বদলে যাবে অনেক হিসাব-নিকাশ

আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২৬, ০১:৪৯ এএম

অর্থবছরের মেয়াদকাল পরিবর্তিত হচ্ছে। বর্তমান সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিদ্যমান জুলাই থেকে জুন মাস সময়ের পরিবর্তে নতুন অর্থবছর শুরু হবে এপ্রিলে; শেষ হবে পরবর্তী বছরের মার্চে। তবে এখনই নয়, এই নতুন ব্যবস্থা চালু হচ্ছে ২০২৮ সালের এপ্রিল থেকে। মধ্যবর্তী ২০২৭-২৮ অর্থবছর হবে ৯ (নয়) মাস মেয়াদের। নতুন মেয়াদের অর্থবছর চালু হলে বদলে যাবে সব হিসাব নিকাশ। মূলত বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা বা এডিপি বাস্তবায়নে অপচয় রোধ করে অর্থনৈতিক কর্মকা-কে আরও গতিশীল করতেই এই নতুন ব্যবস্থা। জিডিপি, কর আদায়, সরকারি আয়-ব্যয় ও দায়-দেনা, বৈদেশিক ঋণের হিসাব, সরকারি প্রতিষ্ঠানের লাভ-লোকসানের হিসাব, প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতা, পেনশন ও অবসরভাতাসহ সরকারি ক্রয় এবং উন্নয়ন কর্মকা-ের বিল পরিশোধের সময় বদলে যাবে।

গত সোমবার মন্ত্রিসভা অর্থবছর গণনায় এই নতুন মেয়াদের প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে।

আর্থিক খাত বিশেষজ্ঞ, বর্তমানে ইনস্টিটিউট অব মাইক্রোফিন্যান্সের (আইওএম) নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরি দেশ রূপান্তরকে বলেন, নতুন ব্যবস্থায় অর্থবছর চালু হলে বড় প্রভাব পড়বে কৃষিতে। অর্থনীতির তথ্য-উপাত্ত, সামাজিক ও উন্নয়ন গবেষণায়ও এর প্রভাব পড়বে। করব্যবস্থা, সরকারি নীতিমালা, প্রশাসনিক কার্যক্রম এমনকি অনেক আইন-কানুনও নতুন অর্থবছরের উপযোগী করার প্রয়োজন দেখা দেবে। তাই, এই পরিবর্তন অত্যন্ত সতর্কতা ও দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে হবে।

মূলত অর্থবছর হলো সরকারের আর্থিক হিসাবের মেয়াদকাল। এক অর্থবছরে সরকার রাষ্ট্র ও জনগণের জন্য কীভাবে, কত ব্যয় করবে, সরকারের আয় কত হবে; তা নিয়ে একটি আর্থিক পরিকল্পনা বা বাজেট প্রস্তুত করতে এই মেয়াদকাল দরকার হয়।

অর্থবছর পরিবর্তন করতে সরকারের প্রধান যুক্তি হলো উন্নয়ন প্রকল্পের কর্মকা-ে অপচয় রোধ করে গতি বৃদ্ধি করা। বিদ্যমান মেয়াদকাল অনুযায়ী দেশে অর্থবছর শেষ হয় ৩০ জুন এবং শুরু হয় ১ জুলাই। এই সময়ে দেশে বৃষ্টিপাত হয় এবং অর্থবছরের শেষ সময়ে এসে নানাবিধ উন্নয়নকাজ যেমন সড়ক, সেতু, নালা-নর্দমা খোঁড়াখুঁড়ি বা ভবন নির্মাণের প্রকল্পের কাজ করা কঠিন হয়। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় ও ব্যয় বাড়ে এবং কাজের গুণগতমান ধরে রাখা হয় না। এদিকে, অর্থবছরের শেষ মাসে প্রকল্প শেষ করার তাগিদ থেকে বিলও পরিশোধ করতে হয়। এতে রাষ্ট্রের অর্থ অপচয় হয়। নতুন মেয়াদকাল অনুযায়ী এপ্রিলে অর্থবছর শুরু হলে ওই মাসে সরকার বাজেট প্রস্তুত করবে এবং শুকনো মৌসুম (গ্রীস্মকাল) থাকতে থাকতেই সব উন্নয়ন ও নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। বর্ষায় ওই সব কার্যক্রম সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা থাকবে না। ফলে অপচয় রোধ করা সম্ভব হবে।

অর্থবছরের মেয়াদকাল পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কর পরিশোধের বাধ্যবাধকতার কারণে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হিসাব-নিকাশেও পরিবর্তন আনতে হবে। নতুন অর্থবছরের সঙ্গে হিসাব-নিকাশ সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে সফটওয়্যার বা লেজারেও পরিবর্তন আনতে হবে। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে ব্যয়। এই পরিবর্তনের ফলে বিনিয়োগে কর রেয়াতসহ অন্যান্য সুবিধার সময়কালও বদলে যাবে।

ভারতবর্ষে মোগল সম্রাট আকবরের আমলে বাংলা নববর্ষ চালু হয়। তখন রাজস্ব আহরণের দৃষ্টিকোণ থেকে অর্থবছর গণনা শুরু হয়েছিল এপ্রিল মাসে। ব্রিটিশরা ভারতবর্ষ দখলে নিয়ে একই মাসে অর্থবছর চালু রাখে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের আগ পর্যন্ত ওই ব্যবস্থা চলে। পরবর্তীতে পাকিস্তান সরকার অর্থবছরের সময়কাল পরিবর্তন করে জুলাই থেকে জুন ধরে অর্থবছর গণনা শুরু করে। স্বাধীনতার পর থেকে শুরু করে বাংলাদেশেও এতদিন একই ধারা অব্যাহতভাবে চলে আসছে। অনেকেই মনে করেন, অর্থবছর গণনায় পাকিস্তানের ওই মডেল থেকে বের হচ্ছে সরকার। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত