প্রধান বিচারপতি

বিচার বিভাগের প্রতি আস্থা হারালে খারাপ দিনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে

আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০২৩, ০২:১৮ পিএম

প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী বলেছেন, বিচার বিভাগ প্রজাতন্ত্রের হৃদপিণ্ড। একটি জাতির শাসন বিভাগ বা আইন বিভাগের প্রতি মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলতে পারে। কিন্তু বিচার বিভাগের প্রতি আস্থা হারালে খারাপ দিনটির জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তিনি আরও বলেন, ‘আইন যদি দরিদ্রকে পিষে দেয় আর ধনী ব্যক্তি যদি আইনকে পিষে দেয় তাহলে রাষ্ট্র এবং বিচার বিভাগ সঠিকভাবে চলছে এটা কোনভাবেই বলা যাবে না।’ রাজনৈতিক বিভক্তি বিচারালয় মুখী হলে বিচারালয়ের জন্য সেটা মঙ্গলজনক হয়না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বিচারিক জীবনের শেষ কর্মদিবসে গতকাল বৃহস্পতিবার তাকে দেওয়া বিদায়ী সম্বর্ধনায় এসব কথা বলেন প্রধান বিচারপতি।

২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর দেশের ২৩ তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর অবসরে যাবেন তিনি। তবে, এই সময়ে সুপ্রিম কোর্টের অবকাশ (৩ সেপ্টেম্বর থেকে ৭ অক্টোবর) থাকবে। সে হিসেবে গতকাল ৩১ আগস্ট ছিল তার বিচারিক জীবনের শেষ কর্মদিবস। এ উপলক্ষে সকালে সুপ্রিম কোর্টের ১ নম্বর এজলাস কক্ষে তাকে বিদায়ী সম্বর্ধনা দেয় অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি (সুপ্রিম কোর্ট বার)। প্রথমে অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন প্রধান বিচারপতির উদ্দেশ্যে তার কর্মময় জীবনের বর্ণনা দিয়ে বক্তব্য দেন। এরপর সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি মোমতাজ উদ্দিন ফকির প্রধান বিচারপতির উদ্দেশ্যে বক্তব্য দেন। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অপর ছয় বিচারপতি ও হাইকোর্টের বিচারপতিগণ এ সময় এজলাসে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া জ্যেষ্ঠ আইনজীবীসহ অপর আইনজীবীরাও এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘বিচার বিভাগ প্রজাতন্ত্রের হৃদপিণ্ড। রাষ্ট্রের বিচার বিভাগের দক্ষতার চেয়ে শ্রেষ্ঠত্বের আর কোন উপযুক্ত পরীক্ষা নেই। একটি জাতির জনগণ শাসন বিভাগ বা আইন বিভাগের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলতে পারে কিন্তু বিচার বিভাগের প্রতি আস্থা হারালে সে জাতিকে খারাপ দিনটির জন্য অপেক্ষা করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘আইনের নিরঙ্কুশ আধিপত্য বা প্রাধান্য কার্যকর করার দায়িত্ব বিচার বিভাগের। বিচার বিভাগ যদি আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ করতে ব্যর্থ বা পিছপা হয় তাহলে রাষ্ট্র এবং নাগরিক ক্ষতিগ্রস্ত হতে বাধ্য।’

বিচারক ও আইনজীবীদের উদ্দেশ্যে বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী বলেন, ‘সাংবিধানিক বিধান দিয়ে সর্ব প্রকার সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক প্রভাব থেকে বিচার বিভাগকে মজবুত দেওয়াল দিয়ে রক্ষা করার দায়িত্ব বিচারকদের, আইনজীবীদের এবং রাষ্ট্রের প্রত্যেক দায়িত্বশীল নাগরিকের। আমরা, আপনারা, সবাই সে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে সর্বনাশা দিনের জন্য প্রতিটি নাগরিকের অপেক্ষা করতে হবে।’

