চট্টগ্রামের খুলশীর চিত্রভাষা গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত হলো শিল্পী—আলোকচিত্রী মইনুল আলমের ছবি-বই ‘মাংসি’ নিয়ে এক অন্তরঙ্গ আড্ডা ও আলোচনা। সৃজনশীল প্রকাশনী পূর্বস্বর থেকে প্রকাশিত ছবি-বই মাংসি। ২৩২ পৃষ্ঠার এই বইয়ে স্থান পেয়েছে ২১০টি দুর্লভ আলোকচিত্র। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি ছিলেন স্বনামধন্য আলোকচিত্রী আবীর আবদুল্লাহ, লেখক—গবেষক পাভেল পার্থ এবং লেখক ইয়াংঙান ম্রো।
যেকোনো উৎসবের আগে ম্রো সমাজের ছেলেমেয়েরা কাপড়ে রাংসি (লাল রং) ও মাংসি (সবুজ রং) লাগায়। মইনুল আলম এই ম্রো শব্দ মাংসিকেই ধার করেছেন তার বইয়ের নাম হিসাবে। সমাজের প্রান্তিক জনজীবনই তাকে আকৃষ্ট করেছে শুরু থেকে এবং তা কতোটা গভীরভাবে সেটা এই নামকরণের মধ্যে বোঝা যায়।
আলোকচিত্রজগতে মইনুল আলমের আবির্ভাব ঘটে গত শতকের নব্বইয়ের দশকে। ৩৫ মিমি ফিল্মের নিকন এফ৩এক্স মডেলের একটি ক্যামেরার মাধ্যমে তার যাত্রা শুরু।
মাংসিতে প্রায় তিন যুগ আগেকার ম্রোদের জীবনযাপন ও বান্দরবানের নিসর্গ চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। ছবিগুলো রংবিন্যাসে যেমন চিত্তাকর্ষক, ধারণকৌশলে তেমনি বাঙ্ময়। দুই শতাধিক রঙিন আলোকচিত্রে শোভিত মাংসিতে ম্রোদের নিত্যদিনের জীবনচর্চা, খাদ্যাভ্যাস, পোশাকপরিচ্ছদ ও সাজগোজ, দূরের পথে দল বেঁধে পায়ে হেঁটে বা নৌকায় হাটে যাওয়া, মাতামুহুরী নদী তীরে সামান্য ভাতমাছ রান্না করে খাওয়া—দাওয়া, ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতি, উৎসব— নানা শ্রেণি ও বিষয়ের ছবি ধারাবাহিকভাবে পরিস্ফুট হয়েছে পাতায় পাতায়।
মাংসি বইটির ছবি ও পেছনের গল্পকে ভিত্তি করে ভিডিও প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা হয়। অনুষ্ঠানের অতিথি বক্তা ইয়াংঙান ম্রো বলেন, মইনুল আলমের বই মাংসির মাধ্যমে আমি আমার শৈশবে ফিরে যাই। মাংসি বইটির মাধ্যমে ম্রো ছেলে—মেয়েরা তাদের পূর্বপুরুষ সম্পর্কে আদি—তথ্য পাবেন যা হয়তো তারা জানতেনই না। বইতে এমন সব গল্প আছে যা এখন আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। নিজেদের ভাষা পড়ার—জানার যে গুরুত্ব তা হয়তো এখন ম্রো—রা বুঝতে পারবে।
আলোকচিত্রী আবীর আবদুল্লাহ বলেন, আমাদের এখন তিনটি জেনারেশন আমরা দেখতে পাচ্ছি, যারা ভিন্নভাবে তাদের গল্প বলবে। আলোকচিত্র ভীষণভাবে শক্তিশালী, এটি আমাদের সমগ্র পরিস্থিতির ডকুমেন্টেশন করে। মাংসি এমনই একটি বই যার মূল্য হয়তো এখন আমরা দিতে পারব না কিন্তু দীর্ঘ সময় পর এ বইটি নিয়ে গবেষণা হবে। মাংসির পেছনে মইনুল আলমের ২৭ বছরের যে পরিশ্রম তা আসলেই বিশাল।
লেখক—গবেষক পাভেল পার্থ বলেন, মানুষের গল্প বলার ক্ষমতা তাকে আলাদা করে তোলে। আলোকচিত্রীদের এই ক্ষমতা প্রবল। মইনুল আলম তার মাংসি বইয়ের মাধ্যমে আমাদের সেই গল্পই দারুণভাবে বলেছে। বইটি যতটা স্বচ্ছ, ততটাই পলিটিক্যাল। বইতে দেখতে পাই, যে সিনচো’(ম্রোদের বাঁশি) ছবি আছে তা এখন বিলুপ্ত প্রায়। আমরা ম্রোদের জাতি নিয়ে জানব, কেননা ম্রোদের জানা মানেই নিজেদের জানা। নিজেদের গল্প, ইতিহাস খুঁজে পেতে মাংসি বিরাট ভূমিকা রাখবে। ম্রোদের জানতে হলে আমাদের মাংসির কাছে আসতেই হবে।