শিক্ষক দিবস

অসম্ভব সুন্দর এক শাসন

আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০২৩, ০৮:০৫ পিএম

সেটা ছিল আমার জীবনের প্রথম (পরীক্ষায়) নকল করা ও শেষ নকল করা।
আমি পরীক্ষা দিতে গেলে সিট প্ল্যানিং না থাকলে একেবারেই সামনের বেঞ্চে বসি।
কিন্তু সেদিন সিট প্ল্যান ছিল।
চলছিল এসএসসির প্রিটেস্ট পরীক্ষা।
পরীক্ষার আগে এক মাস ঢাকায় মামা বাড়ি বেড়িয়ে পড়াশোনাকে শিঁকেয় তুলে রেখে এখন পরীক্ষায় কমন পড়ছে না খুব একটা।
আমার পেছনের বেঞ্চেই ছিল বান্ধবী পাতা।
বদের হাড্ডি, ব্যাকবেঞ্চার, নকলবাজ।
ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রে রচনা কমন পড়েনি একটাও।
সব লিখে এদিক সেদিক তাকাচ্ছি।
সেটা দেখে পাতা আস্তে আস্তে বলল, ‘এসে পারছিস না? আমার কাছ আছে, নিবি?’
দুরুদুরু বুকে নিয়ে নিলাম (নকল)।
কিন্তু ছাই (নকল) করে ক্যামনে?
‘খাতার মাঝে রেখে লেখ।’
কিন্তু কীভাবে?
বার বার খাতা উল্টালে স্যার টের পেয়ে যাবেন।
দুই লাইন লিখে রীতিমতো ঘামছি।
এমন সময় স্যার এসেছেন খাতা সই করতে।
আমার মনেই নেই খাতার ভাঁজে নকল রাখতে গিয়ে ওটা চলে গিয়েছে প্রথম পাতায়।
নির্মল স্যার খাতাটা হাতে নিয়ে ওল্টাতেই সুড়ুৎ করে মাটিতে পড়ে গেল সেটা।
আর সেই সঙ্গে আমিও মিশে যাচ্ছিলাম মাটির সাথে।
কাল স্কুলে সবার কাছে মুখ দেখাব কী করে?
আমি যে ক্লাসে ফার্স্ট গার্ল!
সবাই ভাববে আমি বুঝি নকল করে ভালো রেজাল্ট করি।
বসে আছি মাথা নিচু করে।
কাঁপছি আর ঘামছি। ভয় পাচ্ছি কাঁদতেও।
স্যার আমার দিকে একবার তাকালেন। তারপর একটু এদিক-সেদিক তাকিয়ে তুলে নিলেন কাগজটা।
এমনভাবে পুরে দিলেন নিজের ফতুয়ার পকেটে যেন তা কেউ দেখতে না পায়।
গলা খাঁকারি দিয়ে খাতায় সই করে হাত রাখলেন আমার মাথায়,
‘তোকে এটা মানায় না, মা।’ খুব নিচু স্বরে বললেন তিনি। টপটপ করে পানি ঝরে পড়ল আমার চোখ দিয়ে।
এরচেয়ে বড় অপমান যে আর নাই!
জীবনে শুধু নকল না, কোনো অন্যায় করতে গেলে আমার আজও আমার মনে হয় নির্মল স্যার ফিসফিসিয়ে কানের কাছে বলছেন, ‘তোকে এটা মানায় না, মা।’
স্যার আজ পরপারে।
অনেক বছর পরে দেখা হলে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে উল্লেখ করলাম সেদিনের কথা।
‘স্যার, আপনার মনে আছে?’
‘অত মনে নেই রে, মা। কিন্তু যা করেছিলাম তোর ভালোর জন্যই করেছিলাম। সেই এত্তটুকুন থেকে তোকে দেখে আসছি না? তুই কি নকল করার মেয়ে ছিলি?’
মাঝে মাঝে ভাবি, কী অসম্ভব সুন্দর শাসন ছিল সেটা।
স্যার যদি সেদিন আমাকে প্রকাশ্যে অপমান করতেন আমার জীবনটা হয়তো অন্যরকম হত।
এত শক্ত ন্যায়বোধ তৈরি হত না কিছুতেই।
বেহায়া হয়ে অন্যায় করতাম আরও।
আহা, শিক্ষক!
আজ সেই শিক্ষকেরা সমাজে অপদস্থের শিকার হচ্ছেন ছাত্রদের হাতে।
এ জাতিকে রক্ষা করবে কে তবে?
কে দেখাবে সঠিক পথের দিশা?

লেখক: উপদেষ্টা, সেবা প্রকাশনী

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত