৩০ বছর পর দখলমুক্ত হচ্ছে সার্কিট হাউজ প্রাঙ্গণ

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২৩, ০৬:২৮ এএম

অবশেষে দখলমুক্ত হতে যাচ্ছে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউজ প্রাঙ্গণ। গত ৩০ বছর ধরে নগরীর পুরাতন সার্কিট হাউজের সামনের এ জায়গাটি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। গতকাল সোমবার দুপুরে জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) রাকিব হাসান ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নু-এমং মারমা মং অভিযান চালিয়ে শিশুপার্কটি সিলগালা করে দেন। একই সঙ্গে শিশুপার্কটির দখল প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে বুঝিয়ে দেন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সার্কিট হাউজের সামনের এ জায়গাটির মালিক প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় তা বরাদ্দ দিয়েছিল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন তা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের জন্য তৃতীয় একটি গ্রুপকে বরাদ্দ দেয়। এতে বরাদ্দের শর্ত ভঙ্গ হয়েছে বলে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় তা বাতিল করে। সেই আলোকে জেলা প্রশাসন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে জায়গা বুঝিয়ে দিতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পাঠিয়ে সহায়তা করেছে।’

এদিকে অভিযান পরিচালনকারী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নু-এমং মারমা মং বলেন, ‘প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা অভিযান চালিয়ে শিশুপার্কটি সিলগালা করে দিই। একই সঙ্গে পার্কের দখল প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।’

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জায়গাটি ব্যবহারের অনুমোদন পেয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ১৯৯৪ সালে এখানে শিশুপার্কের জন্য বরাদ্দ দেয় ‘ভায়া মিডিয়া বিজনেস সার্ভিস’কে। ওই বছরের ২৮ নভেম্বর তা উদ্বোধন করেন তৎকালীন বিএনপির পর্যটনমন্ত্রী মীর নাছির। ২৫ বছর মেয়াদি সেই বরাদ্দের সময় শেষ হয় ২০১৯ সালে। কিন্তু তখনই চট্টগ্রামে এই পার্কের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে ওঠে। এ জায়গায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত মনুমেন্ট বা স্মৃতিসৌধ নির্মাণের দাবি ওঠে। কিন্তু ওই দাবি উপেক্ষা করে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন আরও তিনগুণ দামে একই কোম্পানিকে আরও ১৫ বছরের জন্য বরাদ্দ দেয়। আর নতুন করে বরাদ্দ পেয়ে পার্কের ব্যাপক সংস্কারের পর চালু করে পার্কটি। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান দায়িত্বে আসার পর এ পার্কটি উচ্ছেদের জন্য প্রধানমন্ত্রী বরাবর আবেদনও করেন। আর এর সঙ্গে চট্টগ্রামের জনপ্রতিনিধিরাও যুক্ত হন।

এ বিষয়ে আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান বলেন, ‘প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রীর অধীনে। তিনি নিজে এই লিজ বাতিলের অনুমোদন দিয়েছেন এবং সেই আলোকে তা সিলগালা করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘এ জায়গায় আমরা মুক্তিযুদ্ধের একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করতে চাই। এ ছাড়া পুরো জায়গাটি ওয়াকওয়ে নির্মাণের মাধ্যমে নগরবাসীর জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে। এখন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আমাদের ব্যবহারের অনুমোদন দিলে আমরা সে হিসেবে পরিকল্পনা গ্রহণ করব।’

এ পার্ক উচ্ছেদ নিয়ে সোচ্চার ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন। তিনি বলেন, ‘পুরাতন সার্কিট হাউজের সামনের এ জায়গাটি উন্মুক্ত স্থান ছিল। কিন্তু বিএনপির মীর নাছিরের সময়ে তা বাণিজ্যিক দখল চলে যায়। এখানে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধ নির্মাণের দাবি ছিল আমাদের। এখন যত দ্রুত তা নির্মাণ করা হয় ততই চট্টগ্রামের জন্য মঙ্গল।’

এদিকে শিশুপার্কটি জেলা প্রশাসন সিলগালা করে দেওয়ায় প্রায় ৬৫ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে উল্লেখ করেন ভায়া মিডিয়া বিজনেস সার্ভিসেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি চট্টগ্রামে বিনিয়োগ করেছি। আমাকে বরাদ্দ দিয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। ২০১৯ সালে দ্বিতীয় দফায় ১৫ বছরের জন্য বরাদ্দ পেয়ে নতুন করে বিনিয়োগ করেছি। এখন হুট করে তো আমার স্থাপনা বন্ধ করে দেওয়া যায় না। প্রয়োজনে আমাকে নতুন জায়গায় যাওয়ার জন্য সময় দিতে হবে। এটা অন্যায়।’

এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পরে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসকের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘জায়গার মালিক হলো প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বরাদ্দ বাতিল করলে আর কিছুই করার থাকে না। আর এ ইস্যুটা নিয়ে অনেক দিন ধরেই আলোচনা চলছিল।’

১৯৯২ সালে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মালিকানাধীন প্রায় তিন একর আয়তনের এ জায়গাটি সিটি করপোরেশনকে বরাদ্দ দিয়েছিল। ১৯৯৪ সালের ২৮ নভেম্বর থেকে প্রতি মাসে ৭৫ হাজার টাকার বিনিময়ে তা ‘ভায়া মিডিয়া বিজনেস সার্ভিসেস’ নামের প্রতিষ্ঠানের কাছে ২৫ বছরের জন্য লিজ দেয় সিটি করপোরেশন। ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বরর মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয় দফায় আরও ১৫ বছর মেয়াদে আগের বরাদ্দ গ্রহীতা ভায়া মিডিয়া বিজনেস সার্ভিসেসের লাইসেন্স নবায়ন করা হয়। প্রতি মাসে সংস্থাটি সিটি করপোরেশনকে দেড় লাখ টাকা করে দেবে। প্রতি পাঁচ বছর পরপর টাকার হার নতুন করে নির্ধারণ করা হবে। কিন্তু চট্টগ্রাম মহানগরীর ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যানে (ড্যাপ) এ জায়গাটি উন্মুক্ত রাখার প্রস্তাব রয়েছে। এর একদিকে পাঁচতারকা হোটেল র‌্যাডিসন, অন্য পাশে জিয়া স্মৃতি জাদুঘর এবং চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজ। সামনে এমএ আজিজ স্টেডিয়াম।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত