হাডসন যেন সেই ‘কীর্তিনাশা’

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১১:০৭ পিএম

আমরা যারা এখন সিনিয়র সিটিজেন, গত শতকের ষাট সত্তর দশকে, সাম্রাজ্যবাদের সদর দপ্তরে কামান দাগো, স্লোগান শুনতে শুনতে বড় হয়েছি, তাদের কাছে আমেরিকা ঘোরা নিঃসন্দেহে এক বড় অভিজ্ঞতা। ঘুরতে এমনিতে বেশ লাগে। সময় সুযোগ পেলেই এদিক-সেদিক যাওয়ার অভ্যেস আশৈশব। তবে পায়ের তলায় যত শর্ষেই থাক না কেন, আমার ছোটাছুটি মোটের ওপর দেশের চৌহদ্দির মধ্যেই। কখনো কাশ্মীরের লালচক, নিশাদ গার্ডেন, দিল্লির পুরনো মহল্লার অলিগলি, বল্লিমারানের গালিবের কোঠি বা ভরা বর্ষায় জানা-অজানা কোনো নদীর তীর আমাকে টানে। ইদানীং খুব, খুব ভালো লাগে বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়াতে।

আমার ঘোরাঘুরি নিয়ে একটা বই করলে মন্দ হয় না। তবে ওই যে বললাম, যা ভালো লাগা সব ভারত বাংলাদেশের নানা জনপদ। বিদেশ বিভুঁইয়ে যাওয়ার কথা দুঃস্বপ্নেও ভাবিনি। একে তো ভিসা করো, পাসপোর্ট দেখো, ডলার-পাউন্ড কত কী নিতে হবে তার হিসেব-নিকেশ করতে থাকো, তারপরে আবার অত ঘণ্টা প্লেনে বসে থাকা, সবমিলিয়ে অত সব ঝড়-ঝঞ্ঝাটের কথা ভাবলেই বুকের ভেতর ধড়ফড় করে। এমনিতেই একটু অলস প্রকৃতির, তারপর বিদেশে যাওয়ার কথা ভাবলেই গায়ে জ্বর আসে। অনেক বন্ধু বিভিন্ন জায়গায় যায়-টায়। এসে গল্প বলে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবিটবি দেয়, হাসিমুখে সেলফি তুলে লেখে, অফ টু লন্ডন বা আমেরিকা, টপাটপ লাইক পড়ে, কমেন্টের বন্যা বয়, আমার সে সব দেখেই আনন্দ।

কিন্তু, কপালের লিখন কে খন্ডাবে! আর সুযোগ এলো তো এলো, এক্কেবারে সদর দপ্তরে। নিউ ইয়র্ক থেকে আচমকা আমন্ত্রণ। আন্তর্জাতিক কনফারেন্স। যেতে হবে। হবেই। মওলানা ভাসানী ফাউন্ডেশন, আমেরিকা, চতুর্থ সম্মেলন করছে, সেখানে বক্তৃতা দিতে হবে। সবে সবে ছোট একটা ডকুমেন্টারি ফিল্ম শেষ করেছি মওলানা ভাসানীর ওপর। সেটা তাহলে ওখানেই প্রিমিয়ার করা যাবে। সবমিলিয়ে সাত পাঁচ ভেবে হ্যাঁ বলে দিলাম উদ্যোক্তাদের। তারাও মহাখুশি হয়ে অফিশিয়াল চিঠিপত্র পাঠালেন সময় মতো। আমেরিকান কনস্যুলেট ভিসার আবেদনপত্র দেখে সবিনয়ে জানিয়ে দিলেন, যে তারা তাদের দেশে যেতে চেয়েছেন বলে কৃতার্থ বোধ করছেন।

আমি ভাবলাম যাক, ভিসা পাওয়া তাহলে কঠিন হবে না। কিন্তু কী কান্ড! আমার স্ত্রী ভালো করে আদ্যোপান্ত মেইল দেখে বলে উঠলেন এতো চব্বিশ সালে তোমাকে ইন্টারভিউতে ডেকেছে ভিসা দেবে বলে। কনফারেন্স তো তেইশ সালের সেপ্টেম্বরে। তাই তো! সাড়ে চুয়াত্তর সিনেমার সুচিত্রা সেনের অলস বাবার মতো পাশ ফিরে শুয়ে নিশ্চিন্ত হলাম, যাক, শেষ অবধি সাত সমুদ্দুর পার হতে হচ্ছে না ভেবে। কিন্তু কোন জাদুমন্ত্রে ভাসানী ফাউন্ডেশন ফের মেল চালাচালি করে সাতদিনের মধ্যে নতুন করে ইন্টারভিউয়ের ব্যবস্থা করে ফেলল। আর কী আশ্চর্য ভিসা পেয়েও গেলাম। ভিসা নিয়ে বিজয় গর্বে কনসুলেটের গেট পার হতে হতে, মিথ্যে বলব না, আনন্দ একটু হচ্ছিল। সেই সঙ্গে, আমার বন্ধু কে.পি শশীর দু-মিনিটের মিউজিক ভিডিও, আমেরিকা আমেরিকা চোখের সামনে ভাসছিল।

ভিসার লাইনে বিপুলসংখ্যক তরুণদের ভিড়। সবাই উচ্চশিক্ষা নিতে আমেরিকা যেতে চায়। চোখেমুখে অদ্ভুত উজ্জ্বলতা। গেলে অধিকাংশ হয়তো আর এদেশে ফিরবে না। গ্রিন কার্ড পেয়ে বাড়িতে ডলার পাঠাবে। সেই টাকায় বাবা-মা ব্যাঙ্গালোর, মুম্বাই, দিল্লি, কিংবা কলকাতায় নতুন ফ্ল্যাট কিনে গৃহ প্রবেশে পড়শীকে বলবে, ছেলে আমার স্টেটসে থাকে। মনে পড়ে যাচ্ছিল, আমাদের ছোটবেলা, ভিয়েতনামের যুদ্ধ, ম্যাকনামারা ফিরে যাও বলা অজস্র তরুণ মুখ, বিশ্বে আনবে নতুন দিন, মাও সেতুং আর হো চি মিন... । পরে, আরও পরে বিশ্বজুড়ে ইসলাম ফোবিয়া, কিউবা, ইরাক, চিলি, ভেনেজুয়েলা, নিগ্রো ভাই আমার... সব মনে পড়ছিল, চার্লি চ্যাপলিন আর মুহম্মদ আলি রাতের ঘুম কাড়ছিল। তবুও গুছিয়ে টুছিয়ে নির্দিষ্ট দিনে প্লেনে উঠলাম। এবং এক সময়ে হুশ করে পৌঁছেও গেলাম আমেরিকা।

মাত্র কদিনে তো কোনো দেশই দেখা হয় না। তারপর আবার আমেরিকার মতো বিপুল এক মহাদেশ। শুধু নিউ ইয়র্ক স্টেট যদি ধরি, সে তো প্রায় বাংলাদেশের সমান। প্লেনে বসে জানলার দিকে তাকাতেই মন ভালো হয়ে গেল। বাইরে কাঁচা হলুদ রোদ্দুর। প্লেন ল্যান্ড করতে করতে সকাল সাড়ে ৭টা। তখনো শহর সেভাবে জাগেনি। ইমিগ্রেশন লাইনের দিকে তাকাতেই বুক কাঁপতে লাগল। বিশাল লম্বা এক লাইন। এ লাইন আজ শেষ হবে বলে তো মনে হয় না। আসার সময় ফোন রোমিং করিয়ে ছিলাম। সেটা মাঝেসাঝে ঠিকঠাক কাজ করছে। কখনো হঠাৎই নীরব হয়ে পড়ছে। আমেরিকান পাসপোর্ট যাদের, তাদের লাইন আলাদা করা হতেই দুড়দুড়িয়ে অনেক ভারতীয় সেদিকে ছুটল। বেশিরভাগ সাউথ ইন্ডিয়ান। প্লেনে কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। নিউ জার্সিতে থাকেন। আইটি ইন্ডাস্ট্রিতে চাকরি করেন। লাইন খুব ধীরলয়ে এগোচ্ছে।

আমাকে নিতে চলে এসেছেন নাসের ভাই। মঈনুদ্দিন নাসের। বহু বছর আগে চট্টগ্রাম থেকে নিউ ইয়র্কে এসে থিতু হয়েছেন। পরোপকারী, অমায়িক ভদ্রলোক। দিনরাত পরিশ্রম করেন। তবুও মুখে সবসময় হাসি লেগে আছে। লাইন দেখে ভাবছি, কখন বাইরে যাব বা আদৌ যেতে পারব কি না, তখন বার দুই ফোন করে নাসির ভাই আশ্বস্ত করলেন, চিন্তা করবেন না। আমি আছি। সাহস একটু পেলাম বটে, তবে তা সাময়িক। আসলে দেশে থাকতে এত লোক, এতভাবে ইমিগ্রেশন নিয়ে ভয় দেখিয়েছেন, যে ইমিগ্রেশন কাউন্টারে বসা লোকগুলোকে দূর থেকে কেমন দানব দানব মনে হচ্ছে। ছোটবেলা থেকে পুঁজিবাদী বিদ্বেষ তো আছেই। কত কিছু শুনেছি, মোবাইল খুলে খুলে চেক করা হবে, আপাদমস্তক ছানবিল করে দেখা হবে যে, সন্দেহজনক কিছু কাগজপত্র আছে কি না ইত্যাদি হাজারও সতর্কবাণী। সামনে মাত্র দুজন লোক। দুরুদুরু বুকে এগোলাম। ইমিগ্রেশন অফিসার অত্যন্ত ভদ্র, মৃদুভাষী। পাসপোর্ট উল্টে পাল্টে দেখে, কেন এসেছি জিজ্ঞেস করে হাসিমুখে, হ্যাভ অ্যা গুড জার্নি বলে হাত তুলে বিদায় জানাতেই টের পেলাম সত্যি সত্যিই আমেরিকায় পৌঁছে গেছি।

লাইনে দাঁড়িয়ে একঝলক আমেরিকা চেনার চেষ্টা করছিলাম। মোটে আট-দশ দিনে কতটুকুই আর একটা জনপদকে চেনা যায়! তাও থাকছি তো মাত্র এক শহরেই। নিউ ইয়র্ক। ফলে আমেরিকা দেখা না বলে নিউ ইয়র্ক দেখা বলাই বোধহয় ঠিকঠাক। তার পরে আবার সারা জীবন আমেরিকা নিয়ে আমাদের ছুঁতমার্গিতা কম নেই। প্রায় গোয়েন্দা দৃষ্টিতে প্রথম থেকেই আমেরিকা চেনার চেষ্টা চালাচ্ছি। একটা কিছু বিসদৃশ চোখে পড়লেই ধরে ফেলেছি, ধরে ফেলেছি ভাব নিয়ে পুলকিত হচ্ছি। এই যেমন এই ঘণ্টাখানেকের মধ্য একটা জিনিস চোখে পড়েছে। যারা সাধারণ এমপ্লয়ি, ঝাড়ু দিচ্ছে বা হাত ঠেলা টানছে কিংবা বুড়ো-বুড়ির হাত ধরে নিয়ে আসছেন কাউন্টারের দিকে, তারা অধিকাংশই কালো চামড়ার। পরেও এটা দেখতে দেখতে নিশ্চিত হয়েছি যে, গণতন্ত্রের যত বাকফট্টাই আমেরিকা করুক না কেন, আমেরিকা থেকে হোয়াইট সুপ্রিমেসি কখনো যাবে না। যে কালো মানুষের শ্রমনির্ভরতা আমেরিকাকে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ করেছে, তাদের প্রতি বৈষম্য ও অবহেলা এখনো, এই একুশ শতকেও গড় আমেরিকান বাসিন্দাদের অস্থিমজ্জায়।

গেটের বাইরে আসামাত্র এক দমকা টাটকা বাতাস মন ভালো করে দিল। গ্লোবাল ভিলেজের অন্যতম ধনী শহর এই নিউ ইয়র্ক। আমি নেমেছি নিউ জার্সির কাছে, তুলনায় ছোট এয়ারপোর্টে। সামনে ঝা চকচকে রাস্তা। নানা ভাষাভাষী, নানা ধর্মের, জাতের লোকজন নিজের নিজের গন্তব্যে যেতে বাহন খুঁজছেন। এক মহিলা ট্যাক্সি লাগবে কি না আমার কাছে জানতে চাইলেন। ততক্ষণে ভাসানী ফাউন্ডেশনের সেক্রেটারি মহম্মদ নাসের গাড়ি চালিয়ে সটান আমার কাছে। পরম উষ্ণতায় বুকে টেনে নিলেন। আমেরিকা গিয়ে কোথায় কী করব, কদিনের ভয় নিমেষে ভেঙে গেল। পইপই করে আমার বন্ধু, ডাক্তার অনিরুদ্ধ বোস বলে দিয়েছিল যে, গিয়ে হোটেলে ঢুকেই ঘুমের ওষুধ খেয়ে আগে অন্তত চার ঘণ্টা ঘুমিয়ে নিবি। না হলে জেটলগে মাথা ধরে থাকবে।

কিন্তু নতুন শহর, পুঁজিবাদী দুনিয়ার স্বর্গরাজ্য দেখার আনন্দে জেটলগ-টগ কোথায় চলে গেছে। ওয়েদার ভারি চমৎকার। সামান্য শিরশির করছে। নাসের ভাই জোর করে কফি মগ ধরিয়ে দিয়ে নিজে স্টিয়ারিংয়ে হাত দিয়েই ঘোষণা করে দিলেন, হোটেল টোটেল পরে হবে দাদা, আপনি তো ইয়াং, ফ্রেশ লাগছে। চলুন, শহরটা এক চক্কর ঘুরিয়ে দেখাই আপনাকে। এক্কেবারে রাতে হোটেলে ঢুকবেন। অনিরুদ্ধর মুখ আবছা মনে পড়লেও খুশিই হলাম। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে দেখছি ঝলমলে নীল আকাশ। লিঙ্কন টানেল পার হতেই দুনিয়ার সম্ভবত সবচেয়ে ধনী এলাকা, ম্যানহাটনের চৌহদ্দিতে, বিরাট বিরাট গগনচুম্বী প্রাসাদের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকছি। দু-পা সামনে এগোতেই হাডসন নদী। পাল তোলা নৌকা ঘাটে দাঁড়িয়ে। এও যেন এক টুকরো বাংলা। নদীর জলে রোদ চিকচিক করছে। আকাশ জল মিলেমিশে কবিতার জন্ম দিচ্ছে। হাডসনকে মুহূর্তে ভালোবেসে না ফেলে উপায় নেই। হাডসন যেন সেই ‘কীর্তিনাশা’, যার রূপে ডুবে আমেরিকার সব দোষ আপাতত মাফ করে দিলাম।

লেখক: ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত