আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো আওয়ামী লীগ নেতা নিজ দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে তাকে কল্পনাতীত কঠোর শাস্তি পেতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, ‘গণতন্ত্র ও উন্নয়নের স্বার্থে আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ ষড়যন্ত্র করলে, অবস্থান নিলে চরম মূল্য দিতে হবে তাকে। যে শাস্তি তাকে পেতে হবে তা কল্পনাতীত।’ গতকাল রবিবার সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের সভায় দলের সভাপতি এসব কথা বলেন।’ দলের নেতাদের সতর্ক করে দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে যাকেই মনোনয়ন দেওয়া হবে, তার পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে সব নেতাকর্মীকে কাজ করতে হবে। মনোনয়ন না পেলে দল যাকে মনোনয়ন দিয়েছে তাকে পরাজিত করার ষড়যন্ত্র কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না।’ সভায় উপস্থিত একাধিক সংসদ সদস্য দেশ রূপান্তরকে জানান, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘বিএনপি নির্বাচনে আসতেও পারে, আবার নাও আসতে পারে। কিন্তু ষড়যন্ত্র বন্ধ রাখবে না। একটা পক্ষ চায় আমরাও নির্বাচনে না গিয়ে নির্বাচনী পরিস্থিতি ভ-ুল করে দিতে। নির্বাচন বানচাল করতে পারলে একটি অনির্বাচিত সরকার এনে তাদের ইচ্ছেমতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। এ বিষয়টি সবাইকে মনে রাখতে হবে। তাই এ নির্বাচনে দলের ঐক্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।’
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক একটি মহল বাংলাদেশে অনির্বাচিত সরকার দেখতে চায় উল্লেখ করে পশ্চিমা বিশ্বের প্রতি ইঙ্গিত করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসবে। তারা আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় দেখতে চায় না।’
সংসদীয় দলের প্রধান শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে সংসদ ভবনে সরকারি দলের সভাকক্ষে এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে এ বৈঠক হয়। সেখানে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলকে কীভাবে কাজ করতে হবে, সে বিষয়ে দলের সভাপতি নির্দেশনা দেন বলে বৈঠকে উপস্থিত সংসদ সদস্যরা জানিয়েছেন। বৈঠকে সংসদ সদস্যদের মধ্যে মোতাহার হোসেন, শামীম ওসমান, নূর উদ্দিন চৌধুরী নয়ন, কাজী কেরামত আলী, আবু রেজা মোহাম্মদ নিজামউদ্দিন নদভী, রুবিনা আক্তার মিরা, অ্যারোমা দত্তসহ আটজন বক্তব্য রাখেন। কাজী কেরামত আলী তার জেলার রাজনীতি এবং আরেক আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য জিল্লুল হাকিমের সমালোচনা করে বলেন, জিল্লুল তার ভাইকে মনোনয়ন দিয়ে দিয়েছেন। তার ভাইয়ের মনোনয়ন নিশ্চিত বলে প্রচার করছেন। এর জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যারাই যে আসনে একজন আরেকজনকে মনোনয়ন পেয়ে গেছেন বলে প্রচার করছেন, আমি জানতে চাই আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেওয়ার মালিক কি তিনি বা তারা। মনোনয়ন দেওয়া হবে সার্ভে রিপোর্টের (জরিপ প্রতিবেদন) ভিত্তিতে। যে এগিয়ে থাকবেন তিনিই পাবেন মনোনয়ন। আজকে এখানে যারা আছেন তাদের অনেকেও তো মনোনয়ন বঞ্চিত হবেন। কেউ যদি মনে করেন আমি জিতিয়ে নিয়ে আসব, তাহলে ভুল করবেন। তেমন কোনো নেতা মনোনয়নই পাবেন না।’
কাউকে জয়ী করার দায়িত্ব নিতে পারবেন না মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘ভোট অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে। এ ভোটে সবাইকে জিতে আসতে হবে। কাউকে জিতিয়ে আনার দায়িত্ব আমি নিতে পারব না। আমি কারও চেহারা দেখে মনোনয়ন দেব না। দেখেশুনে জনপ্রিয় ব্যক্তিদের নমিনেশন দেব। তবে মনোনয়ন পান আর না পান, নৌকার বিরোধিতা করা যাবে না।’ যারা নৌকার বিরোধিতা করবে তাদের রাজনীতি চিরতরে শেষ বলেও তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
বৈঠকে উপস্থিত থাকা এক সংসদ সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংসদীয় দলের সভায় প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন প্রত্যেক ভোটারের ঘরে ঘরে যেতে হবে। তাদের বলতে হবে আমরা আমাদের অঙ্গীকার পূরণ করেছি। উন্নয়নের স্বার্থে, গণতন্ত্র অব্যাহত রাখার জন্য নৌকাকে ভোট দিন। আমরা মানুষের কাছে যত যাব তত আমাদের ভোট বাড়বে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসতে পারে, সে কারণে নির্বাচন বাদ দিয়ে অনির্বাচিত সরকারকে চায় দেশি-বিদেশি অনেকেই। কারণ, অনির্বাচিত সরকার হলে তাদের প্রভাব বিস্তার করতে সুবিধা হয়।’
গতকালের বৈঠকে অংশ নেওয়া আরেক সংসদ সদস্য জানান, বিএনপির চলমান আন্দোলন প্রসঙ্গে কথা বলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। বিএনপি নিয়মতান্ত্রিক পথে আন্দোলন করলে কোনো বাধা দেওয়া হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তারা আন্দোলন করতে চায় করবে। কোনো সমস্যা নেই। আমরা বাধা দেব না। তবে অগ্নিসন্ত্রাস, ভাঙচুর করলে ছাড় দেওয়া হবে না। আমরা সব মোকাবিলা করে অভ্যস্ত। হেফাজত মোকাবিলা করেছি, জামায়াত-বিএনপি মোকাবিলা করেছি। এবারও করব।’
জানা গেছে, বৈঠকে কাজী কেরামত আলী রাজবাড়ী জেলা আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করেন। জিল্লুল হাকিম তার ভাইকে জেলার সাধারণ সম্পাদক করার পর থেকে তিনি নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছেন বলে অভিযোগ করেন। কাজী কেরামত আলী বলেন, প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন এলাকায় গিয়ে এমপিদের মিটিং করার জন্য। কিন্তু জেলা আওয়ামী লীগের কথা হচ্ছে তাদের অনুমতি ছাড়া কোনো মিটিং করা যাবে না। এমপি হয়েও কি তিনি এলাকায় যেতে পারবেন না? এমন প্রশ্নও তোলেন।
শামীম ওসমান তার বক্তব্যে অন্তঃকোন্দল ভুলে গিয়ে আগামী নির্বাচনে নৌকাকে বিজয়ী করে শেখ হাসিনাকে আবারও প্রধানমন্ত্রী করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। বৈঠকে লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য নূর উদ্দিন চৌধুরী নয়ন বলেন, ‘আমাদের ত্যাগী নেতাকর্মী রয়েছে, তারপরও অন্যান্য দলের প্রার্থীদের আসন ছেড়ে দেওয়া হয়। আমরা চাই আমাদের চারটি সিটই (লক্ষ্মীপুর জেলার ৪ সংসদীয় আসন) আওয়ামী লীগের যেন হয়। আমরা সবাই একজোট। আশা করি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে জিতে আসতে পারব।’
