‘আমরা এক দশক ধরে ঈদ বা অন্য কোনো উৎসব পালন করতে পারি না। এটা আমাকে অনেক কষ্ট দেয়। কেন আমি ঈদ করতে পারি না, কেন বাবার সঙ্গে বৈশাখী মেলায় যেতে পারি না। আমি আর নিখোঁজ হওয়ার দিনটি পালন করতে চাই না’ অত্যন্ত ভারাক্রান্ত কণ্ঠে এই কথাগুলো বলছিলেন নিখোঁজ বংশাল থানা ছাত্রদলের সভাপতি মো. সোহেলের মেয়ে সাফা।
সোহেল যখন নিখোঁজ হন, তখন তার মেয়ে সাফার বয়স ছিল মাত্র ২ মাস। সাফার বয়স এখন ১০ বছর, তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ছে। বাচ্চাদের অনেকে বাবার হাত ধরে স্কুলে যায়, বাবাকে নিয়ে গল্প বলে। সাফা বাসায় ফিরে প্রশ্ন করে বাবা কোথায়? বায়না ধরে, বাবার সঙ্গে স্কুলে যাবে। উত্তর দিতে পারেন না সাফার মা নিলুফার ইয়াসমিন।
গতকাল বুধবার রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমার অডিটোরিয়ামে বাংলাদেশে নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের স্মরণে এক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন সাফা। আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে ‘মায়ের ডাক’ এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এদিকে নানান কর্মসূচি পালনের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক গুম দিবস পালন করেছে বিএনপি। দিবসটি উপলক্ষে প্রধান কর্মসূচি ছিল নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। সেখানে মুখে কালো কাপড় বেঁধে মানববন্ধন করেছেন দলের নেতাকর্মীরা।
মায়ের ডাক অনুষ্ঠানে শুধু সাফা নয় বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা পরিবারের সদস্যরা কথা বলেন। এদের মধ্যে এসেছেন কারও সন্তান, স্ত্রী, মা, বোন। সবারই একটাই প্রার্থনা, অন্তত তাদের পরিবারের সদস্যদের যেন ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
নিখোঁজ ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেন বাতেনের ১৭ বছরের মেয়ে আনিশা ইসলাম ইনশা। ২০১৯ সালে রাজধানীর শাহ আলী এলাকা থেকে এই ব্যবসায়ী নিখোঁজ হন এবং তার পরিবার নিখোঁজের জন্য একজন র্যাব কর্মকর্তাকে দায়ী করে। অনুষ্ঠানে আনিশা বলেন, ‘আমার বাবা নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে আমরা তার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। তখন আমার ছোট ভাইয়ের বয়স মাত্র দুই বছর। তবে নিখোঁজের বিষয়ে সে এখন জানতে চায়। সে জিজ্ঞেস করে বাবা কি এখনো বেঁচে আছে? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি আমার ভাইয়ের প্রশ্নের উত্তর কীভাবে দেবেন?’
এই অনুষ্ঠানের জন্য জায়গা পেতে সংগঠনটিকে বিভিন্ন জায়গা থেকে অস্বীকৃতি জানানো হয়েছে বলে দাবি করেন মায়ের ডাকের কো-অর্ডিনেটর আফরোজা ইসলাম আঁখি। তিনি বলেন, আমরা প্রেস ক্লাব কর্তৃপক্ষের কাছে গিয়েছিলাম, তারপর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট এবং কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট যখনই শুনেছে আয়োজক মায়ের ডাক তারা অস্বীকার করেছে। শেষ পর্যন্ত আমরা এত বাধার পরে আইডিইবি ভবনের অডিটোরিয়াম পেয়েছি।
এদিকে এই অনুষ্ঠান চলাকালে অডিটোরিয়ামের বাইরে কিছু বহিরাগত লোকজনের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে। তবে এ বিষয়টি নিয়ে সুনির্দিষ্ট করে আয়োজকরা কিছু জানাতে পারেনি।
মায়ের ডাকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা সানজিদা ইসলাম তুলি বলেছেন, ‘জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার নথিভুক্ত নথিপত্রে গত ১৪ বছরে মোট ৬৫৯টি বলপূর্বক গুমের ঘটনা ঘটেছে। পরিসংখ্যানটি বাস্তবে তার চেয়ে তিনগুণ বেশি হবে।’
অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, শুধু ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য মানুষকে গুম করা হয়েছে। অবৈধভাবে ক্ষমতায় থাকার জন্য তাদের হত্যা করা হয়েছে। যারা বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে তাদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য, বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য, বাংলাদেশের ব্যাংক লুটপাট করার জন্য, লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করার জন্য এই গুমগুলো করা হয়েছে। ভিন্ন মতের মানুষদের মনে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করার জন্য এইসব করা হয়েছে।
মায়ের ডাকের এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার লোহার হার্ট আছে। সি ইজ রিয়েলি হার্টলেস। আমি দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ করেছি, কিন্তু তার হার্ট আছে এমন আমি কখনো দেখিনি। অভিনয় করে কথাবার্তা বলেন। কিন্তু এই কান্না তার কাছে যায় না। যে নেত্রী বলেন যখন ডিমের দাম কম থাকবে, তখন সেদ্ধ করে তা ফ্রিজে রাখবে। হাউ স্টুপিড।
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জুনায়েদ সাকি বলেন, এই সরকার বাসে আগুন দেওয়া, হাতে অস্ত্র ধরিয়ে দেওয়া, মাদক ধরিয়ে দেওয়াসহ নানা ধরনের চক্রান্তের জালসহ সবকিছু করবে। কিন্তু তার বিরুদ্ধে মানুষের শক্তি নিয়ে আমরা রাজপথে দাঁড়াব। তাদের সব শক্তিকে আমরা নস্যাৎ করে দেব সেই শপথ আমাদের নিতে হবে।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, আমরা কোনো প্রতিশোধের রাজনীতি করি না। কিন্তু যারা খুনি ডাকাত এবং প্রতিটি গুমের সঙ্গে দায়ী তাদের বিচার করা হবে। দেশকে আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক ধারায় নিয়ে যাব। সেই লড়াইয়ে আমরা গুম হওয়া পরিবারের সবার সঙ্গে ভাই-বন্ধু হিসেবে এগিয়ে যাব।
গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর বলেন, সব সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু সমাধান একজন। তিনি অমরত্ব লাভ করার জন্য আজীবন ক্ষমতায় থাকতে চান। এজন্য বিরোধী দল নির্মূল করার জন্য তার একটা টার্গেট থাকবেই। আগামী দুই মাসের মধ্যে বাংলাদেশের জনগণের ভাগ্য নির্ধারিত হবে।
মায়ের ডাকের আয়োজনে আরও বক্তব্য রাখেন বিএনপির মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান আসাদ, গুমের শিকার আব্দুল বাসেদ মারজান, বিএনপি নেতা তাবিথ আউয়াল, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির স্থায়ী কমিটির সদস্য তানিয়া রব।
অশ্রুসজল স্বজনদের দাবি গুম হওয়াদের ফেরত দিন : গতকাল বুধবার বিকেলে কার্যালয়ের সামনে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপি যৌথভাবে আয়োজিত মুখে কালো কাপড় বেঁধে মানববন্ধন কর্মসূচিতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, গুম হওয়া পরিবারের কান্না আজ সবার হৃদয়ে স্পন্দন সৃষ্টি করলেও সরকার সে কান্নার শব্দ শুনতে পায় না। তারা বলছে, এই গুম দিবস চাই না। বাবা দিবস চাই। এই বলে অঝোরে অশ্রু ঝরছে। এই নিষ্পাপ শিশুর অশ্রুর জলে ভেসে যাবে ক্ষমতাসীন বাকশালি সরকার।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লা বুলু বলেন, গুম হত্যার বিচার চাইলে সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরাতে হবে। আগামীতে জাতীয় সরকার গঠন করতে পারলে আওয়ামী লীগ সরকারের সব অপকর্মের বিচার করা হবে।
বিকাল ৩টা থেকে এক ঘণ্টার এই মানববন্ধনে কার্যালয়ের সামনের সড়কের একপাশে নেতাকর্মীরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ মানবপ্রাচীর তৈরি করে। মুখে কালো কাপড় বেঁধে নীরব মানববন্ধন করে কয়েক হাজার নেতাকর্মী ও গুম হওয়া পরিবারের সদস্যরা। নয়াপল্টন থেকে কালো পতাকা মিছিলের কথা থাকলেও পরে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে বিএনপি।
ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমান উল্লাহ আমানের সভাপতিত্বে এতে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা বরকত বুলু, আব্দুস সালাম, রুহুল কবির রিজভী, শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী প্রমুখ। দিবসটি উপলক্ষে রাজধানী ছাড়াও সারা দেশে মহানগর ও জেলা পর্যায়ে দলের নেতাকর্মীরা মুখে কালো কাপড় বেঁধে মৌন মিছিল করে।
এদিকে বুধবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে জাতীয়তাবাদী গণতন্ত্র পরিষদের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক গুম দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সমাবেশে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, বিএনপি সরকার থাকলে দেশে ৭০০ এর বেশি মানুষ গুম এবং নিখোঁজ হতো না, নির্বিচারে মানুষ হত্যা করা হতো না।
সংগঠনের সভাপতি মোক্তার আখন্দের সভাপতিত্বে সমাবেশে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা হাবিবুর রহমান হাবিব, সেলিম ভুঁইয়া প্রমুখ।
এছাড়া ফেনী, দিনাজপুর ও ময়মনসিংহ বিএনপি গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের স্মরণে মুখে কালো কাপড় বেধে মানবন্ধন ও সমাবেশ করেছে।
