আধুনিক সময়ের টিভি কমেন্ট্রিতে অনিবার্য শর্ত, মোবাইল সাইলেন্ট রেখে হোয়াটসআপ খুলে রাখা। প্রডিউসার টক ব্যাকে তো বলেই। কিন্তু হোয়াটসআপ খোলা রাখতে হয়, যেখানে একটু পর পর প্রডিউসার নানান স্ট্যাটস। আর প্রয়োজনে নির্দেশ পাঠায়। সাবেকি আমলে অচিন্তনীয় ছিল। কিন্তু এখন দস্তুর।
গতকাল আমি আর অশোক দিন্ডা ডিজনি প্লাস হট স্টারে বাংলা কমেন্ট্রি করার সময় নারী প্রডিউসার বললেন একটু হোয়াটসআপ দেখুন। সেখানে একটা স্ট্যাট। ভারতের বিরুদ্ধে আজ পর্যন্ত বিশ্বকাপে আটবার ওপেনিং সেঞ্চুরি পার্টনারশিপ হয়েছে। আর প্রতিবারই ভারত হেরেছে। শেষ হয়েছে ২০০৩ ফাইনালে। স্ট্যাটটা দেখা মাত্র ইমেজারিটা চোখে ভেসে উঠল। জহির খানকে তুলে তুলে মারছেন গিলক্রিস্ট-হেইডেন। জানতামই না যে গত কুড়ি বছর বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে সেঞ্চুরি ওপেনিং স্ট্যান্ড হয়নি। কিন্তু এই মুহূর্তে তার চেয়েও তাৎপর্যপূর্ণ ভারত কি তাহলে আজকের ম্যাচটা হেরে শেষ করছে? বাংলাদেশ তখন বিনা উইকেটে ৯৩। তানজিদ হাসানকে মনে হচ্ছে ছোট তামিম ইকবাল। সেঞ্চুরি পার্টনারশিপ এবং ভারতের অভিশপ্ত স্ট্যাটসের খপ্পরে পড়া সময়ের অপেক্ষা।
ঠিক এই সময় তানজিদ আউট হয়ে গেলেন। কে জানত ম্যাচও কার্যত শেষ হয়ে গেল। ভারতের পুনে দুর্গরক্ষার যুদ্ধ।
খেলার আগে ভাবছিলাম জন বুকাননের থিওরি মেনে আজ বাংলাদেশ না ফাটিয়ে খেলে দেয়। পাঁচ বছর আগে ধর্মশালায় সিরিজ নিষ্পত্তির ম্যাচ খেলছিল বিরাট কোহলির ভারত। বিপক্ষ স্টিভ স্মিথের অস্ট্রেলিয়া। কোহলির ভারত খেলেছিল বলা ভুল হলো। কারণ তিনি সাসপেন্ড হয়ে ঠিক ওই ম্যাচটায় বাইরে। নতুন অধিনায়ক অজিঙ্কে রাহানে। যিনি দৃশ্যত এত নরমশরম যে কঠিন অজি পৌরুষের বিরুদ্ধে কী করে লড়বেন? কীভাবেই বা দলকে মোটিভেট করবেন? বুকাননকে ধরলাম নিউজিল্যান্ড শহরের এক প্রান্তে। তিনি কিন্তু উল্টো বললেন, ‘কোহলি না থাকায় ভালো হবে। ওর চিৎকার-চেঁচামিচি-বিতর্ক থাকবে না। রাহানের শান্ত মেজাজ বরং টিমের পক্ষে ভালো হবে।’
দেখা গেল ঠিক তা-ই হলো। কুলদীপের দুরন্ত বোলিং আর রাহানের মাথা সিরিজ জিতিয়ে দিল ভারতকে। ভাবছিলাম সাকিবের না থাকাও কি বাংলাদেশের জন্য অপ্রত্যাশিত সাহায্য বয়ে আনবে? ভারতের সেই টিমে যিনি কোহলিবিরোধী ছিলেন, ধর্মশালায় জান দিয়ে বল করেছিলেন। রবিচন্দ্রন অশ্বিন। সাকিবেরও নিশ্চয়ই টিমে বিরোধী থাকবে। বাংলাদেশ মিডিয়া আর ফ্যানদের যদি মনে হয় যে তুমি তামিমের চোট নিয়ে বড় বড় ভাষণ দিয়েছিলে। তোমার নিজের তো দেখা যাচ্ছে লুকোনো চোট ছিল। মহানায়ক বলে কি যা ইচ্ছে তা-ই করবে? এমন সেন্টিমেন্টে কি টিমের কেউ কেউ আচ্ছন্ন নেই? লুকোনো তামিম সমর্থক তারা তো আজ বাড়তি প্রেরণা নিয়ে খেলবে।
বিরাট কোহলির শচিনকে একবারে ঘেঁষে আসা সেঞ্চুরির পর উল্টো মনে হচ্ছে। সাকিব থাকলে কি কোহলিকে বিব্রত করতে পারতেন?
আমার নিজের ধারণা, পারতেন না। এবারের বিশ্বকাপে কোহলি আরও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে এসেছেন। গ্রেগ চ্যাপেলের পারফিউমওলা ২০০৭ বাদ দিলে শচিন যে অর্থে রাঙিয়ে দিয়েছেন এক একটা বিশ্বকাপ তিনি, কোহলি ধারাবাহিক ভালো খেলেও তা পারেননি। মনে রাখতে হবে শচিনের ব্যাট ভারতকে দুটো বিশ্বকাপ ফাইনালে তুলেছে। যার একটা তিনি শেষ করেন জিতে। কোহলির ব্যাটিংয়ের যা সবচেয়ে আকর্ষণীয় চুম্বক, যেকোনো পেশাদারের অনুসরণ করা উচিত।
ফিটনেস আর মনের জোর।
স্রেফ ব্যাটিং সম্পদে তিনি আর শচিন দুটো পৃথক শ্রেণির। একজন অনন্ত সম্পদ নিয়ে এসে তার ওপর সীমাহীন পরিশ্রম করেছেন। আর একজন নিজেকে তুলনায় কম ট্যালেন্টশালী জেনে নিজের জন্য আলাদা ফিটনেস নির্ভর রাস্তা খুঁড়ে বের করেছেন। শচিন বংশের সঙ্গে মূল তফাত, কোহলি প্রমাণ করেছেন যে ক্রিকেট শুধু ব্যাট হাতে খেলা হয় না। নেট প্র্যাকটিস যত জরুরি তার মতোই জরুরি ব্যাকরুম ট্রেনিং। যেখানে না থাকে বল, না ব্যাট। অরুণ লাল সেদিন বলছিলেন, ‘ইশ আমার সময়ের আগে যদি কোহলিকে দেখতে পেতাম।’ শচিন যদি ক্রিকেট রূপকথা হন। তাহলে কোহলি পাড়ার ছেলের কোটিপতি হওয়ার অসম্ভব মনোবলবর্ধক কাহিনি। যার কোনো নির্দিষ্ট দেশ, নাগরিকত্ব বা ধর্ম হয় না। পথচারীও সেই ব্যাটিং ফোয়ারা থেকে নিজের গায়ে অনুপ্রেরণার জল ছিটিয়ে নিতে পারে।
এই পর্যায়ের পারফরমারদের জীবন যদি খুঁটিয়ে দেখেন, দেখবেন ভাগ্যের আশ্চর্য সহায়তাও মোড়ে মোড়ে তাদের জন্য অপেক্ষায় থাকে। অমিতাভ বচ্চনের জীবনে দুটো অসম্ভব গুরুত্বপৃর্ণ ছবি ‘জঞ্জির’। আর ‘শোলে’। প্রথমটা পাঁচজন না বলার পর অমিতাভের হাতে আসে। দ্বিতীয়টা দুজন না করেন। ভাবা যায় জয়ের চরিত্র পেয়ে নামি দুই অভিনেতা না বলেছিলেন। ইমরান খানের ভাগ্য ভাবুন বিরানব্বই বিশ্বকাপে। অদৃষ্ট যেন বসেছিল ক্যানসার হাসপাতালের জন্য কাপ দেবে বলে। এবার কোহলিকে দেখুন। চেন্নাইয়ের প্রথম ম্যাচ। মিচ মার্শের মতো ফিল্ডার মাত্র ১৪ রানে তার সহজ ক্যাচ ছাড়লেন। কাল রাতে নেমেই পেলেন দুটো ফ্রি হিট। এরপর রিচার্ড কেটলবোরো যাকে দেখলেই ভারত ভয় পায় যে তাদের চূড়ান্ত অপয়া আম্পায়ার। তিনি কিনা পরিষ্কার ওয়াইড ডাকলেন না।
প্রতিবার ভারত-বাংলাদেশ ম্যাচের আগে ভূপেন হাজারিকার বিখ্যাত গানটা কানের কাছে কেউ অলক্ষ্যে বাজায়।
গঙ্গা আমার মা। পদ্মা আমার মা,
দুই চোখে দুই জলের ধারা।
গঙ্গা যমুনা।
কিন্তু ২০১৫ থেকে বাংলাদেশের এক স্বার্থান্বেষী অংশ যেভাবে এই যুদ্ধকে বিকৃত করে মাঠের বাইরের রং চড়ায় তাতে ক্রিকেট মৈত্রীর স্পিরিট ব্যাহত হওয়া সময়ের অপেক্ষা। এরা ক্রিকেট বুঝলে অবশ্যই জানত যে এই কোহলি, রোহিত, বুমরা- এরা যে পর্যায়ের ক্রিকেটার তার সমকক্ষ কেউ বাংলাদেশ টিমে নেই। ভারতের যারা রিসার্ভ তাদের দিকে তাকান। অশ্বিন, সূর্যকুমার, শামি এবং ঈশান কিশান। এরা প্রত্যেকে বাংলাদেশের এগারোয় সুযোগ পাবেন। দুটো টিমের যেখানে শক্তির এত তফাত তাতে পূর্ণ শক্তির ভারত হারবে একমাত্র ব্যতিক্রমী ম্যাচে। বাংলাদেশে হওয়া দ্বিপক্ষীয় সিরিজ যা-ই বলুক।
তাও হয়তো পুনে শহর থেকে দূরে পাহাড়ের কোলে কেল্লাসদৃশ স্টেডিয়ামে কিছু লড়াই হতো। মাঝের সারির ব্যাটাররা এত ডট বল না খেললে। আমার সহভাষ্যকার লিটনকে অভিযুক্ত করছিলেন দায়িত্বজ্ঞানহীন শটের জন্য। একমত হইনি। উল্টোদিকে এত ডট বল খেললে তাকে তো মারতে হতোই। অবাক হলাম মাহমুদউল্লাহকে এত নিচে খেলতে দেখে। তাকে কেন আরও আগে পাঠাল না টিম? আরও অবাক হলাম শুনে যে তাকে নাকি টিমে চাননি সাকিব। সরি।
কোনটা বেশি আশ্চর্যের এই মহাষষ্ঠী রাতের কলকাতায় বসে গুলিয়ে যাচ্ছে। এই বিস্ময়কর খবরটা। নাকি ১৭ ব্যাটিং গড় আর বোলিংয়ে এত রান দিয়ে-নিয়ে শার্দূল ঠাকুর কী করে এখনো খেলে যাচ্ছেন সেটা?
