মার্কিন ভিসানীতি সিআইএ থেকে এনইডি

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১১:১৪ পিএম

ডভ এইচ লেভিন হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ও লোকপ্রশাসন বিভাগে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে পড়ান। লস অ্যাঞ্জেলেসের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি নিয়ে কার্নেগি-মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব পলিটিক্স অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিতে পোস্ট ডক ফেলো হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। তার গবেষণার মূল মনোযোগে ছিল বিভিন্ন দেশের নির্বাচনে বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর পক্ষপাতমূলক হস্তক্ষেপ। এসব নিয়ে তিনি একটি বই লেখেন। ‘মেডলিং ইন দ্য ব্যালট বক্স : দ্য কজেস অ্যান্ড এফেক্টস অব পার্টিজান ইলেক্টরাল ইন্টারভেনশনস’ নামের বইটি ২০২০ সালে প্রকাশ করে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস। পরের বছর তা জার্ভিস-শ্রোয়েডার বেস্ট বুক অ্যাওয়ার্ড পায়। 

 

বইটার শুরু হয়েছে ২০১৩ সালের গোড়ার দিকের একটি ঘটনা দিয়ে। কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিনকয়েক আগের কথা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আফ্রিকাবিষয়ক সহকারী সেক্রেটারি অব স্টেট জনি কারসন এক সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশ্যে সতর্ক করেন যে, উহুরু কেনিয়াত্তা বিজয়ী হলে তার জন্য কেনিয়ানদের ‘গুরুতর পরিণতি’ ভোগ করতে হবে। কেনিয়াত্তার বিরুদ্ধে তখন আন্তর্জাতিক আদালতের একটি তদন্ত চলছিল। একজন প্রার্থীকে হারিয়ে আরেকজনকে জেতানোর এই যে মার্কিন প্রচেষ্টা, তা ওই নির্বাচনে সফল হয়নি। কিন্তু বিস্ময়করভাবে নির্বাচনে জেতার পর যখন কেনিয়াত্তা ইউএস-আফ্রিকা সামিটে অংশ নেন, তখন থেকে বেশ কিছুদিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সেই তিক্ততার আর দেখা মেলেনি তার।

এমন দৃষ্টান্ত যে দুনিয়ায় কত, তার একটা সংখ্যা বের করে আনার প্রচেষ্টা চালিয়েছেন লেভিন। ১৯৪৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০০০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশ্বের স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোতে মোট ৯৩৭টি জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে লেভিন ১১৭টি পক্ষপাতমূলক নির্বাচনী হস্তক্ষেপের ঘটনা তার বইতে তুলে এনেছেন। তার হিসাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ১১.৩ শতাংশ নির্বাচনে পক্ষপাতমূলক হস্তক্ষেপ করা হয়েছে কিংবা বলা যায় এই সময়কালে প্রতি ৯টি নির্বাচনের একটি এই হস্তক্ষেপের শিকার হয়েছে। লেভিন বলছেন, এর মধ্যে ৮১টি ঘটনা ঘটিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, শতকরা হিসাবে যা ৬৯ ভাগ। একই সময়ে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন বা রাশিয়া ঘটিয়েছে ৩৬টি ঘটনা, যা মোট ঘটনার ৩১ শতাংশ। তিনি দেখিয়েছেন, ৬০টি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্রে এই হস্তক্ষেপগুলো ঘটেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সব থেকে বেশি হস্তক্ষেপের প্রচেষ্টা চালিয়েছেন ইতালির নির্বাচনে, সংখ্যায় যা দাঁড়ায় ৮ বার। এর বাইরে জাপানে ৫ বার, ইসরায়েল, লাওস ও শ্রীলঙ্কায় ৪ বার করে হস্তক্ষেপ প্রচেষ্টা হয়েছে।

ভিনদেশের নির্বাচনে নাক গলানোর এই প্রবণতা নিয়ে লেভিনের আলোচনা নতুন কিছু নয়। দীর্ঘ সময় ধরে তা চলে আসছে। লেভিনের পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট যে, এক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সব থেকে বেশি তৎপর। একটা সময় ছিল, যখন এসব কাজে গোপনে টাকা ঢালত মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। সেগুলো ছিল কভারড বা গোপনীয় অপারেশনের আদলে। সামরিক অভ্যুত্থান থেকে শুরু করে শ্রমসংস্থাকে কাজে লাগিয়ে এসব কাজ করা হয়। এমনকি নির্বাচিত রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানকে হত্যার অভিযোগও তাদের বিরুদ্ধে আছে বেশ শক্তভাবে। এসব তথ্য আজ আর কারও অজানা নেই। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের তাতে কিছুই আসে-যায়নি। কারণ, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তাদের ক্ষমতা বদলের দোকানদারির নতুন নতুন আধুনিক সংস্করণ হাজির হয়েছে বাজারে। আর বিশ্বজুড়ে তার খদ্দেরও কম নেই!

প্রধানত ষাটের দশকের শেষভাগে বেশ কিছু মার্কিন বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকে বিদেশি রাষ্ট্রে হস্তক্ষেপের জন্য হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে সিআইএ অর্থ তহবিল দিচ্ছে বলে তথ্য প্রকাশিত হয়। সেই সময় লিন্ডন বি জনসন প্রশাসন এ ধরনের তহবিল বন্ধ করে একটি পাবলিক-প্রাইভেট মেকানিজমভিত্তিক তহবিল গঠনের মাধ্যমে একটি সংস্থা স্থাপনের সুপারিশ করে, যাদের কাজ হবে বিদেশি কার্যক্রমে অর্থায়ন। ১৯৭৪ সালে প্রাক্তন সিআইএ বিশেষজ্ঞ ভিক্টর মার্চেটি সংস্থাটির গোপন সব অপারেশনের ফিরিস্তি প্রকাশ করেন। একই বছর নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক শেমুর হার্স দেশে দেশে সরকার বদলে সিআইএর গোপন মিশন নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। পরের বছর প্রাক্তন সিআইএ এজেন্ট ফিলিপ এগি লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে সিআইএর হস্তক্ষেপ ও প্রভাব বিস্তার নিয়ে একটি বই লিখলে বিষয়টি আরও খোলাসা হয়ে যায়। কিন্তু ততদিনে মার্কিনদের এই ক্ষমতা বদলের দোকানদারির শিকার হয়ে বসে আছে চিলি থেকে শুরু করে ছোট্ট দ্বীপ ব্রিটিশ গায়ানাও। শেষে পুরনো পদ্ধতি বদলের সিদ্ধান্ত নেয় মার্কিন প্রশাসন। ১৯৮১ সালে ওয়েস্টমিনিস্টার প্রাসাদে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সামনে বৈদেশিক নীতি নিয়ে ভাষণ দিতে গিয়ে তৎকালীন ইউএস প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগান একটি নতুন মার্কিন সংস্থা তৈরির ঘোষণা দেন, যা উদার আদর্শ, বাজার অর্থনীতি ও মার্কিন আদলের গণতন্ত্রকে উৎসাহিত করবে। এরপর ইউএসএআইডি থেকে অর্থ নিয়ে একটি আধা বেসরকারি অলাভজনক করপোরেশন প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করা হয়। যার নাম দেওয়া হয় ন্যাশনাল এন্ডোমেন্ট ফর ডেমোক্রেসি (এনইডি)। যে সংস্থার সহপ্রতিষ্ঠাতা অ্যালেন ওয়েনস্টেইন ১৯৯১ সালে বলেছিলেন, ‘আজকাল আমরা যা (প্রকাশ্যে) করি, তার অনেকগুলোই ২৫ বছর আগে সিআইএ গোপনে করত।’ প্রতিষ্ঠার পর থেকে পৃথিবীর নানা দেশে এনইডির পরিকল্পিত অর্থায়নের ফলাফল নিয়ে বিতর্ক আছে। এই সংস্থা নিয়ে বিস্তারিত আলাপ রয়েছে আমার ‘সিআইএ থেকে এনইডি : গণতন্ত্রের ফেরিওয়ালা নাকি মার্কিন মেডলিং মেশিন’ নামের বইতে। সেখানে আলোচনা করা হয়েছে, কীভাবে এনইডিকে কাজে লাগিয়ে চোখের সামনে গণতন্ত্রের নামে ভিনদেশে নাক গলিয়ে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করে নেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার পর থেকে বিশ্ব শক্তিগুলোর নানা তৎপরতা চোখে পড়ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের দোকানদারিও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। চলতি বছরের ২৪ মে মার্কিন প্রশাসন বাংলাদেশকে বাগে আনতে একটি ভিসানীতি ঘোষণা করেছে। যদিও তারা বলছেন, বাংলাদেশের অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের বিরুদ্ধে যারা কাজ করবেন, তাদের জন্য এই ঘোষণা। অতি সম্প্রতি সেই ঘোষণা আবার দফায় দফায় কার্পেটের ভাঁজ খোলার মতো নতুন নতুন তথ্য নিয়ে হাজির হচ্ছে আমাদের সামনে। এগুলোর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণও চলছে। মার্কিন অ্যাম্বাসি সামাজিক মাধ্যমে পেইড স্পন্সরশিপ দিয়ে এই তথ্য বেশি বেশি প্রচারের ব্যবস্থা করেছে। ভিসানীতি ওদের নিজস্ব ব্যাপার। কাকে দেবে, কাকে দেবে না সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রই বুঝবে ভালো। কিন্তু ভাঙা ক্যাসেটের এই রেকর্ড বারবার ব্যবহারের প্রবণতা থেকে কিছু প্রশ্ন জাগা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

এ কথা অনস্বীকার্য যে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান সমুন্নত রাখতে শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। এটিও সত্যি যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বৃহৎ শক্তিগুলো ভিনদেশে হস্তক্ষেপের জন্য সে দেশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন অংশকে ব্যবহার করে থাকে। কাজেই সেই পরিবেশ দূর করে আস্থা ফেরানোর চ্যালেঞ্জ নিজ নিজ রাষ্ট্রকে নিতে হবে। কিন্তু মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলারের বিবৃতিতে দেখা যাচ্ছে, ‘গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বাধাদানকারী’দের ভিসা নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনছে দেশটি। বলা হচ্ছে, এতে ওই ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যরাও অন্তর্ভুক্ত হবেন। যদি তাদের ‘অপরাধী’ও ধরে নিই, তাহলেও প্রশ্ন ওঠা সংগত যে, পৃথিবীর তাবৎ গণতন্ত্র আর মানবাধিকারের রক্ষাকর্তা হিসেবে আবির্ভূত রাষ্ট্রটি তাহলে ‘কিন পানিশমেন্ট’ ধারণার পক্ষে? তাহলে এতদিন ধরে তারা যে এ ধরনের ব্যবস্থার জন্য স্বৈরতন্ত্রকে দায়ী করে আসছিলেন, তার কী হবে? কারণ, আধুনিক আইনের খুব সাধারণ ব্যাপার হলো, একের অপরাধের সাজা অন্যকে দেওয়া ন্যায়বিচার নয়। যদিও মার্কিন মুলুকেই গ্রানাইট সিটির মতো কিছু শহরে ‘নিরাপদ আবাসের’ নামে একজনের অপরাধের সাজা পুরো পরিবারসমেত দেওয়া হয়! আবার মাত্র দুদিন আগে এক টেলিভিশন চ্যানেলে মার্কিন অ্যাম্বাসেডর পিটার হাস বলেছেন, এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় গণমাধ্যমও আসবে! মনে রাখা জরুরি, কয়েক বছর আগে ভিসার জন্য দেশটি আবেদনকারীর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের হদিস চেয়েছিল। যাতে ওসব দেখে-টেখে তারা ভিসা দেওয়া-না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার রক্ষক দাবিকারীদের এসব সিদ্ধান্ত কোন স্বাধীনতা সমুন্নত করে কে জানে!

লেখার শুরুতে যে বইটির কথা বলা হয়েছে, শেষে আবারও ফিরতে হবে তার কাছে। লেভিনের গবেষণা থেকে বেরিয়ে আসা একটি চমকপ্রদ পর্যবেক্ষণ এই বইয়ে স্থান পেয়েছে, যা এ বিষয়ে আমাদের একটি পুরনো দৃষ্টিভঙ্গিকে নাড়িয়ে দিতে পারে। গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি না পেলে সেসব রাষ্ট্রে এমন বহিঃশক্তির হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটে বলে সচরাচর বলা হয়ে থাক। কিন্তু লেভিন দেখিয়েছেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা শুরুর কিংবা রাষ্ট্রের প্রথম নির্বাচনে পক্ষপাতমূলক হস্তক্ষেপের ঘটনা মাত্র ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ। ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ হস্তক্ষেপ একই রাষ্ট্রে একাধিকবার ঘটেছে। আর একই রাষ্ট্রে পর পর নির্বাচনে ধারাবাহিক হস্তক্ষেপের হার ৭১ শতাংশ। অঞ্চলভিত্তিক রাষ্ট্রগুলোতে হস্তক্ষেপের সংখ্যা ও সময়কাল বিশ্লেষণ করে লেভিন জানান, বৃহৎ রাষ্ট্রের এই হস্তক্ষেপ প্রকৃতপক্ষে তাদের নিজস্ব উদ্দেশ্য সাধনে ব্যবহৃত হয়। যদিও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিষয়টিকে নানা রকম আকর্ষণীয় প্রপঞ্চ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়ে থাকে। উপস্থাপন যত আকর্ষণীয় নামেই হোক, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন কৌশলের মূল লক্ষ্য, তাদের নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে ভীতি প্রদর্শন, যেখানে প্রয়োজনে তারা মধ্যযুগীয় ‘কিন পানিশমেন্ট’ ধারণা প্রয়োগ করতেও মরিয়া। কাজেই বিশ্ব সম্প্রদায়কে এই বার্তাটি নেওয়া উচিত যে, সিআইএ থেকে এনইডি হয়ে এখন ভিসানীতি মার্কিন হস্তক্ষেপ কৌশলের নতুন সংযোজন।

লেখক: সংবাদকর্মী, লেখক ও চলচ্চিত্রকর্মী

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত