‘কাছের জলে দূরের বিরান’

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১০:৩৫ পিএম

‘বাঙলা চিরদিনই কবিতার দেশ’─ দার্শনিক হুমায়ুন কবিরের এই লিরিকাল উক্তির সত্যতা নরওয়েজীয় সাহিত্যের অনুবাদক ও বহুদর্শী সূক্ষ্ম আর্টিস্ট আনিস পারভেজের বহু বিলম্বিত প্রকাশনা তার প্রথম কাব্যগ্রন্থে (কাছের জলে দূরের বিরান, ঢাকা: যুক্ত, জানুয়ারি ২০২৩) আবারও প্রমাণিত হলো। বিদেশে যেমন গিটার বাজিয়ে দেখেনি (বা স্বরলিপি পড়তে জানে না) এমন শিক্তিত লোক কম, তেমনি সাদা খাতা সামনে পেয়েও দু-চার ছত্র পদ্য লেখেনি এমন বাঙালি লেখক বিরল। আমিও যে অতীতে, শখের বশে, দু’য়েকখান না লিখেছি তা নয়। কিন্তু আনিস পারভেজ যে মর্মগতভাবে কবি এবং তার অন্য সব পরিচয় তার কবিসত্তার ছদ্মবেশ মাত্র, তা এই ‘আনুষ্ঠানিক’ আত্মপ্রকাশের বহু আগে থেকেই আমি জেনে এসেছি যখন, দৈবক্রমে, দূর আটলান্টিকের পশ্চিম পাড়ে, তিনি এবং আমি একই শহরের বাসিন্দা ছিলাম। এমনকি কিছুকাল আমরা একই বিম্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলেও থেকেছি। তখন কিছুদিন পরপর হপ্তান্তে না হলেও প্রায়ই আমরা আড্ডা দিতাম। মার্কিন দেশে ভিনদেশি, কিছু-বা বয়স্ক, বিদ্যার্থীদের দিনক্ষণ একটা বিশেষ জাতের যন্ত্রণা-উৎকণ্ঠায় কাটে, আমাদের ব্যস্ত জীবনও তার ব্যতিক্রম ছিল না। তারই মধ্যে যখনই তার বাসায় ঢুঁ মেরেছি প্রতিবারই, ব্যতিক্রমহীনভাবে, আড্ডার উপসংহার-পর্বে, আহারান্তে মিষ্টান্ন পরিবেশনের মতো, কবিতার খাতাটা তিনি খুলে বসতেন। তার সুন্দর কণ্ঠে একেকটা কবিতা─ যার অনেকগুলো এ বইতে শোভমান, যেমন ‘জল-ডাঙার মাছ’ (পৃ. ২২)─ শোনার সময় সবসময়েই আমার মনে হয়েছে এ কথাটাই যে, ক্যাপিটালিস্ট দেশের ‘ইনফরমেশন সাইন্স’ যার কল্পনাশক্তির ক্ষতি করতে পারেনি, তাকে কবি বলে মানতে হয়। কথা হলো, কবি বলতে আমি কি বুঝি?

আমি কবি বলতে এখন, বানপ্রস্থে প্রবেশের পর থেকে, যা বুঝি তা আমার আগের ধারণা থেকে কিছুটা আলাদা ও ব্যাপক। ‘কবি’ বলতে এখন আমি বুঝি আর্টিস্ট, ‘সাহিত্যিক’ বলতেও বুঝি তা-ই। ‘সাহিত্যিক’ শব্দের চল, ইলেকট্রনিক মিডিয়ার আগ্রাসনবশত, উঠেই গেছে বলা যায়; ‘সাহিত্যিক’ কথাটার যে বিরাট তাৎপর্য ১৯০৫ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত সুপরিজ্ঞাত ছিল, তা এ সময়কার লেখকদের পক্ষে আন্দাজ করা কঠিন।

সাহিত্যিক হোন বা কবি, শেষ বিচারে দু’জনেই আর্টিস্ট─ দু’জনেরই কারবার ‘আর্ট’ নিয়ে─ দু’জনেরই উদ্দেশ্য সাহিত্যের ‘আর্ট’ রচনা করা। কবিতা, নাটক, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ ইত্যাদি মিলিয়ে সাহিত্যের প্রকরণ তো অনেক, কিন্তু সাহিত্যের বিবিধ শাখার ভিতর সাদৃশ্যের সূত্র হলো ওই ‘আর্ট’, অর্থাৎ সাহিত্যের তাবৎ প্রকরণ এবং সাহিত্য-সম্পৃক্ত সকলপ্রকার প্রয়াসের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো কথা বা বাক্যের শিল্পকলা রচনা। তবে সাদৃশ্যের হেতু এক হলেও অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দশকে উদ্ভূত রোমান্টিসিজম, অর্থাৎ ফ্রেঞ্চ রেভ্যুলুশনের সমান্তরালে সংঘটিত ইংরেজি সাহিত্যের রোমান্টিক কাব্যবিল্পব─ যা সপ্তদশবর্ষীয় কিশোর রবিঠাকুর বিলাত থেকে বঙ্গদেশে এনে বঙ্গীয় কবিতার মুক্তি ঘটিয়েছিলেন─ সাধিত হবার পর থেকে কবিতা কোলরিজ-কথিত ও ‘অ্যানশান্ট ম্যারিনার’-এ প্রদর্শিত, বিশেষ ধরনের ‘ইমাজিনেশন’ বা কল্পনা-প্রতিভার দৃষ্টান্তস্বরূপ বিবেচিত হতে থাকে। এই বিশেষ কারণে ‘কবিতা’, সাহিত্যের আর-সব-প্রকরণ থেকে পৃথক হয়ে যায়।

রবীন্দ্রনাথের কবিতা নিয়ে রাঢ়ার বঙ্কিম-ক্যাম্পের ঘোরতর আপত্তির একটি কারণ ছিল বিলাতি রোমান্টিসিজম-বাহিত, পৌরাণিক ভাবের সঙ্গে সম্বন্ধহীন, এই বিশেষ ধরনের ‘ইমাজিনেশন’। পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়, শরৎ চট্টোপাধ্যায় বা চন্দ্রনাথ বসু রবীন্দ্রসাহিত্যের এই ইমাজিনেশন ও সেকুলার, ভক্তিবিচ্যুত, হিউম্যানিস্টিক প্রণোদনাকে অষ্টাদশ পুরাণ-শাসিত জাত্যবাদী দেশের ‘ভবিষ্যতে’র জন্যে মারাত্মক বিপজ্জনক মনে করেছিলেন। তাদের আশঙ্কা অমূলক ছিল না: প্রস্তরযুগীয় জাত্যবাদে আক্রান্ত সেকালের রাঢ়া ও বঙ্গালের মানসিকতায় যদি ব্রাহ্মণ-রচিত অষ্টাদশ পুরাণের শাসন কিছুটা শিথিল হয়ে থাকে, তা শাণ্ডিল্যগোত্রীয় ক্ষিতীশ বংশধারার ভট্টনারায়ণ বংশোদ্ভূত বিদ্রোহী রবীন্দ্রপ্রতিভার বৈপ্লবিক সৃষ্টিকর্মের অভিঘাতেই হয়েছে (জীবদ্দশায় না হলেও পরে হয়েছে) এবং সেই সেকুলার প্রভাব বঙ্কিম-শিবিরের শরৎবাবু, ১৯৩৮-পূর্ব ‘শনি’গ্রহ, ও শাক্ত মোহিতলালের বিপুল বিরোধিতা সত্ত্বেও ঠেকানো যায়নি। বাংলা সাহিত্যের আধুনিকত্বে উত্তরণ ঘটেছে একবার এবং তা রবীন্দ্রহস্তেই; পরবর্তীদের উৎসও রবীন্দ্রনাথ─ এককথায়, বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্র-যুগের যুগান্ত নেই। তিরিশের কবিরা রবীন্দ্র-যুগে ছিলেন অনিচ্ছায়, বাধ্য হয়ে; আমরা রবীন্দ্র-যুগে আছি স্বাধীন ইচ্ছায়, সৌভাগ্যবশত। রবীন্দ্র-বলয় থেকে বেরোনোর তিরিশদশকী কৌশলকে ‘যুগ’ মনে করা অযৌক্তিক। কবি আনিস পারভেজের সাম্প্রতিক গদ্যলেখাতে রবীন্দ্র-চিন্তার তাৎপর্য উপলব্ধির নতুন পরিচয় পেয়ে কথাগুলো মনে এলো।


আনিস পারভেজের এ বইতে─ যা প্রথম কাব্যগ্রন্থ হলেও প্রাথমিক কবিতার সংগ্রহ নয়─ অনেক দিনের, বস্তুত ‘অনেকগুলো দশকে’র (ব্লার্ব), কাব্যকর্মের ফসল গ্রন্থবদ্ধ হয়েছে অর্থাৎ নাড়াই-বাছাইয়ের পর গোলায় তোলা হয়েছে আনুষ্ঠানিকভাবে। কবিতার নিচে তারিখ না থাকলেও আমি জানি যে, কোনও কোনও কবিতা বেশ আগের, যেমন ‘জল-ডাঙ্গার মাছ’ (পৃ. ২২) বা ‘পানশালা’ (পৃ. ৭৯); কোনও কোনওটি আবার অতি-সাম্প্রতিক, যেমন ‘পালটাতে বিছানার চাদর’ (পৃ. ১৩) বা বইয়ের শুরুতে প্রদত্ত ‘উত্তর জানা নেই’ (পৃ. ৯) অথবা বইয়ের সর্বশেষে স্থানপ্রাপ্ত ‘দূরের থেকে বিরানে’ (পৃ. ৮০) যেখানে মহাপ্রস্থানের পথে নিঃসঙ্গ যুধিষ্ঠিরের মতো, দুর্বাঘাস ও একটি কুকুরছানা ব্যতীত আলোচ্য কবির আর কোনো সঙ্গ নেই, সঙ্গী নেই। অর্থাৎ একই কবির রচনা হলেও─ বলতে পারি, একই কাব্যসংসারে লালিত-বর্ধিত হলেও─ অনেক কবিতাই কালগত দূরত্বে এবং অভিজ্ঞতার ভিন্নতায় পরস্পরের অচেনা, তাদের অন্তর্লীন ইতিহাস এক নয়। কোনও কোনও কবিতা আক্ষরিক অর্থেই ‘নর্ডিক’ (যেমন ‘মোহনায় শুরুর কথা’, পৃ. ৩৩) অর্থাৎ ওগুলো লিখিত হয়েছে আর্কটিক হিমমণ্ডলের বৃত্তাকার ধবল তুষারসমুদ্রের নিচে উত্তর ইউরোপের উত্তরতম সীমানায় যেখানে ঋগ্বেদের প্রধান দেবতা অগ্নিদেব মহাশয় মধ্যরজনীতেও জাগ্রত থাকেন এবং প্রত্যেক বছর গ্রীষ্মকালে, আড়াই মাসেরও বেশি সময়, একেবারেই অস্ত যান না। আবার তীব্র শীতের মৌসুমে, প্রত্যেক বছর, সূয্যিমামা লুকিয়ে থাকেন চব্বিশ ঘন্টা, আঁখিপদ্ম মেলে উদিত হতেই ভুলে যান। ‘বিষাদ ও মুক্তি’ কবিতায় ঋগ্বেদের দশম মণ্ডল বা বৈদিক সূক্তের উল্লেখ (পৃ. ৫০), অতএব, কাকতালীয় ব্যাপার নয়। তবে আটলান্টিকের উত্তরপ্রান্তে দৃষ্ট আঁধার-অন্ধকারের সুক্ষ্ম তফাতের ইঙ্গিত সত্ত্বেও ‘বিষাদ ও মুক্তি’ জন্মসূত্রে নর্ডিক না, ঢাকা শহরে বসে রচিত। যার যৌবনের দিনগুলো কেটেছে উত্তর ইউরোপের এমন সব স্থানে যেখানে দিবস-রজনীর বাইবেলে ঘোষিত বিভাগ অচল, যেখানে দিনের অর্থ দিন না, রাতের অর্থ রাত নয়─ যেখানে, কোথাও কোথাও, গ্রীষ্মে চব্বিশ ঘণ্টাই দিন এবং শীতে চব্বিশ ঘণ্টাই রাত─ সেই কবির চিন্তারীতি ও মানস-প্রবণতায় উক্ত প্রকৃতির প্রভাব (যা মেরুঅঞ্চলের নিকটবর্তী স্থানে বসবাসের অভিজ্ঞতা ছাড়া বোঝা অসম্ভব), অবচেতন স্তরে হলেও, থাকতে বাধ্য। আনিস পারভেজের কবিতায় ‘ফেইট’ বা নিয়তির সংক্রাম (ইচ্ছের ডানার ছিন্ন পালক ‘এক অদৃশ্য ঝাড়–দার কেবলই সরিয়ে দেয়’, পৃ. ৫৪); শূন্যতা ও নিরর্থকতার প্রতীক হিসেবে ‘বিরানে’-এর ক্রমিক উপস্থিতি (পৃ. ১০, ১৮, ২৪, ৪৪, ৫৩, ৭৭, ৮০) এবং ‘জলের সিন্দুক’ ও ‘ডুবন্ত পাথরে’-এর পৌনঃপুনিক প্রতীকে ধৃত অস্তিত্ব-সংক্রান্ত জিজ্ঞাসার torturous তীব্রতার মধ্যে, তার ঐতরিক উন্মত্ততা ও চরমতার ভিতর, উত্তর আটলান্টিকের নর্ডিক শীত গ্রীষ্ম আকাশ অন্তরীক্ষের ছাপ অবচেতনভাবে ক্রিয়াশীল রয়েছে বলে আমার বিশ্বাস। ফলে দুঃখিনী ভেলুয়াকে নিয়ে লিখিত দীর্ঘ কবিতা ‘আঁধার ও রোদ্দুর’ (পৃ. ২৬)-এ যখন পড়ি ‘দিনমান বৃষ্টিতে নিভে আছে সূর্য’ অথবা ‘সর্বপ্রহর আকাশ জ্বলছে সূর্যতাপে’ তখন তাতে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বদলে, সহসা ব্যাপ্ত হতে দেখি উত্তর মেরুবর্তী নর্ডিক আকাশপট।

আনিস পারভেজের কবিতা, তার নিজের মতে, ‘আয়না’র মতো ‘আত্মাবলোকনে’র মাধ্যম এবং তা নানা-সময়ে লিপিবদ্ধ ‘কিছু অনুভূতি, আবেগ ও ভাষা-অতিক্রান্ত বোধের অনুবাদ’। এই নিরুচ্ছ্বাস সত্যভাষণ বইয়ের কবিতাগুলো পড়ে গেলে স্বতঃই উপলব্ধ হয়। তার কবিতায় ‘নৈঃশব্দ’ উড়ে এসে সাঁতার কাটে ‘জলের সিন্দুকে’ এবং স্বত্ব ও অপরত্বের ‘আদল’ পরীক্ষার নিমিত্ত, কবির ‘আত্মা’র সঙ্গে তার ‘প্রেতাত্মার ছায়ার’ কথোপকথন চলতে থাকে। কোথাও আবার ‘জ্বরের ঘোরে নিজের সাথে জড়াজড়ি’ (পৃ. ২৪) করার সুযোগে তৈরি হয় নিজেই নিজের সাক্ষাৎকার-গ্রহণের সুযোগ। এভাবে অনেক কবিতাই একদিকে বিবিধ ‘বোধের অনুবাদ’, আবার একইসঙ্গে তা স্বরচিত-কাব্যদর্পণে কবির ‘আত্মাবলোকন’ বা স্বরূপ-দর্শনের দিনপঞ্জি। সেই দিনপঞ্জিতে যখন পড়ি “এ শূন্যতা আমি কি করে ফেলে আসি” (পৃ. ১০) তখন, সেই নিরলঙ্কৃত স্বগতোক্তির ভিতর, চকিতে উদ্ভাসিত দেখি নিবরয়ব শূন্যতার সন্ত্রাস─ কারণ অস্তিত্বের কেন্দ্রস্থিত এই শূন্যতা বা void তো কবির ‘বিছানার চাদর’ (পৃ. ১৩) নয় যে তা বদলানো যায়, ‘পশ্চিমের জানালা’ দিয়ে উড়ে আসা ‘ধুলো’ নয় যে ‘ঝাড়–’ দিয়ে দূর করা সম্ভব (পৃ. ১১) বরং তা ‘অনতিক্রম্য বোধে’র মতো এক ‘নামহীন নদী’ যার ভেতর, ‘ডুবন্ত একটি পাথরে’র মতো, সাঁতার কেটে যাওয়াই কবির নিয়তি। আনিস পারভেজের কবিতায় অস্তগামী জীবনের পথ ‘একটা জলাশয়ের গন্ধ বুকে নিয়ে বৃষ্টির অপেক্ষা করে’ এবং জীবনের অপরাহ্নবেলায়, ছেঁড়া বোতাম বেয়ে, ‘শেষ হেমন্তের কান্না’র মত বিন্দু বিন্দু ঘাম গড়িয়ে পড়ে ধূলায় (পৃ. ১৭)। এই হৈমন্তিক ও বেদনাবিধূর উচ্চারণের সঙ্গে ‘সেইলিং টু বাইযানটিয়াম’ কবিতার একটি চরণের আত্মীয়তা আছে, যেখানে ইয়েটস যৌবনাতিক্রান্ত জীবনকে ‘ছড়ির ওপর রাখা ছেঁড়া কোর্তা’র সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।

জল, নদী, মেঘ, বর্ষণ, স্মৃতি এবং শেকড় আনিস পারভেজের কবিতার নিত্য সহচর। নিজেকে ডাঙায় তোলা মাছ হিসেবে কল্পনা করে তার কাব্যচর্চার সূত্রপাত ঘটেছিল (‘জল-ডাঙ্গার মাছ’, পৃ. ২২)। জল ও মাছের রূপক তো বটেই, তার কবিতা প্রধানত আধুনিক মানুষের জীবনে ‘সঙ্গ’, সম্পর্ক ও ‘শেকড়ে’র অনিত্যতা-জনিত ট্রাজেডির থিমকে আশ্রয় করে আবর্তিত হয়। কন্দর্পের অভিঘাত-সৃষ্ট কিছু চৌকস কবিতাও আছে এ বইতে, তার কোনও কোনও চিত্রকল্প ভারি চিত্তাকর্ষক (‘হাঁসের ডানা থেকে রমণের তুলো ওড়ে..দিঘির জলে ডানা ঝাপটানোয় রোদ আর জলের জড়াজড়ি’, পৃ. ৭৭); তবে পাঠক হিসেবে তার ট্রাজিক থিমের প্রতিই আমার পক্ষপাত। যেমন শৈশব ধরতে গিয়ে কবি যৌবনে উপনীত, যৌবনের নাগাল পেতে না পেতে ঘনিয়ে আসে সন্ধ্যা: বারে বারে ‘সময় পেরিয়ে সময় ধরার’ (পৃ. ৪৯) এই প্রয়াস ও সেই প্রয়াসের অবধারিত ব্যর্থতা, ‘গাছের বাকল’-এ মুদ্রিত ‘কপালের ভাঁজে’র মতো, লেপ্টে থাকে তার ট্রাজিক কবিতায়।

এমন হতেই পারে যে তার কবিতা ব্যক্তিগত, অথবা স্বীকারোক্তিধর্মী─ যেমন কেউ কেউ বলেছেনও। আধুনিক কবিতা মাত্রেই তো তাই, কনফেশনাল। কনফেশনাল হলেও ব্যক্তিগত বোধ এবং অনুভব-পরম্পরার এই দিনলিপি ব্যক্তিগত থাকেনি, হয়ে উঠেছে আমাদেরই বোধ-উপলব্ধির পরিমাপ, আমাদেরই অস্তিত্ব-জিজ্ঞাসার দর্পণ। এই অস্তিত্বজিজ্ঞাসু দর্পণকে যদি, নর্ডিক গগনপটের মতো, কোথাও অস্বচ্ছ মনে হয় তাহলে বুঝতে হবে তা অথেনটিক, কারণ আমাদের জীবন ও অস্তিত্বের স্বচ্ছতর অর্থ আজও আবিষ্কৃত হয়নি। তাই বলে কি কবির, অথবা আমাদের ‘স্বরূপ’ আবিষ্কারের তাগিদ থেমে যাবে?

নৈঃশব্দ কখনো উড়ে এসে আমার ভেতরে
সাঁতার কেটে যায়,
ভেতরটা বুঝি বা জলের সিন্দুক।
আশ্চর্য সব শব্দের ভেতর জলের নিমগ্নতায়
আমার আত্মা তার প্রেতাত্মার ছায়ার সাথে কথা বলে।
কথা বলে
জেনে নিতে চায়
কার আদলে
কে গড়া।

(স্বরূপ দেখা, কা. জ. দূ. বি., ২০২৩, পৃ. ১৪)


লেখক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক, বর্তমানে শিকাগো স্টেট ইউনিভার্সিটির সিযেপিপিএস-বিভাগের অধ্যাপক ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত