বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী বেশিরভাগ জাপানি কোম্পানি দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। জাপান এক্সটারনাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) এক জরিপে প্রায় ৭১ শতাংশ কোম্পানি এমন অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। তবে ব্যবসায়িক পরিবেশ নিয়ে এমন অসন্তুষ্টির মধ্যেও ৭২ শতাংশ কোম্পানি বাংলাদেশে তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণের আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
গতকাল বুধবার ঢাকার মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) গুলশান কার্যালয়ে উপস্থাপিত ওই জরিপে এমন তথ্য উঠে এসেছে। বাংলাদেশে কার্যক্রম চালানো ২১৪টি জাপানি কোম্পানির ওপর জরিপ চালানো হয়।
এই জরিপে বাংলাদেশে কার্যক্রম চালানো জাপানি কোম্পানিগুলোর মধ্যে ৭০ দশমিক ৮ শতাংশ জানিয়েছে, তারা এখানকার সাধারণ ব্যবসায়িক পরিবেশ নিয়ে অসন্তুষ্ট। তাদের মধ্যে ২৬ দশমিক ২ শতাংশ বেশি অসন্তুষ্ট এবং ৪৪ দশমিক ৬ শতাংশ সামান্য অসন্তুষ্ট।
জরিপে অংশগ্রহণকারী প্রায় ৭৩ শতাংশ জাপানি কোম্পানি বাংলাদেশের জটিল কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স প্রক্রিয়াকে ব্যবসায়িক কার্যক্রমের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে অভিহিত করেছে। এর পরে আছে-বিদেশি মুদ্রাবিনিময় হারের অস্থিরতা, স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশ কেনার সমস্যা এবং বিদ্যুতের ঘাটতি।
গতকাল এমসিসিআই ও জেট্রো এশিয়া ও ওশেনিয়ায় জাপানি কোম্পানিগুলোর ব্যবসার অবস্থার ওপর জেট্রো সমীক্ষার ওপর একটি ব্রিফিং এবং আলোচনা সেশনের আয়োজন করে। জরিপের তথ্য প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান লোকমান হোসেন মিঞা। স্বাগত বক্তব্য দেন এমসিসিআই সভাপতি সাইফুল ইসলাম। বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত ইওয়ামা কিমিনোরি অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন। জেট্রো ঢাকার কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ ইউজি আন্দো মূল প্রেজেন্টেশন দেন। জেট্রোর জরিপে বলা হয়েছে, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়ার ৬০ শতাংশ জাপানি কোম্পানি ব্যবসায়িক পরিবেশ নিয়ে খুবই ইতিবাচক তথ্য দিয়েছে। ভারতের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ও নেতিবাচকের অনুপাত প্রায় একই ছিল।
জেট্রোর কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ ইউজি আন্দো বলেন, গত বছরের ২২ আগস্ট থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই জরিপ চালানো হয়। জরিপে প্রায় ৪ হাজার ৪০০ কোম্পানির মতামতকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। বাংলাদেশে অবস্থানরত প্রায় ২১৪টি জাপানি কোম্পানিও এই জরিপে অংশ নেয়। এশিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চলের দেশগুলোতে কর্মরত জাপানি কোম্পানিগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে আছে।
তিনি আরও বলেন, ভারতে কর্মরত জাপানি কোম্পানিগুলো বাজারের আকার ও ব্যবসা বৃদ্ধির সম্ভাবনার প্রশংসা করেছে। একইভাবে ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের কোম্পানিগুলোও উচ্চ প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা করছে। বাংলাদেশে প্রায় ৬২ শতাংশ জাপানি কোম্পানি ২০২৩ সালে মুনাফা অর্জনের আশা করছে।
ইউজি আন্দো বলেন, কম্বোডিয়া ও পাকিস্তানের কোম্পানিগুলোও বর্তমান বাজারের তুলনায় প্রবৃদ্ধির বাড়বে বলে প্রত্যাশা করছে। বাংলাদেশের বাজারেও জাপানি কোম্পানিগুলোর প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা আছে। তিনি বলেন, জাপান ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) দ্বিপক্ষীয় ব্যবসার উন্নতিতে সহায়তা করতে পারে।
জেট্রোর জরিপে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে কাজ করছে এমন ৭২ শতাংশ জাপানি কোম্পানি এক বা দুই বছরের মধ্যে তাদের ব্যবসার সম্প্রসারণ করতে চায়।
এমসিসিআই সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, জাপানি কোম্পানিগুলো বাংলাদেশসহ সমগ্র এশিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চলের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তিনি নিয়মিত গবেষণা এবং ফলাফলের প্রচারের জন্য জেট্রোর প্রশংসা করেন। মহামারী এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব থাকা সত্ত্বেও, বাংলাদেশ জাপানি কোম্পানিগুলোর জন্য একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠেছে, তাদের মধ্যে প্রায় ৩৫০টি যৌথভাবে ৩৮০ মিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে। ২০২২ সালে বাংলাদেশে জাপানিদের বিনিয়োগ ১০০ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশে ব্যবসায়িক অবস্থার উন্নতি, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে, যার ফলে উভয় দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উদ্দীপিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
প্রধান অতিথি লোকমান হোসেন মিয়া বাংলাদেশের উন্নয়নে জাপানের প্রচেষ্টা এবং জাপানের বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে আসার আগ্রহের প্রশংসা করেন। তিনি বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশকে আরও বিনিয়োগকারীবান্ধব করে তোলার লক্ষ্যে বিডার সাম্প্রতিক কাজ সম্পর্কে একটি ধারণা দেন। লোকমান হোসেন বিডার ওয়ানস্টপ সার্ভিস পোর্টাল ব্যবহারের ওপর জোর দেন, যেখানে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও বেশি সেবা যুক্ত করা হচ্ছে। বর্তমানে বিডা সমুদ্র ও বিমানবন্দরে শুল্ক ছাড়পত্রের সময় কমাতেও কাজ করছে বলে জানান।
বিশেষ অতিথি জাপানের রাষ্ট্রদূত ইওয়ামা কিমিনোরি একটি সরকারি-বেসরকারি অর্থনৈতিক সংলাপের জন্য যৌথ কর্মপরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। তিনি জাপানের ভিসার ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী সামলানোর আশ্বাস দেন। তিনি বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়নে জাপানের অব্যাহত প্রতিশ্রুতি ও প্রচেষ্টার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচনায় অন্য বক্তারা মুনাফার বাহ্যিক প্রত্যাবর্তন, ঋণপত্র খোলা এবং সব পর্যায়ে বিনিয়োগ প্রণোদনা বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন। তারা আশা প্রকাশ করেন, ব্যবসায়িক অবস্থার উন্নতি হলে ২০৩০ সালের মধ্যে জাপানে বাংলাদেশের রপ্তানি ১০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
