হালকা প্রকৌশল শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে বিদ্যমান শুল্ক নীতিমালা খাতটির বিকাশে তেমন উৎসাহব্যঞ্জক নয় বলে মনে করে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। এমতাবস্থায় হালকা প্রকৌশল খাতের কাক্সিক্ষত বিকাশ নিশ্চিতকল্পে সহায়ক শুল্ক কাঠমো নিশ্চিতকরণ একান্ত আবশ্যক।
গতকাল ডিসিসিআই আয়োজিত ‘বাংলাদেশের আমদানি বিকল্প শিল্প : প্রেক্ষিত হালকা-প্রকৌশল খাত’ শীর্ষক সেমিনারে এ কথা বলেন সংগঠনটির সভাপতি ব্যারিস্টার মো. সামীর সাত্তার। সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। এছাড়াও শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকিয়া সুলতানা উক্ত অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
স্বাগত বক্তব্যে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি ব্যারিস্টার মো. সামীর সাত্তার বলেন, হালকা প্রকৌশল শিল্পের বিকাশে সহায়ক নীতি সহায়তা প্রদান করা সম্ভব হলে আমাদের স্থানীয় খাদ্য, চামড়া ও পাদুকা, ইলেকট্রনিক্স, এগ্রো-প্রসেসিং এবং ওষুধ শিল্পের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ খাত হিসেবে স্থানীয় চাহিদা মেটাতে সক্ষম হবে। পাশাপাশি এ খাত থেকে রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ সম্ভব। তিনি বলেন, এ খাতের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতকল্পে সরকার ‘শিল্পনীতি ২০২২’ এ খাতটিকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তবে এখন প্রয়োজন আর্থিক ও নীতি সহায়তা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, হালকা প্রকৌশল খাতে দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, মালয়েশিয়া, চীন ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে এবং বাংলাদেশও সঠিক পথেই রয়েছে। এখন প্রয়োজন যথাযথ নীতিসহায়তা এবং এর সঠিক বাস্তবায়ন। এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে সব সহযোগিতা প্রদান করা হবে।
পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, সরকারি পর্যায়ে নীতিসহায়তা নিয়ে সমন্বয়হীনতার কারণে শিল্প খাতের বিকাশ স্তিমিত হয়ে যায়, যেটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। মৌলিক মেশিনারিজ উৎপাদনে আমাদের সক্ষমতা আরও বাড়াতে প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা আবশ্যক বলে মন্ত্রী মত প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ধোলাইখাল, জিঞ্জিরাসহ তৃণমূলের উদ্যোক্তাদের উৎসাহ বৃদ্ধিতে আরও বেশি নজর দিতে হবে।
শিল্প সচিব জাকিয়া সুলতানা বলেন, ‘লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ডেভেলপমেন্ট পলিসি ২০২২’-এ ২০২২-২৭ সালের জন্য একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে, যেটি এ খাতের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এ খাতের আমদানিনির্ভরতা কমাতে উদ্যোক্তাদের আর্থিক প্রণোদনা ও নীতিসহায়তা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, এ খাতে দক্ষ মানব সম্পদ তৈরিতে আমাদের বিদ্যমান শিক্ষা কার্যক্রমের সংস্কার ও যুগোপযোগীকরণের কোনো বিকল্প নেই। শিল্প সচিব বলেন, অটোমোবাইল খাতের রিসার্চ ইনস্টিটিউট স্থাপনে ইতিমধ্যে জাপানের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং আশা করেন এ ব্যাপারে প্রযুক্তি ও অবকাঠামো সহায়তা পাওয়া যাবে।
ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম শোয়েব হোসেন নোবেল সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় বলেন, বাংলাদেশের হালকা-প্রকৌশল খাত থেকে বার্ষিক আয় বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। জিডিপিতে এ খাতের অবদান ৩ শতাংশ এবং প্রতিবছর এ খাতটি ১০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ খাতে প্রায় ১৬ লাখ লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং স্থানীয় চাহিদার প্রায় ৫০ শতাংশ আমরা উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছি।
বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফেকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন ও আনোয়ার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মনোয়ার হোসেন বলেন, আমাদের মানব সম্পদের সক্ষমতা বাড়াতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, সরকারি-বেসরকারি খাতের সমন্বয় ও আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ফেয়ার গ্রুপের প্রধান মার্কেটিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ মেছবাহ উদ্দিন বলেন, ২০৩০ সালে আমাদের স্থানীয় হালকা-প্রকৌশল শিল্পটি ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের শিল্পে পরিণত হবে। এ খাতের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য শিক্ষা খাতের সংস্কার, নীতিসহায়তা ও নীতির ধারাবাহিকতা একান্ত আবশ্যক, যা স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। তবে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ সহায়তার জন্য বিদেশি বিনিয়োগ এ খাতে খুবই জরুরি বলে তিনি মতপ্রকাশ করেন।
মেঘনা গ্রুপের পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তাক আহমেদ তানভীর বলেন, ইউরোপীয় বাজারে প্রতিবছর ৫০ লাখ বাইসাইকেলের চাহিদা রয়েছে, যেখানে আমাদের উৎপাদিত বাইসাইকেল রপ্তানির প্রচুর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, বাইসাইকেলের রপ্তানির জন্য আমাদের টেস্টিং ল্যাব নেই, যার কারণে বিদেশের ল্যাবসমূহে উৎপাদিত পণ্যের টেস্টিং-এর প্রতিবেদন পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। এমতাবস্থায় দেশে আন্তর্জাতিক মানসম্মত একটি টেস্টিং ল্যাব স্থাপনে সরকারি বিনিয়োগ খুবই জরুরি বলে তিনি মতপ্রকাশ করেন।
ট্রান্সকম ইলেকট্রনিক্স লিমিটেডের এমডি ও সিইও আরশাদ হক বলেন, এ শিল্পের বিকাশে কমপক্ষে ১০ বছর মেয়াদি নীতিসহায়তা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি বৈশি^ক সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থায় নিজেদের সম্পৃক্তকরণ অতীব জরুরি। তিনি জানান, আমেরিকাভিত্তিক ওয়ার্লপুল ইতিমধ্যে যৌথভাবে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেছে।
