গত ২৪ বছরে বাংলাদেশ বাহকবাহিত ঝুঁকিপূর্ণ অনেক সংক্রামক ব্যাধি নির্মূল ও নিয়ন্ত্রণ করেছে। এর মধ্যে কালাজ্বর নির্মূলে সময় লেগেছে এক দশক। আর ফাইলেরিয়া বা গোদরোগ নির্মূলে লেগেছে দেড় যুগ। নির্মূল হয়ে এসেছে ম্যালেরিয়াও। নির্মূলের পথে কলেরা, যক্ষ্মা ও কুষ্ঠর মতো সংক্রামক ব্যাধিও। শুধু ডেঙ্গুই নিয়ন্ত্রণে আসছে না। উল্টো এই রোগটি এখন বাংলাদেশে স্থায়ী সংক্রামক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে।
একসময়ের ঢাকাকেন্দ্রিক ডেঙ্গু এখন ছড়িয়ে পড়েছে দেশের সব জায়গায়। প্রাদুর্ভাবের সময়কাল বেড়ে এখন বছর জুড়েই চলছে। প্রতি বছরই দেখা দিচ্ছে নতুন ধরন। বাড়ছে জটিলতা। আক্রান্ত অনুপাতে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। বিশেষ করে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি দেখা দিচ্ছে শিশু ও বয়স্ক মানুষের জন্য। চিকিৎসা ব্যয় সংকুলান করতে গিয়ে বিপর্যয়কর ব্যয়ের মধ্যে ঢুকছে পরিবারগুলো। জাতীয় উন্নয়নের অন্তরায় হয়ে উঠছে রোগটি।
বাড়তে বাড়তে চলতি বছর ডেঙ্গু এতটাই ভয়াবহ হয়ে উঠেছে, বছর শেষ হওয়ার অনেক আগেই এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ মৃত্যু ও আক্রান্তের রেকর্ড হয়ে গেছে। রোগটি ছড়িয়ে পড়েছে সব জেলায়। চলতি সেপ্টেম্বরেই ছাড়িয়ে যাচ্ছে আগের সব রেকর্ড। এ মুহূর্তে বিশ্বের ডেঙ্গু আক্রান্ত দেশগুলোর মধ্যে মৃত্যু ও আক্রান্তে সবচেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ।
এমন অবস্থায় ডেঙ্গু বাংলাদেশের সামনে দীর্ঘস্থায়ী একটা বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এ ব্যাপারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাবেক আঞ্চলিক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডেঙ্গু এখন বাংলাদেশে জাতীয় উদ্বেগ। এমনকি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে শুরু করে অন্যান্য দেশও এটা নিয়ে উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশের ডেঙ্গু আন্তঃমহাদেশীয় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা যেন আর না ছড়ায় সারা বিশ্ব সেটা নিয়ে উদ্বিগ্ন।
এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু রোগ বাংলাদেশে আগামী ২০-৪০ বছরের জন্য একটা মাথাব্যথার কারণ হয়ে গেছে বলে মনে করছেন সংক্রামক রোগবিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশে মাথাব্যথার সংক্রামক রোগ কলেরা, ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর, ফাইলেরিয়া, যক্ষ্মা ও কুষ্ঠ কমে গেছে। শুধু একটা মাত্র সংক্রামক রোগ ডেঙ্গু সামনের দিনগুলোতে মাথাব্যথার কারণ হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে ডেঙ্গুর দুর্যোগের মধ্য দিয়েই বেঁচে থাকতে হবে। কারণ এখান থেকে নিস্তার পাওয়ার কিছু দেখছি না।’
একইভাবে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘ডেঙ্গু এখন বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক পরিস্থিতি। এই পরিস্থিতিকে মেনে নিয়েই আমাদের সামনে এগোতে হবে। যেভাবে ম্যালেরিয়া নির্মূল হয়েছে, সেভাবে এটাকেও নির্মূল করতে হবে।’
অন্য দেশ পারছে, বাংলাদেশ না : অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক বলেন, ‘পৃথিবীতে এখন ডেঙ্গুতে মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যায় বাংলাদেশ সবার ওপরে। অথচ আশপাশের দেশ মিয়ানমার, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও নেপাল ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সফলতা দেখিয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের যে সাফল্য, সেটা কীভাবে এসেছে সেটা যদি আমরা অনুসরণ করি তাহলেই আমরা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সফলতা আনতে পারি।’
ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের কলকাতাসহ ভারতের অধিকাংশ এলাকা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করেছে দেশটি। অথচ সেখানকার জলবায়ু, বৃষ্টিপাত, আর্দ্রতা আমাদের মতোই। কিন্তু তারা একটি সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে বছরের পর বছর চেষ্টা করে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে। থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর করতে পেরেছে। এমনকি প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার, যেখানকার স্বাস্থ্যকাঠামো নিয়ে সমালোচনা করি, দুর্বলতা আছে, টিকা দেয় না, ডিপথেরিয়া আছে, সেখানেও ডেঙ্গুর প্রকোপ নেই। কিন্তু এই অঞ্চলে বাংলাদেশ ও ফিলিপাইন ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।’
কেন পারছে না বাংলাদেশ : ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশে জাতীয় কর্মকৌশল নেই বলে মনে করেন অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক। তিনি বলেন, ‘দেশে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের চরম ব্যর্থতার একটি প্রকাশ। মূল কাজ মশক নিধনে আমরা সঠিকভাবে পরিকল্পিতভাবে এগোইনি। ডেঙ্গুর ব্যাপারে আমাদের ২০ বছরের অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগাইনি। আমাদের সঠিক পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। এ ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছি।’
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, অন্যান্য সংক্রামক রোগ নির্মূল ও নিয়ন্ত্রণে একটা জাতীয় কর্মকৌশল ও পরিকল্পনা আছে। লোকবল ও টেকনিক্যাল লোক আছে। কিন্তু ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে কোনো জাতীয় কর্মকৌশল নেই। প্রয়োজনীয় লোকবলও নেই।
ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘ডেঙ্গুসহ মশকবাহিত রোগবালাই মোকাবিলার জন্য একটি নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ দরকার, আমাদের সেটা নেই। সেটার দায়িত্ব আইইডিসিআরকে দেওয়া যেতে পারে। অথবা কর্তৃপক্ষ হিসেবে নতুন কোনো কেন্দ্র হতে পারে। এভাবে নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় কমপক্ষে পাঁচ বছর কাজ করতে হবে।’
ডেঙ্গু এখন জরুরি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি : অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, ক্রমান্বয়ে স্থানীয় সংক্রমণ থেকে এখন এডিস মশা ও ডেঙ্গু ভাইরাস সংক্রমণ দেশের সব জায়গায় যথেষ্ট পরিমাণে ছড়িয়ে পড়েছে। ডেঙ্গুর স্থানীয় সংক্রমণ চক্রে পরিণত হয়েছে। এটা সহজেই দূর হবে না।
বাংলাদেশে ডেঙ্গু একটা জরুরি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে রূপ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, একটা সর্বাত্মক ও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের জন্য একটা সর্বাত্মক উদ্যোগ দরকার ছিল। কিন্তু সেটা হয়নি। ডেঙ্গুটাকে একটা মৌসুমি রোগ হিসেবে নেওয়া হয়েছিল। দিনে দিনে অপরিচ্ছন্নতা বেড়েছে। ভবিষ্যতে হয়তো আরেকটি সংক্রামক ব্যাধি আসবে। পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নগরী না হলে এ রকম জনস্বাস্থ্য সমস্যা আরও বাড়বে।
নিয়ন্ত্রণ হয়েছে অনেক বাহকবাহিত রোগ : গত ২৩ বছরে বাংলাদেশে অন্যান্য সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও ডেঙ্গু করা যায়নি বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ। তিনি বলেন, ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর, গোদরোগ বা ফাইলেরিয়া নিয়ন্ত্রণ হয়েছে। ডেঙ্গুর মতো এগুলোও বাহকবাহিত রোগ। কালাজ্বর নিয়ন্ত্রণে কর্মসূচি শুরু হয়েছিল ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের ছয় বছর পর ২০০৬ সালের দিকে। মাত্র ১০ বছরে ২০১৬ সালে কালাজ্বর নির্মূলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হয়েছে। গোদরোগ নির্মূল কর্মসূচি শুরু হয় ২০০৪ সালে। ২০২২ সালে এ ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বীকৃতি মিলেছে। ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচি ২০০০ সাল থেকে শুরু হয়েছে। আগে যেখানে বছরে আড়াই থেকে তিন লাখ ম্যালেরিয়া রোগী হতো, সেটা এখন নেমে এসেছে ৭০০০-১২০০-এ। আগে যেখানে ম্যালেরিয়ায় মৃত্যু ছিল আড়াইশ থেকে তিনশ, সেটা এখন নেমে এসেছে চার-পাঁচজনে। অথচ এগুলোও ডেঙ্গুর মতো মশা অথবা মাছিবাহিত রোগ। কালাজ্বর বেলে মাছি, ম্যালেরিয়া এনোফিলিস মশা ও গোদরোগ কিউলেক্স মশার কারণে হয়।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ওই রোগগুলো স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এককভাবে বা তাদের নেতৃত্বে নির্মূল বা নিয়ন্ত্রণ হয়েছে। কিন্তু ডেঙ্গুতে অবস্থা ভিন্ন। এখানে কারও নেতৃত্ব নেই। দুটো বিভাগ কাজ করেÑ স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় সরকার বিভাগ। কেউ নেতৃত্ব নিতে চায় না। ফলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে একটি ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।
অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলবায়ু পরিবর্তনও কারণ : ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের পেছনে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও জলবায়ু পরিবর্তনকেও কারণ হিসেবে দেখছেন অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ। তিনি বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণের সঙ্গে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার প্রজননের সুসম্পর্ক আছে। এতে পানি জমার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া নগরায়ণের সঙ্গে গাড়ি ব্যবহারের সম্পর্ক আছে। এতে যেসব অকেজো টায়ার ফেলে দেওয়া হয়, সেখানে পানি জমলে সে পানি সহজে শুকায় না। বারবার জরিপে এসব টায়ারে এডিস মশার প্রজননের উৎস মিলেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের সময় দিন দিন বাড়ছে বলে জানান এই বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঋতুগুলো তার বৈশিষ্ট্য হারিয়েছে। এখন ডিসেম্বরেও শীত পড়ে না। সে সময়ও দিনের বেলায় ৩০-৩২ ডিগ্রি তাপমাত্রা হয়। এ ধরনের তাপমাত্রা এডিস মশার প্রজননের উপযুক্ত। পাশাপাশি বৃষ্টিপাতের সময়ও বদলেছে। এখন জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত নানা সময় বৃষ্টিপাত হচ্ছে। বৃষ্টিপাত হলে পানি জমে ও সেটা এডিস প্রজননের ঝুঁকি বাড়ায়। এগুলোর কারণে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটছে।
দেখা দিচ্ছে বিপর্যয়কর অসুস্থ ব্যয় : ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে ডেঙ্গু বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ শুনতে হবে বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক। তিনি বলেন, দেশে ডেঙ্গু বাড়ছে, সরকার হাসপাতাল খুলছে, পরীক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করছে। মানুষকে নিঃস্ব করছে। আমাদের মতো দেশে স্বাস্থ্যসেবা পেতে ৬৭ শতাংশ অর্থ খরচ হয় ব্যক্তির পকেট থেকে। এই খরচ ৩০ শতাংশের নিচে আনা উচিত। এখন মানুষ যদি ওষুধ কেনে, হাসপাতালে ভর্তি হয় ও পরীক্ষা করতে থাকে, তাহলে তারা তো নিঃস্ব হতেই থাকবে।
ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসা করাতে গিয়ে মানুষ বিপর্যয়কর অসুস্থ ব্যয়ের মধ্যে ঢুকছে বলে মনে করেন অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ। তিনি বলেন, গ্রামাঞ্চলে ডেঙ্গুর চিকিৎসাব্যবস্থাও অপ্রতুল। বছর জুড়ে ডেঙ্গু থাকবে। মানুষ চিকিৎসা নিতে পারবে না। অনেকে চিকিৎসা নিতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে যাবে। মানুষ বিপর্যয়কর অসুস্থ ব্যয়ের মধ্যে ঢুকে পড়বে। তারা অনেকে তাদের জমি বিক্রি করবে। পুঁজি শেষ করতে হবে। এটা আমাদের উন্নয়নের অন্তরায় হিসেবে আসবে। দরিদ্রতা দূরীকরণে সরকারের যে অর্জন, সেটা ঝুঁকির মধ্যে পড়বে এই ডেঙ্গুর কারণে।
