করে তোলার ভাঙাচোরা চলন-রেখা বেয়ে। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত