নিউজিল্যান্ড দলের অনুশীলন শেষ হতেই শুরু গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। কিছুক্ষণ পর তিন ম্যাচ ওয়ানডে সিরিজের ট্রফি নিয়ে দুদেশের অধিনায়কের ফটোসেশন শেষ হতেই মুষলধারে বৃষ্টি ভিজিয়ে দিল পুরো শের-ই-বাংলা স্টেডিয়াম। তাতে হোম অব ক্রিকেটের সেন্টার উইকেটে অনুশীলনের সুযোগটা শেষ হয়ে যায় বাংলাদেশের। ইনডোরে খানিকক্ষণ গা গরমের মধ্য দিয়ে আজ থেকে শুরু হতে যাওয়া তিন ম্যাচ ওয়ানডে সিরিজের প্রস্তুতি সেরেছে স্বাগতিকরা।
তারপরও উপভোগ্য একটা সিরিজের আশা অধিনায়ক লিটন কুমার দাসের। চাপমুক্ত থেকে খেলাটাকে উপভোগ করার কথা বলেছেন তিনি। তবে একেবারে নির্ভার থাকার উপায় নেই। এই সিরিজ অনেকের জন্যই বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়ার শেষ সুযোগ। তাই যতটা না এটি উপভোগের, ঠিক ততটাই নিজেদের প্রমাণের।
সাম্প্রতিক সময়ে ওয়ানডের সুরটা যেন একটু বেসুরো ঠেকছে বাংলাদেশের। বিশেষ করে ওপেনিংয়ে একটা দুর্বলতা থেকেই যাচ্ছে। সর্বশেষ এশিয়া কাপে খেলা পাঁচ ম্যাচেই ওপেনিং জুটি ব্যর্থ হয়েছে বড় সংগ্রহের ভিত গড়তে। তাই কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহেকে বারবার আনতে হয়েছে বদল। পাঁচ ম্যাচের চারটিতে গোড়াপত্তনে জুটি বদলেও মেলেনি সাফল্য। তামিম ইকবালের অনুপস্থিতির সুযোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছেন নাঈম শেখ। প্রায় প্রতি ম্যাচেই সেট হয়ে উইকেট বিলিয়ে উল্টো ভাবনা বাড়িয়েছেন।
প্রমোশন পেয়ে নাঈমের সূচনাসঙ্গী হয়ে প্রথম ম্যাচে সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছিলেন মেহেদী হাসান মিরাজ। ১১২ রানের সেই ইনিংসের পর অবশ্য সেভাবে হাসেনি তার ব্যাট। ভারতের বিপক্ষে শেষ ম্যাচে তানজিদ তামিমকে নিয়ে ইনিংস সূচনায় নেমে রানই পাননি লিটন। অর্থাৎ গোড়ায় গলদটা ভুগিয়েছে পুরো এশিয়া কাপ জুড়েই।
ব্যর্থতার সেই বৃত্তটা আজ কাপ্তান লিটনকে নিয়ে ভাঙতে হবে অভিজ্ঞ তামিম ইকবালকে। গত জুলাইয়ে আফগানিস্তানের বিপক্ষে হোম সিরিজের প্রথম ম্যাচে হারার পর হুট করেই অধিনায়ক পদ থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন তামিম। এরপর থেকেই মাঠের বাইরে তিনি। সেই ঘটনার আগে ব্যাট হাতেও খুব ভালো অবস্থানে ছিলেন না তামিম। তাই এই সিরিজ তার জন্য নিজেকে ফিরে পাওয়ার মঞ্চ।
বিশ্বকাপ দলে জায়গা পাওয়া নিয়ে সংশয় নেই। তবে লিটনের জন্যও এটা স্বরূপে ফেরার সুযোগ। বেশ কিছুদিন ধরে হাসছে না এই ডানহাতি ওপেনারের ব্যাট। সর্বশেষ ১০ ওয়ানডেতে পঞ্চাশোর্ধ্ব ইনিংস মাত্র ২টি। জ্বর থেকে সুস্থ হয়ে এশিয়া কাপে খেলা তিন ম্যাচে যথাক্রমে ১৬, ১৫ ও ০।
সাকিব, মুশফিকুর রহিম, শান্তদের বিশ্রামের সুযোগটা এই সিরিজে কাজ লাগাতে চাইবেন আরও অনেকে। মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ, সৌম্য সরকাররা অনেক দিন ধরেই জাতীয় দলে ব্রাত্য। শেষ কয়েকটি সিরিজে ছয়-সাতে মাহমুদুল্লাহর জায়গায় অনেককেই পরখ করা হয়েছিল। তবে কেউই পারেননি থিতু হতে। ফলে মাহমুদুল্লাহ এই সিরিজে পেয়েছেন লাইফ লাইন। সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপ খেলতে তাই বিস্ফোরিত হতে হবে তাকে। দীর্ঘদিন অফ ফর্মে থাকা সৌম্যর জন্য বিশ্বকাপের টিকিট পাওয়া মাহমুদুল্লাহর মতোই কঠিন। তারপরও এই বাঁহাতি সহজাত প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে পারলে সুযোগ মিলতেও পারে। একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আজ নতুন শুরু করতে চলেছেন এনামুল হক বিজয়, নুরুল হাসান সোহান, শেখ মেহেদী হাসানরা।
বোলিং নিয়ে সেভাবে ভাবনা নেই। তাসকিন, শরীফুল, হাসান মাহমুদরা না থাকলেও মোস্তাফিজ, খালেদ, তানজিম সাকিবরা জোরে বলে সাহস দেখাচ্ছেন। আর বাংলাদেশের স্পিনটা তো সেই ২০০৮ সালের পর থেকেই কিউইদের জন্য বড় রহস্যের।
ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সাদা বলের শেষ তিনটি সিরিজ থেকে অনুপ্রেরণা নিতেই পারে বাংলাদেশ। নিজেদের আঙিনায় ২০০৮ সালের পর নিউজিল্যান্ডের কাছে হারেনি বাংলাদেশ। ২০১০ ও ২০১৩ সালে ওয়ানডে সিরিজ দুটিতে রীতিমতো নাস্তানাবুদ হতে হয়েছে কিউইদের। দুবারই হতে হয় হোয়াইটওয়াশ। পূর্ণ শক্তির দল নিয়েও স্লো-উইকেটে বাংলাদেশের স্পিনারদের রহস্যভেদ করতে পারেনি ব্ল্যাকক্যাপরা।
নিউজিল্যান্ডের কাছে প্রথম দুটি হোম সিরিজে হেরেছিল বাংলাদেশ। ওয়ানডেতে সব মিলিয়ে দুই দল মুখোমুখি হয়েছে ২৯ বার। তাতে নিউজিল্যান্ডের জয় ২১ ম্যাচে। বাংলাদেশ যে আট ম্যাচ জিতেছে তার সবকটিই ঘরের মাঠে।
নিজেদের কন্ডিশনে অতীত সাহস জোগাচ্ছে বলেই হয়তো উইকেটের গতি-প্রকৃতি নিয়ে খুব বেশি ভাবনা নেই লিটনের। বৃষ্টি মাথায় অবশ্য অন্তর্বর্তীকালীন কোচ নিক পোথাসকে নিয়ে উইকেট দেখতে গিয়েছিলেন লিটন।
তার আগে ব্যাটে ছন্দ ফেরাতে নিজের চেষ্টার কথাটা বলেছেন তিনি, ‘আমি চেষ্টা করছি, প্র্যাকটিস করছি, (সমস্যাগুলো) কীভাবে ফাইন্ড আউট করা যায়। আশা করছি তাড়াতাড়ি কামব্যাক করতে পারব। আত্মবিশ্বাসের বিষয় না। প্র্যাকটিস করছি, দেখা যাক কী করতে পারি।’
অনেক দিন পর ব্যাটিং অর্ডারে মাহমুদুল্লাহ, তামিম, সৌম্যের মতো অভিজ্ঞদের পেয়ে লিটনের আশা তারা নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত আছেন, ‘তাদের ভূমিকা নিয়ে আমি বলতে চাই না। পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। যদি দ্রুত উইকেট পড়ে যায়, রিয়াদ ভাই ব্যাটিংয়ে গেলে ৩০-৩৫ ওভারের গেম থাকলে উনি ওনার মতো খেলবেন। এটা বলার দরকার নেই, উনি অনেক ম্যাচিউরড। একই কথা সৌম্যর ক্ষেত্রেও। যেখানেই সুযোগ পাবে তারা রান করার চেষ্টা করবে। শুধু তারা দুজন না, প্রত্যেক ব্যাটারের দায়িত্ব রান করা।’
এশিয়া কাপের পর এই সিরিজ নিয়ে সেভাবে কাজ করার সুযোগ হয়নি। তাই কিউইদের শক্তি-দুর্বলতার দিকগুলো খুব বেশি জানা হয়নি। লিটন সেটা স্বীকার করে নিজেদের পরিকল্পনা করার কথা বলেছেন, ‘ট্যাকটিক্যালি তো কিছু করতে পারিনি, গত কিছু দিন অনুশীলন করতে পারিনি। জানি না আজও কতখানি প্র্যাকটিস করতে পারব। হয়তো প্র্যাকটিস ছাড়াই মেইন ম্যাচে খেলা লাগতে পারে। এটা মানসিকতার খেলা। ওদের স্পিনও ভালো, কোয়ালিটি স্পিনারও কিন্তু আছে।’
বিশ্বকাপের সুযোগ পাওয়ার মঞ্চ বলেই এই সিরিজ দলীয় সাফল্য নিয়ে কাল খুব বেশি প্রশ্ন হয়নি। তবে অধিনায়ক হিসেবে একটা সিরিজ জয়ের স্বাদ নিতে মুখিয়ে লিটন, ‘আমি যখন ক্যাপ্টেন হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছি, আমার প্রথম কাজ ম্যাচ জেতা। দিনশেষে ১০০ করলে বা ৫ উইকেট পেয়ে ম্যাচ না জিতলে এটার মূল্য থাকে না। সব খেলোয়াড় পারফর্ম করতে চাইবে। একদিনে সবাই পারফর্ম করবে না, হয়তো ১-২ জন করবে। এটাই ক্রিকেট, এটাই হয়ে আসছে, সামনেও এটাই হবে। সবাই চেষ্টা করবে, যার কপালে থাকবে, দিন থাকবে, সে ভালো করবে। মূল লক্ষ্য থাকবে ম্যাচ জেতা।’
নিউজিল্যান্ড বিশ্বকাপকে সামনে রেখে বেশিরভাগ ক্রিকেটারকে বিশ্রাম দিয়ে দ্বিতীয় সারির দল নিয়ে এসেছে। এই দলে নিয়মিত অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসন, টম ল্যাথাম, ড্যাভন কনওয়ে, ম্যাট হেনরি, ড্যারিল মিচেল, গ্ল্যান ফিলিপস, মিচেল স্যান্টনার, টিম সাউদিরা নেই। দলের নেতৃত্ব দেবেন ফাস্ট বোলার লকি ফার্গুসন। প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে খেলতে আসা ফার্গুসন বারবার ঘরের মাঠে বাংলাদেশকে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ আখ্যা দিয়ে যেন নিজেদের ওপর থেকে চাপটা কমাতে চাইলেন। একই সঙ্গে অতীতে এখানে ভালো করতে না পারার আক্ষেপটা এবার ভুলিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যের কথাও জানিয়েছেন। আর মিরপুরের উইকেটের গতি প্রকৃতি দেখে কিউইদের অন্তর্বর্তীকালীন কোচ লুক রঙ্কির বিশ্বাস নিজেদের পছন্দের উইকেট বানিয়েই বাংলাদেশ চাইবে সাফল্যের ধারা অব্যাহত রাখতে। তবে তার জন্য তার শিষ্যরা প্রস্তুত সেটাই জানিয়েছেন তিনি।