কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে গণগ্রেপ্তারকালে পুলিশ হেফাজতে মেহেদি হাসান সাগর ওরফে সাকবর (৪৫) নামে জাতীয়তাবাদী কৃষকদল নেতার মৃতুর অভিযোগ তুলেছেন পরিবার।
গতকাল বুধবার দিবাগত রাত ২টার দিকে উপজেলার প্রাগপুর ইউনিয়নের মহিষকুন্ডি মাঠপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটেছে। নিহত সাকবর কুষ্টিয়া জেলা কৃষকদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দা মৃত সিরাজ মিস্ত্রীর ছেলে। তিনি ঢাকাতে নিজস্ব গার্মেন্টস কারখানার ব্যবসা করতেন।
নিহত মেহেদি হাসান সাকবরের স্ত্রী সুরাইয়া আক্তার কাজল (৩৫) অভিযোগ করে বলেন, বুধবার রাতে আমার স্বামী নিজ ঘরেই ঘুমাচ্ছিল, রাত আনুমানিক ২টার দিকে আমার বাড়ির গেটে জোরে জোরে ধাক্কা দিয়ে ডাকাডাকি করছিল। আমি বেড়িয়ে এসে বুঝতে পারি পুলিশ এসে আমার বাড়ি ঘিরে ফেলেছে। তখন আমি সাকবরকে ডেকে তুলে বলি, পুলিশ এসে বাড়ি ঘিরে ফেলেছে। একথা শুনে সাকবর ঘর থেকে বের হয়ে পিছনের বারান্দার দরজা খুলে পাশের বাড়িতে চলে যায়। এসময় টের পেয়ে ওই বাড়ির লোকজন বাহিরের লাইট বন্ধ করে দেয়। এতে বাতি নিভে হঠাৎ অন্ধকার হয়ে যাওয়ায় পুলিশ ওই বাড়ির মধ্যে ঢুকে যায় এবং সেখানে আমার স্বামী সাকবরকে ধরে ফেলে। এসময় আমি আমার বাড়ির গেটে দাঁড়ানো প্রায় ১৫/২০ জন পুলিশদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করি। পরে পাশের বাড়িতে গিয়ে দেখতে পাই, আমার স্বামী সাকবর মাটিতে পড়ে আছে। কয়েজন পুলিশ তাকে ঘিরে রেখেছে। আমি স্বামীর কাছে গিয়ে তার নিথর দেহ দেখে চিৎকার করে কান্নাকাটি করতে থাকি।
কিছুক্ষণ পর দৌলতপুর থানা পুলিশের এসআই মাসুম বিল্লাহ এবং শামসুল আলম আমার কাছ থেকে একটি সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে সাকবরকে রেখেই চলে যায়। পরে রাত ৩টার দিকে অটোতে করে আমি ও আমার মেয়েসহ পরিবারের লোকজন অচেতন সাকবরকে তুলে প্রথমে ডাঙ্গের বাজারে যাই সেখান থেকে একটি মাইক্রো ভাড়া করে দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাই। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক সাকবরকে মৃত ঘোষণা করেন। এসময় পরিবারে অভিভাবকতুল্য স্বজনরা বিষয়টি নিয়ে আপত্তি না করার কথা বলে হাসপাতাল থেকে লাশ নিয়ে বাড়িতে চলে আসি।
নিহত সাকবরের কলেজ পড়ুয়া মেয়ে সুবর্ণ জয়ন্তীর অভিযোগ করে বলেন, আমার আব্বু ভালো মানুষ সুস্থ মানুষ রাতে খেয়ে ঘরে ঘুমিয়ে ছিল। পুলিশের ভয়ে সুস্থ স্বাভাবিক অবস্থায় ঘর থেকে বেড়িয়েছে, হঠাৎ কি এমন ঘটনা ঘটলো যে সেখানে তার মৃত্যু হলো বিনা কারণে? পুলিশের নির্যাতনেই আব্বু মারা গেছে।
দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. তৌহিদুল হাসান তুহিন জানান, গতরাতে সোয়া ৩টার দিকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে মেহিদী হাসান সাগর নামে যে রোগীকে নিয়ে এসেছিল পরিবারের লোকজন, তিনি হাসপাতালে পৌঁছানোর প্রায় সোয়া ঘন্টা পূর্বেই মৃত্যু হয়েছিল।
এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন সরকারের অভিযোগ, ‘সাকবর সুস্থ না কি অসুস্থ এসব বলে পুলিশ এই মৃত্যুর দায় এড়াতে পারে না। কোনো প্রকার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছাড়াই পুলিশ সাকবরের বাড়িতে অভিযান চালিয়েছে। এসময় পুলিশের বেষ্টনীর মধ্যেই সাকবরের মৃত্যু হয়েছে। পুলিশ দোষী নির্দোষ বা মামলা বিহীন লোকদেরও গণগ্রেপ্তার করছে বলে অভিযোগ এই বিএনপি নেতার।
এ বিষয়ে ঘটনার সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন দৌলতপুর থানার উপ পুলিশ পরিদর্শক মাসুম বিল্লাহর মুঠোফোনে কল দিলেও তিনি তা রিসিভ করেন নি।
তবে এ বিষয়ে দৌলতপুল থানার অফিসার ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক রফিকুল ইসলাম বলেন, পুলিশ হেফাজতে কোনোলোক মারা যায়নি, পুলিশ কি কাউরে ধরেছে? পরিবার বললে তো আর হলো না? এলাকায় যান, এলাকায় গিয়ে খোঁজ খবর নেন, সে স্ট্রোক করে মারা গেছে, পুলিশ তারে ধরতেও যায়নি ধরেওনি, ওই এলাকায় আমাদের কিছু ওয়ারেন্ট ছিল তাদের খোজ খবর বা ঠিকানা জানতে আশাপাশের কিছু লোকজনকে জিজ্ঞাসা করে না? এরকমই ঘটনা ছিল, সে হয়ত মনে করেছে আমাকে ধরতে এসেছে, তাকে তো আমরা ধরতে যাইনি। তারতো আগের থেকেই কার্ডিয়াক সমস্যা ছিল, সে কারণে পুলিশ আসার খবর পেয়ে ঘরের মধ্যেই স্ট্রোক করে মারা গেছে।