রাজনৈতিক ও আইনজীবীদের বিভক্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক বিভক্তি রাজপথ অতিক্রম করে বিচারালয় অভিমুখে ধাবিত হলে সেটা বিচারলয়ের জন্য মঙ্গলজনক হয়না। আমাদের মনে রাখতে হবে, আইনজীবীদের বিভক্তি ও মতভেদ এবং তার প্রতিক্রিয়া বিচারালয়কে ক্ষতিগ্রস্ত করে। রাজনৈতিক মতাদর্শ রাজনৈতিকভাবে বাস্তবায়ন করলে এবং বিচারালয়কে নিরাপদ দূরত্বে রাখলে বিচার বিভাগ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।’ আইনগত কার্যক্রম সাংবিধানিক ও চেতনার প্রতিফলন নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মানুষ চায় শান্তি আর শান্তি। কিন্তু পরিপূর্ণ শান্তির জন্য আমাদের এখনও অনেকটাই এগুতে হবে। আমাদের আঁকা-বাঁকা জায়গাগুলোকে সোজা করতে হবে।’

বিচারক ও আইনজীবীদের দায়িত্বের বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘সংবিধান প্রণেতারা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা করেছেন-সে স্বাধীনতা কার্যকর করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গের এবং প্রতিটি নাগরিকের। এ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে ৭১ এর রক্ত বৃথা যাবে। মনে রাখতে হবে জনগণের ঐক্যবদ্ধ বীরত্ব এবং সর্বোচ্চ ত্যাগের বিনিময়ে আমরা এই দেশ, এই বিচারালয়কে পেয়েছি। আমাদের জাতীয় দায়িত্ব হলো সর্বক্ষেত্রে সেই দেশকে এগিয়ে নেওয়া। আমরা ব্যর্থ হলে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।’

বিচারকদের নৈতিকতার অধিকারী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রতিটি আইনে মানবিকতার স্পর্শ থাকতে হবে। শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য শক্তিশালী ও স্বাধীন বিচার বিভাগ অপরিহার্য। গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো আইনের শাসন এবং বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা আর বিচারকদের রাজনৈতিকভাবে বয়ে যাওয়া হাওয়া থেকে নিজেদের মুক্ত রেখে, সংবিধান, আইন নিজেদের বিচারিক বিবেকের প্রতি পরিপূর্ণ অনুগত থেকে বিচারকার্য সমাধান করা। বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় জনগণের অগাধ আস্থা স্থাপন করতে হবে এবং থাকতে হবে নইলে জনগণের অধিকার রক্ষা হবেনা এবং স্বাধীনতাও বিপন্ন হবে। সব বিচারককে অসামান্য নৈতিকতার অধিকারী হতে হবে, নইলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা শুধুমাত্র সংবিধানের ভিতরই আবদ্ধ থাকবে।’

রাজনীতিবিদ ও আইনজীবীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘আমি রাজনীতিবিদ আইনজীবীগণকে অনুরোধ করবো বিচারালয়ের ভাবমূর্তি নষ্ট করে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে রাষ্ট্র সৃষ্টিতে ত্যাগের কথা অন্তত ১০ বার ভাববেন, কারণ আপনাদের সিদ্ধান্তে ভুল হলে শেষ বিচারে তাতে রাষ্ট্রের ক্ষতি হয়। ক্ষতি হয় বিচার বিভাগের। বিজ্ঞ আইনজীবীদের সেই শক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে, যে শক্তি বিচারালয়কে দুর্বল করে, যে শক্তি গণতান্ত্রিক জীবন-যাপন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের সবসময় মনে রাখতে হবে জনগণের দৃষ্টি কিন্তু অতীব প্রখর। তাদের হৃদয় আছে, মন আছে, অনুভূতি আছে। আমরা কি করছি তারা সব কিছু বুঝতে পারে এবং তাদের বোঝার ক্ষমতা আছে। ন্যায় বিচার, মানবিকতাবোধ এবং আচরণ দিয়েই বিচারকদের বাংলাদেশের প্রত্যেক মানুষের হৃদয়ে নিজেদের স্থান খোদাই করতে হবে। আমি আমার বিচারকদের বলবো সাহসী, উদার, ধৈর্যশীল, নম্র এবং চিন্তাশীল হতে এবং হতে হবে উদ্যমী, দয়ালু, প্রজ্ঞাবান, সুবিচার করার দৃঢ় প্রত্যয়। একজন রাজনীতিবিদ পরবর্তী নির্বাচনের কথা ভাবেন, একজন রাষ্ট্রনায়ক পরবর্তী প্রজন্মের কথা ভাবেন আর একজন বিচারককে ভাবতে হবে সংবিধান ও আইনানুযায়ী ন্যায় বিচার করার কথা।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত