অর্ডারেই দুরবস্থা বাংলাদেশ দলটা বিশ্বকাপে যতটা খারাপ খেলছে, এই দলটা এত খারাপ নয়। তাদের সামর্থ্য আছে এর চেয়ে অনেক ভালো ক্রিকেট খেলার। কিন্তু ব্যাটিং অর্ডারে হ-য-ব-র-ল অবস্থার কারণে তাদের কাছ থেকে কাক্সিক্ষত পারফরম্যান্স পাওয়া যাচ্ছে না। সঠিক ক্রিকেটারকে সঠিক জায়গায় নামানো হচ্ছে না। তাই ব্যাটিংটা ভালো হচ্ছে না। এই বিশ্বকাপে আমরা ম্যাচগুলোতে খারাপ করছি মূলত ব্যাটিংয়ের কারণেই। এর পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ আছে বলেই আমার মনে হয়।
নাজমুল হোসেন শান্তকে আমি সিলেট স্ট্রাইকার্সে খুব কাছ থেকে দেখেছি। বলা যায় সিলেট স্ট্রাইকার্সে তার দারুণ ফর্মটাই সে এরপর জাতীয় দলে নিয়ে গিয়েছিল। তার সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে আমার মনে হয়, প্রতিপক্ষ ওর দুর্বলতার জায়গাটা ধরে ফেলেছে। শান্ত ব্যাটিংয়ে নামার সময়েই কিন্তু নেদারল্যান্ডস ফিল্ডিং প্লেসমেন্ট বদল করল। ওকে যে বলটায় আউট করেছে, তার আগে বোলার পকেট থেকে কাগজ বের করে কী যেন দেখছিল, হয়তো ওদের কোচের কোনো নির্দেশনা ছিল। এরপর অফস্টাম্পের বাইরের বলে খোঁচা মেরে শান্ত আউট হয়ে গেল। এই সময়ে আমার মনে হয় তার সঙ্গে স্কিল নিয়ে আলাপ করে খুব একটা লাভ হবে না, তাকে অনুপ্রাণিত করে খেলাতে পারলে সে এই দুরবস্থা কাটিয়ে উঠতে পারবে।
তানজিদ তামিম খুবই প্রতিশ্রুতিশীল, সে অনেকটা আচমকাই বিশ্বকাপের দলে চলে আসছে। কিছুদিন আগেও সে বোধহয় ভাবেনি যে সে বিশ্বকাপে শুরু থেকে সবকয়টা ম্যাচে খেলবে। আমি ২০০৭ এর বিশ্বকাপে যখন খেলি তখন মুশফিকুর রহিম, সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবালদের বয়সটা এরকমই ছিল। তারা ঐ বিশ্বকাপে পারফর্ম করেছিল। তানজিদ অনেক প্রতিভাবান, তার সঙ্গে কাজ করলে সে আগামীতে বাংলাদেশকে অনেকদিন সার্ভিস দেবে বলেই আমি বিশ্বাস করি। লিটন দাস অনেক বছর ধরেই খেলছে কিন্তু সে কখনোই ধারাবাহিক নয়। আমি অন্তত প্রায় দুই বছর ধরে তার কাছ থেকে বড় রান বা ধারাবাহিক ব্যাটিং দেখছি না। সাকিব, তামিম বা মাহমুদউল্লাহ যেমন টানা ভালো খেলে, লিটনের মধ্যে সেই ব্যাপারটা অনুপস্থিত। সে হচ্ছে ‘মুডি ক্রিকেটার’, মাঠের ভাষায় এদের এটাই বলে। তাদের মুডের ওপর নির্ভর করে কেমন খেলবে। মুডি ক্রিকেটারের সঙ্গে কোচের ভালো সম্পর্ক থাকাটা খুব জরুরি। কারণ তাদের মুড খুব দ্রুত পরিবর্তন হয়। আমাদের সময়ে অলক কাপালি ছিল মুডি ক্রিকেটার। সে মুডের ওপর ক্রিকেট খেলত। লিটনও যদি এরকমই হয় তাহলে সেটা দলের জন্য শেষ পর্যন্ত ভালো হবে না কারণ সে অনেক দিন ধরে খেলছে আর তার দায়িত্ব নেওয়ার সময় হয়েছে। মিরাজ ঠিক তার উল্টো। মিরাজের কাছ থেকে আমরা যতটা প্রত্যাশা করি, সে তার চেয়ে বেশি দিয়েছে দলকে।
ব্যাটিংয়ে ধসের কারণ জায়গার খেলোয়াড়কে জায়গায় খেলানো হয়নি। মাহমুদউল্লাহ রিয়াদকে কেন এর আগে দুই তিনটা ম্যাচে আটে নয়ে নামানো হলো! এটা করে কোনো লাভ হলো? সে যখন নামছে তখন ২০ বলে ৫০ রানের কোনো ইনিংসের তো দরকার হচ্ছে না! এই বিশ্বকাপে মাহমুদউল্লাহ ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলছে। কিন্তু ও যখন ব্যাটিংয়ে নামছে ততক্ষণে দল বিপর্যয়ে।
মিরাজের ব্যাটিং অর্ডার নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা মাত্রা ছাড়িয়েছে। ক্রিকেটাররা জানে না কে কোথায় ব্যাট করবে। দলের এক দুই তিন কারা, সেটা আমার ধারণা ম্যাচের দিনও ক্রিকেটাররা জানে না। অথচ এই ব্যাটিং অর্ডারগুলো বিশ্বকাপের আগেই ঠিক করে ফেলা দরকার ছিল। এসব করতে গিয়ে তাওহীদ হৃদয়কে আমরা কাজে লাগাতে পারলাম না, একাদশ থেকে বাদই দিতে হলো। অথচ আমার কাছে মনে হয় হৃদয় বাংলাদেশের জন্য আগামীতে সাদা বলে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটার হবে। তাকে কোন জায়গায় কাজে লাগালে দলের সুবিধা হবে সেটা জাতীয় দল বের করতে পারেনি। অথচ আমরা সিলেট স্ট্রাইকার্সে ওকে বলে দিয়েছিলাম যে ও ওপরেই ব্যাট করবে যাই হোক না কেন। ওপেনিং না হয় ওয়ান ডাউন।
এভাবেই লাগামহীন পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর ব্যাটসম্যানদের জায়গার অদল-বদল করে আমরা নিজেরাই নিজেদের সর্বনাশ ডেকে এনেছি। এই দলটা এত খারাপ নয় যে নেদারল্যান্ডসের কাছে হেরে যাবে। আশা করছি বাংলাদেশ এই জায়গা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে সামনের দিনগুলোতে ভালো ক্রিকেট খেলবে।