ইসরায়েলের সঙ্গে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র সংগঠন হামাসের লড়াই প্রায় এক মাসে পা রাখতে চলেছে। প্রথম দফায় হামাসের অতর্কিত আক্রমণে ১ হাজার ৪০০ জনের মতো ইসরায়েলি নিহত হওয়ার পর নির্বিচারে চালানো আগ্রাসনে নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৯ হাজার ছাড়িয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোর ‘ইসরায়েলপন্থি’ এবং ‘হামাসবিরোধী’ অবস্থান সংবাদ তৈরির ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হচ্ছে।
সমালোচকরা বলছেন, পশ্চিমা বিশ্বের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের মতো তাদের গণমাধ্যমগুলোও ইসরায়েলের অন্যায় কাজে অবিরাম সমর্থন দিচ্ছে। ন্যূনতম জবাবদিহিতার জায়গা দেখা যাচ্ছে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, সাংবাদিকতার ভাষা নির্মাণ নিয়ে। হামাস যখন প্রথম দফায় ইসরায়েলে হামলা চালায় তখন ব্রিটিশ গণমাদ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’ সম্পাদকীয় শিরোনাম করেছিল এভাবে ‘হামাসের ভয়ানক হত্যালীলা’। আরেক ব্রিটিশ গণমাধ্যম ‘দ্য ইকোনমিস্ট’ তার সম্পাদকীয় শিরোনামে লেখেÑ ‘হামাসের রক্তপিপাসু হামলা’। পক্ষান্তরে ইসরায়েল এখন পর্যন্ত যত বর্বরোচিত হামলা করেছে, তার কোনো ক্ষেত্রেই এমন ভাষা দেখা যায় না। অথচ ইসরায়েল গাজার হাসপাতাল, আশ্রয়কেন্দ্র, জাতিসংঘের স্থাপনা ও স্কুলেও হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। খোদ জাতিসংঘ বলছে, ইসরায়েল যা করছে তা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং যুদ্ধাপরাধ।
চলতি সপ্তাহে গাজার হামাস নিয়ন্ত্রিত সরকার অভিযোগ করে, পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো যেভাবে সংবাদ পরিবেশন করছে, তা পেশাদারি ও সাংবাদিকতার নীতির বাইরে।
গাজার গণমাধ্যম দপ্তরের মুখপাত্র সালামা মারুফ বলেন, ‘আমরা পশ্চিমা গণমাধ্যমের অন্ধ পক্ষপাতপূর্ণ অবস্থানের নিন্দা করছি। যুদ্ধের শুরু থেকে আমরা এমন অনেক উদাহরণ দেখাতে পারব যেখানে বিবিসি, সিএনএন, এবিসি, ফক্স নিউজ, স্কাই নিউজ ও সিবিএসের মতো সংবাদমাধ্যমগুলো ইসরায়েলের প্রতি নমনীয় অবস্থান নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করেছে।’
এ বিষয়ে বোস্টন গ্লোবে (যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক) তিন বছর কাজ করা পুলিৎজার বিজয়ী সাংবাদিক আবদুল্লাহ ফায়াদ বলেন, সিংহভাগ সম্পাদক মধ্যপ্রাচ্য পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বিশেষজ্ঞ নন। সেই কারণে তারা মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে যে ইসরায়েলপন্থি বক্তব্য দেওয়া হয়, তাই অনুসরণ করে। অন্যান্য বিষয়ের মতো অনুসন্ধানী চোখ তারা এ ক্ষেত্রে প্রেয়োগ করে না।
পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো তাদের রাজনীতিকদের মতো করে ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকারের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে যাচ্ছে এবং পক্ষান্তরে হামাসের যাবতীয় কাজকে ‘সন্ত্রাসবাদ’ আখ্যা দিয়ে যাচ্ছে। হামাস বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু বানালে তাকে ‘সন্ত্রাসবাদী’ বলা হচ্ছে। কিন্তু ইসরায়েলের একই কাজকে তারা সন্ত্রাসবাদী আখ্যা দিতে অনীহা প্রকাশ করেই যাচ্ছে এবং তাতে সমর্থনও দিচ্ছে।
মোটা দাগে পশ্চিমা গণমাধ্যমের ভাষা নির্মাণ ও সাংবাদিকতার ধরন নিয়ে বিতর্ক তৈরি করে যাচ্ছে তা নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে কিছু কিছু সংবাদমাধ্যম ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভূতিশীল সংবাদকর্মীদের চাকরিচ্যুত করছে।
কানাডার গ্লোবাল নিউজে কর্মরত ছিলেন জাহরা আল-আখরাস। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফিলিস্তিনের সমর্থনে পোস্ট করায় তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। জার্মান গণমাধ্যম কোম্পানির সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠান ওয়েল্ট টিভি থেকে কাসেম রাদকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইসরায়েলপন্থি অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলায় তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
মার্কিন গণমাধ্যম অ্যাসোসিয়েট প্রেসের (এপি) গাজা প্রতিবেদক ইসাম আদওয়ান ইসরায়েলের সমালোচনা করায় তাকে বরখাস্ত করা হয়। আরব বংশোদ্ভূত ছয় সাংবাদিক ইসরায়েলের সমালোচনা করায় বিবিসির প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নাগরিক সংস্থা ‘প্যালেস্টাইন লিগ্যাল’ ফিলিস্তিনবিরোধী মনোভাব পর্যবেক্ষণ করে থাকে। তারা সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে নজর রাখছে। সংস্থাটির ভাষ্য, যেসব মানুষ ফিলিস্তিনের প্রতি সহানুভূতি দেখাচ্ছে, তারা ভয়ের মধ্যে রয়েছে। ফিলিস্তিনের পক্ষে আওয়াজ তোলা কিংবা কথা বলার অভিযোগে হেনস্তা ও বাধা দেওয়ার মতো ২৬০টি সাম্প্রতিক ঘটনা তারা নথিভুক্ত করেছে। আরব এবং মধ্যপ্রাচ্য জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন বলছে, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার সাংবাদিকদের কাজ ও মন্তব্য করার ক্ষেত্রে একপাশে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা নিয়ে তারা প্রতিনিয়ত সমস্যার মুখে পড়ছেন।
