জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) হিসাবে, গত আগস্ট মাসে বিশ্বে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি ছিল সর্বনিম্নে। এটি গত দুই বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। সংস্থাটি বলছে, এ সময়ে চাল ও চিনি ছাড়া বিশ্ববাজারে প্রায় সব খাদ্যপণ্যের দামই কমেছে। তবে পুরো উল্টোচিত্র বাংলাদেশে। বিশ্বে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি কমলেও বাংলাদেশে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি রেকর্ড ছুঁয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ভোক্তা মূল্য ও মজুরি সূচক (সিপিআই) ইনডেক্সের আগস্ট মাসের তথ্য অনুযায়ী, গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৯২ শতাংশ। তবে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি গিয়ে ঠেকেছে ১২ দশমিক ৫৪ শতাংশে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেওয়া মুদ্রানীতি ব্যর্থ হয়ে পড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নরের কোনো নীতিই কাজে আসছে না। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা ছাপিয়ে ধার দেওয়াটা মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিয়েছে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশ সুদহার বাড়িয়ে যেখানে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করছে সেখানে বাংলাদেশ হাঁটছে উল্টো পথে। ব্যবসায়ীদের সুবিধা দিতে এখনো কৌশলে সুদহার কমিয়ে রাখা হয়েছে। তাছাড়া বাজার অব্যবস্থাপনার কারণেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
যদিও সরকার দাবি করছে নিত্যপণ্যের দাম কমাতে তারা সদা সচেষ্ট। কিন্তু বাজারের চিত্র পুরোটাই ভিন্ন। নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের উদ্যোগ সত্ত্বেও, আগস্টে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১২ দশমিক ৫৪ শতাংশের উচ্চতা ছুঁয়েছে। এতে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হারও বেড়ে গেছে।
খাদ্যে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার ব্যাখ্যা হিসেবে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা আছে। উৎপাদক স্তর থেকে ভোক্তা স্তর এবং আমদানি স্তর থেকে ভোক্তা স্তর এ বাজার ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা প্রকট। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো বাজার ব্যবস্থাপনায় যে নজরদারি ও খবরদারি দরকার সেগুলো ঠিকমতো করতে পারছে না বলেই মনে হচ্ছে। তিনি বলেন, নজরদারির ক্ষেত্রে আমদানি কত, উৎপাদন কত, গ্যাপ কত এসব তথ্য-উপাত্ত নির্ভর নীতিমালা দরকার। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের দুর্বলতার কারণে আমদানিকারকরা এলসি খুলতে পারছেন না। মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার এটি একটি বড় কারণ। রিজার্ভের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনাটা সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর নির্ভর করছে।
সরকারের হিসাবে শহরের চেয়ে গ্রামে খাবারের দাম বেশি বেড়েছে। আগস্টে গ্রামে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ১২ দশমিক ৭১ শতাংশ। শহরে ১২ দশমিক ১১ শতাংশ। আগের মাস অর্থাৎ জুলাইয়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ৯ দশমিক ৬৯ শতাংশ। আর খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে মূল্যস্ফীতি। নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে এটি আরও বেশি বেড়েছে। এটাকে চিন্তা করতে হবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির ওপরে আবার মূল্যস্ফীতি হিসেবে। চাল ১০০ টাকারটা ১১০ টাকা হয়েছে, তারপরেও আবার ১১২ টাকা হয়েছে। এটি সাধারণ মানুষকে খুবই যাতনা দিচ্ছে।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকার ৬ শতাংশের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ধরে রাখার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য বাংলাদেশ নামকাওয়াস্তে সুদহার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের এ মুদ্রানীতিতে ১০ শতাংশের কিছু বেশি ধরা হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য এটিও যথেষ্ট নয়।
বিবিএসের হিসাবে, ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর আগে জানুয়ারিতে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ। এরপর থেকেই সূচকটি ধারাবাহিকভাবে বাড়তে শুরু করে এবং চলতি বছরের মে মাসে এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশে উন্নীত হয় সার্বিক মূল্যস্ফীতি। এ সময়ে অন্যান্য দেশে মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্য হারে কমে এলেও গত আগস্টে বাংলাদেশে সামান্যই কমে। তবে আগস্টে খাদ্য বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি কমে ৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ হয়েছে, আগের মাস জুলাইয়ে এ হার ছিল ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ। তবে বিবিএস খাদ্য বহির্ভূত পণ্যের যে চিত্র দিয়েছে, তার সঙ্গে বাজারের কোনো মিল নেই। বেশিরভাগ খাদ্য-বহির্ভূত পণ্যেরই দাম লাগামের বাইরে চলে গেছে।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, একেক প্রতিষ্ঠান একেক রকম তথ্য দেয়। যার ফলে নীতিনির্ধারকরা কখন আমদানি করতে হবে, কতটুকু করতে হবে এটা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন। এটাও মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার বড় একটি কারণ। তিনি বলেন, দেশের মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার আরেকটি বড় কারণ ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন। টাকার মান যত কমছে সেটিও আমদানিকৃত পণ্যের মূল্য বাড়াতে অবদান রাখছে।
তবে মূল্যস্ফীতির সার্বিক অবস্থার চেয়ে মজুরি প্রবৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ৫৮ শতাংশের নিম্ন-অবস্থানে ছিল আগস্টে। অবশ্য এই হার আগের মাসের তুলনায় দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ বেড়েছে।
গত আগস্টে জাতিসংঘের খাদ্য সংস্থার বৈশ্বিক খাদ্য মূল্যসারণী দুই বছরের মধ্যে সবচেয়ে নিম্ন অবস্থানে আসে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মূল্যসারণীতে বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বেশি বাণিজ্য হয় এমন খাদ্যপণ্যগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আগস্টে মূল্যসারণীর গড় ছিল ১২১.৪ পয়েন্ট, যা আগের মাসে ছিল ১২৪ পয়েন্ট। ২০২১ সালের মার্চের পর গত আগস্টেই সর্বনিম্ন ছিল জাতিসংঘের খাদ্য মূল্যসারণীর গড়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ২০২২ সালের মার্চে এটি সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছায়, আগস্টে এর চেয়ে ২৪ শতাংশ কমেছে।
কিন্তু, বাংলাদেশে বৈশ্বিক এই অবস্থার প্রতিফলন হয়নি। বরং, চলমান অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে দরিদ্র্য ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সরকারের খাদ্য সহায়তার মাত্রা কমায় পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। এতে মূল্যস্ফীতি চড়া হয়েছে, বেড়ে গেছে জীবনযাত্রার ব্যয়।
