আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসন, সুপার নিউমারারি পদে পদোন্নতি, অধ্যাপক পদ তৃতীয় গ্রেডে উন্নীতকরণসহ বিভিন্ন দাবিতে দ্বিতীয়বারের মতো (০২ অক্টোবেরর পর) আবার ১০ অক্টোবর থেকে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতি পালন করেছে কর্মবিরতি। ফলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা প্রশাসন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। শিক্ষা প্রশাসনের কেন্দ্র মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, শিক্ষা বোর্ডগুলো, এনসিটিবি, নায়েম ডিআইএ-সহ অন্য সংস্থাগুলো শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত। তাদের কর্মবিরতিতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা প্রশাসনে স্বাভাবিক কাজ চালু রাখা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১২ অক্টোবর অর্থাৎ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চলে এই কর্মবিরতি। তারপর এলো শুক্র ও শনিবার। অর্থাৎ পাঁচদিন পর্যন্ত এসব সংস্থায় কোনো কাজ হয়নি। আটকে রয়েছে শত থেকে হাজার ফাইল। এমনিতেই শিক্ষা বিভাগের সব কাজই অন্যান্য সব বিভাগের থেকে পিছিয়ে থাকে। মাউশি বা মন্ত্রণালয়ে দেশের দূর-দূরান্ত থেকে আসা শিক্ষক-কর্মচারীরা দিনের পর দিন বসে থেকেও কাক্সিক্ষত কর্মকর্তার দেখা পান না। তারা মন্ত্রণালয়, মন্ত্রীসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগদানে ব্যস্ত থাকেন। বরগুনা, কুড়িগ্রাম আর দিনাজপুরের মতো দূরবর্তী জেলাগুলো থেকে শিক্ষকরা কাজ না হওয়ায় অনেক সময় খালি হাতে ফেরত যান। এর মধ্যে আবার কর্মবিরতি। এ যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। মনে রাখতে হবে, শিক্ষা ক্যাডারদের দ্বারা পরিচালিত বলে এখানে সেবার মানের কোনো উন্নতি হয়নি। সেবা নিতে আসা শিক্ষকদের জন্য কোনো কিছু আগের চেয়ে সহজ করা হয়নি। এখানে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা থাকলে আমরা সে কথা সহজেই বলতাম। কিন্তু শিক্ষকরাই এখানে সবকিছ করছেন, কিন্তু সেবার মান কিন্তু কখনই বাড়েনি।
বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, রাজধানী ঢাকার শিক্ষা ক্যাডার নিয়ন্ত্রিত শিক্ষা দপ্তর ও সরকারি কলেজগুলোসহ সারা দেশের সরকারি কলেজগুলোতে এ কর্মসূচি চলে। কলেজগুলো তাদের নির্ধারিত কর্মসূচিগুলো পিছিয়ে দিয়েছে। পরীক্ষাও পেছানো হয়েছে। দপ্তরগুলোতে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তারা কোনো ফাইলে সই করেননি। ফলে সরকারি কলেজসহ শিক্ষার দপ্তরগুলো অচল ছিল। ক্লাস, অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা, শিক্ষা বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধীন ভর্তি, ফরম পূরণ, সব ধরনের পরীক্ষা, প্রশিক্ষণ, কর্মশালা এবং দাপ্তরিক সব কর্মকান্ড ছিল কর্মবিরতির আওতায়। শিক্ষার্থীরা তো এমনিতেই ক্লাসে আসতে চায় না, ক্লাসে এলেও পড়াশুনায় মনোযোগ দেয় না। পড়াশুনা করে পরীক্ষা দিতে চায় না। তাদের পরীক্ষা পিছিয়ে গেছে, ক্লাস হচ্ছে না। এটা যেন তাদের জন্য পোয়াবারো। কিন্তু দেশের শিক্ষার যে হাল হয়েছে তার কী হবে? কে বা কারা এজন্য দায়ী? সেদিন একজন কলেজ অধ্যক্ষ বললেন, শিক্ষার যে ক্ষতি হয়েছে সেটি কাটিয়ে উঠতে একশ বছর লেগে যেতে পারে। কত গভীর উপলব্ধি! আসলেও বাস্তব কথা। কোথায় নিয়ে গেছি আমরা শিক্ষাকে!
ধরে নিচ্ছি শিক্ষকরা আছেন, নিয়োগ হচ্ছে, পরীক্ষা হচ্ছে, বোর্ড ফল ঘোষণা করছে সবই তো ঠিক আছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে নতুন কারিকুলাম আসছে, শিক্ষার্থীরা আনন্দের মাধ্যমে শিখছে। আসলে যে কী হচ্ছে তা কিন্তু প্রকৃত অর্থে কেউ ভেবে দেখছি না। জানি না, জানার চেষ্টাও করি না। পড়াশুনা করছে না শিক্ষার্থীরা, পড়াচ্ছেন না শিক্ষকরা, হচ্ছে না মূল্যায়ন। পরীক্ষায় বসলে নকল করে লেখা, বাধা দিলে তার ওপর শারীরিক আক্রমণ। ক’দিন আগেও চুয়াডাঙ্গায় দশম শ্রেণির সরকারি স্কুলের এক ছাত্র পেছনের খাতা দেখে লেখায় তার খাতা নিয়ে যান শিক্ষক। অতঃপর শিক্ষককে চড়-থাপ্পড় মেরেছে ঐ শিক্ষার্থী। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এ কাজে দক্ষ। স্কুল শিক্ষার্থী ভাবল বড় ভাইয়েরা এগুলো করে আরও ওপরে উঠে যাচ্ছে হু হু করে, তাদের সবকিছু হচ্ছে। আমরা স্কুলের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে থাকব কেন? পরীক্ষার হলে সবার সামনে শিক্ষককে চড় মেরে বড় ভাই হতে চেয়েছিল। এই ধরনের শিক্ষার্থী তৈরি হচ্ছে সমাজে! এটি একজন শিক্ষককে চড় মারা নয়, গোটা শিক্ষক সমাজকে, গোটা শিক্ষাব্যবস্থাকে চড় মারা। ভাগ্যিস ছেলেটি কোনো রাজনৈতিক পরিবারের নয়। তাহলে শিক্ষককেই হয়তো এতক্ষণে জেলে যেতে হতো।
ক্যাডারভুক্ত কর্মকর্তারা বলছেন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা মোতাবেক আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসন, সুপার নিউমারারি পদে পদোন্নতি, অধ্যাপক পদ তৃতীয় গ্রেডে উন্নীতকরণ, অর্জিত ছুটি দেওয়া ও আনুপাতিক হারে প্রথম ও দ্বিতীয় গ্রেডসহ প্রয়োজনীয় পদসৃজন, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন দপ্তর-অধিদপ্তরের জন্য বিসিএস সাধারণ শিক্ষা কম্পোজিশন অ্যান্ড ক্যাডার রুলস ১৯৮০ পরিপন্থি সব নিয়োগবিধি বাতিল, শিক্ষা ক্যাডার তফসিলভুক্ত পদ থেকে শিক্ষা ক্যাডার বহির্ভূতদের প্রত্যাহার, জেলা-উপজেলায় শিক্ষা ক্যাডার পরিচালিত শিক্ষা প্রশাসন সৃষ্টি ও চাকরির ৫ বছর পূর্তিতে ষষ্ঠ গ্রেড প্রদান করতে হবে। কর্মকর্তারা বলছেন, বঞ্চনা আর বৈষম্যের মাধ্যমে এই পেশার গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে চতুর্থ গ্রেডের ওপর কোনো পদ নেই। শিক্ষা ক্যাডারে সর্বোচ্চ অধ্যাপক পদটি চতুর্থ গ্রেড হওয়ায় পঞ্চম গ্রেড থেকে তৃতীয় গ্রেডে পদোন্নতির সুযোগ নেই। তাই অধ্যাপক পদটি তৃতীয় গ্রেডে উন্নীত করা এবং আনুপাতিক হারে প্রথম ও দ্বিতীয় গ্রেডের পদ তৈরি করা জরুরি হয়ে পড়েছে। তারা আরও বলছেন, ২০১৫ সালে নতুন পে-স্কেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডাররা। তাদের পূর্ণ গড় বেতনে অর্জিত ছুটির বিষয়ে ২০০৭ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্মতি প্রদান করলেও প্রশাসনের আন্তরিকতার অভাবে এটি আলোর মুখ দেখেনি। তাই সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারদের দাবি আদায়ে জরুরিভাবে একটি দক্ষ, যুগোপযোগী ও স্বয়ংসম্পূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন সময়ের দাবি।
শিক্ষা ক্যাডারের সব দাবিই যৌক্তিক। রাষ্ট্রকে এগুলো বিবেচনায় নিতে হবে যদি শিক্ষাকে আমরা মূল্যায়ন করতে চাই, দেশের ভবিষ্যৎ নাগরিকদের সঠিকভাবে তৈরি করতে চাই। আবার শিক্ষকদেরও অন্য সব পেশার মতো হলে চলবে না। শিক্ষার যে করুণ দশা তার জন্য আমরা সবাই কম-বেশি দায়ী। শুধুমাত্র রাষ্ট্রের ওপর দায় চাপালে হবে না। এর সঙ্গে যারা জড়িত তাদের দায়দায়িত্ব বেশি বহন করতে হবে। রাষ্ট্রকে যে বিষয়টি দেখা দরকার সেটি হচ্ছে, গণ-পদোন্নতির বিষয়টি পেশাগত দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখা। পদ নেই তারপরেও গণ-পদোন্নতি। প্রয়োজন নেই অথচ গণহারে পদোন্নতি। এত পদোন্নতির ব্যয়ভার কে বহন করবে? আমাদের এই দরিদ্র দেশ কি তা বহন করতে পারে? পারে না। শুধুমাত্র সাধারণ জনগণকে ঠকানো হচ্ছে। তাদের ন্যায় পাওনা রাষ্ট্র দিতে পারছে না অথচ তাদের সেবা করার জন্য যাদের নিয়োগ দেওয়া হয় তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সুযোগের অভাব নেই। এ কেমন খেলা! যারা এ ধরনের পদোন্নতি পাচ্ছেন তাদের তো সেভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। আগে একজন যুগ্মসচিবকে মানুষ যতটা মূল্যায়ন করত এখন একজন যুগ্মসচিবকে কি সেভাবে মূল্যায়ন করা হয়? দেখা যায় একজন উপসচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব হয়েছেন, তার কাজও বাড়েনি, তার চেয়ারও পরিবর্তন হয়নি। তো এ ধরনের পদোন্নতি দিয়ে কার কতটা লাভ হয়? একইভাবে অধ্যাপকের অভাব নেই। যদিও অন্যান্য ক্যাডারের পদোন্নতির চেয়ে শিক্ষকদের সেভাবে গণহারে দেওয়া হয়নি। তারপরেও একজন অধ্যাপক হতে হলে আন্তর্জাতিক মানের হওয়া প্রয়োজন। এখানে কম্প্রেমাজই করার জায়গা নেই। এটিই শিক্ষা। এখানে মানুষ তৈরির কারিগরদের নিয়ে কথা। একজন অধ্যাপক দেখলে যেন মনে হয়, তিনি আসলেই সবার থেকে আলাদা। তার সবকিছুতে সে বিষয়গুলো প্রকাশিত হবে। সমাজ যেন তাদের ওপর নির্ভর করতে পারে। সমাজ এবং রাষ্ট্র যেন ভাবে তিনি একজন অধ্যাপক, তিনি আসলেই সবার থেকে আলাদা।
লেখক : শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক
