বাংলাদেশে এ বছর ডেঙ্গুতে রোগী ও মৃত্যুর আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। প্রাদুর্ভাব এতটাই উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এর আগে যেখানে ঢাকার বাইরে সর্বোচ্চ ৪৯ শতাংশ রোগী ছিল ২০১৯ সালে, এবার তা ৬৪ শতাংশে পৌঁছে গেছে। মোট রোগী এসে দাঁড়িয়েছে প্রায় পৌনে তিন লাখে। এর আগে সর্বোচ্চ রোগী ছিল ২০১৯ সালে ১ লাখের কিছু বেশি।
এবার সবচেয়ে বেশি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে মৃত্যু। ইতিমধ্যেই মারা গেছে ১ হাজার ৩৭০ জন, যা সর্বোচ্চ মৃত্যুর বছর ২০২২ সালের তুলনায় পাঁচ গুণ বেশি। সে বছর মারা যায় ২৮১ জন।
এমনকি মৃত্যুর সংখ্যা ও মৃত্যুহারে বাংলাদেশ পৌঁছে গেছে বিশ্বের শীর্ষে। বিশ্বের যে ১০টি দেশে ডেঙ্গুর সর্বোচ্চ প্রাদুর্ভাব, সেই তালিকায় ব্রাজিলের তুলনায় বাংলাদেশে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ১০ গুণ কম। অথচ মৃত্যুর তালিকায় ব্রাজিলের অবস্থান ৮ নম্বরে, আর বাংলাদেশে ১ নম্বরে।
বাংলাদেশে এ বছর বেশি মৃত্যুর পেছনে ছয়টি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মৃত্যু পর্যবেক্ষণ কমিটি, সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পর্যবেক্ষণ এবং জনস্বাস্থ্যবিদদের বিশ্লেষণ। কারণগুলো হলো ডেঙ্গুর ধরন, রোগীদের সচেতনতার অভাব, হাসপাতালে চিকিৎসায় দেরি, বাছাই ছাড়াই রোগী ভর্তি, অগোছালো স্বাস্থ্যসেবা ও মশা নির্মূলে ব্যর্থতা।
বাংলাদেশে ২ নভেম্বর পর্যন্ত ও বিশ্বের অন্য দেশগুলোতে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুর তথ্যবিশ্লেষণ করে এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ডেঙ্গুতে মৃত্যু ও রোগীর এই চিত্র পাওয়া গেছে।
মৃত্যুতে বাংলাদেশ শীর্ষে : বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১০টি দেশে এ বছর ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী (অক্টোবর পর্যন্ত) ব্রাজিলে ২৫ লাখ ৬৯ হাজার ৭৪৬ ও তৃতীয় অবস্থানে বাংলাদেশ ২ লাখ ৭৪ হাজার ৮০৬ জন। দ্বিতীয় অবস্থানে পেরু, রোগী ২ লাখ ৫৭ হাজার ৮৯ জন। এরপর বলিভিয়ায় ১ লাখ ৪০ হাজার ২৪৬, ভারতে ৯৪ হাজার ১৯৮, কলম্বিয়ায় ৮৮ হাজার ৯৩১, আর্জেন্টিনায় ২৩ হাজার ৯৩, মেক্সিকোতে ১৫ লাখ ১০৪, বলিভিয়ায় ১৪ হাজার ২৪ ও নিকারাগুয়ায় ৩ হাজার ২ জন।
কিন্তু মৃত্যুর সংখ্যায় শীর্ষে বাংলাদেশ ও দ্বিতীয় অবস্থানে ব্রাজিল। বাংলাদেশে মারা গেছে ১ হাজার ৪২৫ ও ব্রাজিলে ৯১২ জন। এরপর পেরুতে ৪২৪, ফিলিপাইনে ২৯৯, ভারতে ৯১, বলিভিয়ায় ৮৩, কলম্বিয়ায় ৭১, আর্জেন্টিনায় ৬৫, মেক্সিকোতে ৪৮ ও নিকারাগুয়ায় ১ জন মারা গেছে।
মৃত্যুহারেও বাংলাদেশ শীর্ষে। এখানে মৃত্যুহার শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ ও ব্রাজিল অষ্টম অবস্থানে, শূন্য দশমিক ০৩৫ শতাংশ। এরপর ফিলিপাইনে মৃত্যুহার শূন্য দশমিক ৩৭২, পেরুতে শূন্য দশমিক ১৬৫, ভারতে শূন্য দশমিক ০৯৭, কলম্বিয়ায় শূন্য দশমিক ০৮০, বলিভিয়ায় শূন্য দশমিক ০৫৯, আর্জেন্টিনায় শূন্য দশমিক ০৫৩, মেক্সিকোতে শূন্য দশমিক ০৩২ ও নিকারাগুয়ায় শূন্য দশমিক ০০১ শতাংশ।
সে হিসেবে ব্রাজিলের তুলনায় বাংলাদেশে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ১০ গুণ কম হলেও বাংলাদেশে মৃতের সংখ্যা দেড় গুণ বেশি। বাংলাদেশের প্রায় সমানসংখ্যক ডেঙ্গু রোগী পেরুতে হলেও পেরুর চেয়ে বাংলাদেশে মৃত্যুহার শূন্য দশমিক ৩৪১ শতাংশ বেশি ও পেরুর অবস্থান তৃতীয়। পেরুতে মৃত্যু হার শূন্য দশমিক ১৬৫ ও বাংলাদেশে শূন্য দশমিক ৫০৬ শতাংশ। মৃত্যুহারে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ফিলিপাইন, শূন্য দশমিক ৩৭২ শতাংশ।
এরপর ভারতে মৃত্যুহার শূন্য দশমিক ০৯৭, কলম্বিয়ায় শূন্য দশমিক ০৮০, বলিভিয়ায় শূন্য দশমিক ০৫৯, আর্জেন্টিনায় শূন্য দশমিক ০৫৩, মেক্সিকোতে শূন্য দশমিক ০৩২ ও নিকারাগুয়ায় শূন্য দশমিক ০০১ শতাংশ।
চার বছর ধরে মৃত্যুহার কাছাকাছি : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যবিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১৪ সাল মৃত্যুশূন্য ছিল। এর পরের বছর থেকেই ক্রমান্বয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকে। তবে উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে ২০১৯ সালে। সে বছরই প্রথম সর্বোচ্চ ১৬৪ জনের মৃত্যু হয়। এর পরের বছর ২০২০ সালে ৭ জন মারা যায়। এরপর গত তিন বছর মৃত্যুর ঊর্ধ্বগতি অস্বাভাবিক হারে অব্যাহত রয়েছে। ২০২১ সালে মারা যায় ১০৫, ২০২২ সালে ২৮১ ও এ বছর গত ৭ নভেম্বর পর্যন্ত ১৪২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
অবশ্য চার বছর ধরে রোগীর অনুপাতে মৃত্যুহার প্রায় সমান। ২০২০ সালে রোগী ছিল ১ হাজার ৪০৫, ২০২১ সালে ২৮ হাজার ৪২৯, ২০২২ সালে ৬২ হাজার ৩৮২ ও এ বছর এখন পর্যন্ত (২ নভেম্বর) ২ লাখ ৭৪ হাজার ৮০৬ জন। কিন্তু মৃত্যুহার ছিল ২০২০ সালে ও এ বছর শূন্য দশমিক ৫ এবং ২০২১ সাল ও ২০২২ সাল শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ।
নারী, বয়স্ক ও ঝুঁকিপূর্ণদের মৃত্যু বেশি : দেশে এ বছর এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মারা গেছেন ষাটোর্ধ্ব (৬১-৮০ ঊর্ধ্ব বছর) বয়সী মানুষ, ১৮ শতাংশ। অথচ এই শ্রেণির মানুষ আক্রান্ত হয়েছে মোট আক্রান্তের ৬ শতাংশ। আক্রান্ত অনুপাতে মৃত্যুহারও বেশি, ১ দশমিক ৭ শতাংশ। অথচ দেশে মোট মৃত্যুহার শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ।
একইভাবে ডেঙ্গুতে এ বছর আক্রান্ত অনুপাতে নারীদের মৃত্যু বেশি, যা মোট মৃত্যুর ৫৬ দশমিক ৫ শতাংশ। অথচ এ বছর নারীরা আক্রান্ত হয়েছে ৪০ শতাংশ। বয়স্ক ও নারীদের মৃত্যুর কারণ দেরিতে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা।
এ ছাড়া ৩১-৪০ বছর বয়সীরা মারা গেছে ১৮ ও আক্রান্ত হয়েছে ১৯ শতাংশ, ১৬ শতাংশ করে মারা গেছে ২১-৩০ বছর ও ৪১-৫০ বছর বয়সীরা ও আক্রান্ত হয়েছে যথাক্রমে ২৭ ও ১১ শতাংশ, ৫১-৬০ বছর বয়সীরা মারা গেছে ১৫ ও আক্রান্ত হয়েছে ৮ শতাংশ, ৮ শতাংশ করে মারা গেছে ০-৫ বছর ও ৬-১০ বছর বয়সী শিশু ও আক্রান্ত হয়েছে যথাক্রমে ১০ ও ১৯ শতাংশ।
মৃত্যুর প্রধান ৬ কারণ : এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের (এনসিডিসি) পরিচালক ও অধিদপ্তরের মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, এবার ডেঙ্গুতে বেশি মৃত্যুর প্রধান কারণ ডেঙ্গুর ধরন। কোনো একটা দেশে ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট কোনো ধরন বা সেরোটাইপ দিয়ে পরপর সংক্রমণ হলে, তখন রোগী ও মৃত্যু কম হয়, রোগটি নিয়ন্ত্রণে থাকে। কারণ মানুষের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে। বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ডেন-৩ কয়েক বছর ধরে চলছিল। কিন্তু গত বছর কিছু ও এবার অনেক বেশি ডেন-২ চলে এসেছে। হঠাৎ করে নতুন ধরন চলে আসায় প্রাদুর্ভাব ও মৃত্যু বেশি হচ্ছে।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘বেশি মৃত্যুর আরেকটা কারণ হলো, আমাদের দেশে ডেঙ্গু অনেক বছর থাকলেও সামগ্রিকভাবে মানুষের মধ্যে সচেতনতা সেভাবে নেই। মানুষ ওয়ার্নিং বা ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নগুলো বুঝতে পারে না। কোন সময় হাসপাতালে যেতে হবে, সেটা বোঝে না। ফলে হাসপাতালে আসতে দেরি করে। বাসায় বসে চিকিৎসা নেওয়ার চেষ্টা করে। যখন তারা একেবারে শেষ মুহূর্তে হাসপাতালে আসে, তখন আর পথ থাকে না, চিকিৎসকরা কিছু করতে পারেন না। ডেঙ্গু রোগীর দৈনিক সিবিসি (কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট) করতে হয়, ফলোআপে থাকতে হয়, জটিল না এমন রোগীর ক্ষেত্রেও এসব করতে হয়। কিন্তু এবার রোগীরা সেটা করছে না। দেরি করে হাসপাতালে যায়। এজন্য মৃত্যুটা বেশি হচ্ছে।’
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, হাসপাতালের ভেতরও সংকটাপন্ন রোগীদের আলাদাভাবে নিয়ে দ্রুত আইসিইউ দেবে, সেটাও দেরি হচ্ছে। এমনকি হাসপাতালগুলোতে কোন ধরনের রোগী ভর্তি করাতে হবে, সে ব্যাপারেও কোনো দেখভাল নেই। এনএস-১ অ্যান্টিজেন টেস্টে ডেঙ্গু পজিটিভ হলেই রোগী ভর্তি করানো হচ্ছে। অথচ এ ধরনের সব রোগীর ভর্তির দরকার নেই। তারা বাড়িতে থেকেও চিকিৎসা চালাতে পারে। এর ফলে হাসপাতালে রোগী বেড়ে যাচ্ছে। সেখান থেকে জটিল রোগী আলাদা করতে হচ্ছে। রোগীরা মারা যাচ্ছে।
অগোছালো স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় বাড়ছে মৃত্যু : এ বছর ডেঙ্গুতে বেশি মৃত্যুর অন্যতম কারণ সরকারের অগোছালো স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বলে মনে করেন সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, বেশি মৃত্যুর প্রধান কারণ মেডিকেল কেয়ার গোছানো বা সংগঠিতভাবে করা হয়নি। যদি রোগীদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সেবা দেওয়া যেত, তারা টেস্ট করতে পারত, তাহলে অনেক স্থানে রোগী চিহ্নিত হতো ও রোগীরা কাজ ও হাঁটাহাঁটি করত না, বিশ্রামে থাকত। তাদের অবস্থা গুরুতর হতো না। মৃত্যুও কম হতো।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, মৃত্যু অবশ্যই কমানো যায়। আমাদের চেয়ে অনেক বেশি রোগী নিয়ে বহু দেশ আছে, কিন্তু মৃত্যু আমাদের সর্বোচ্চ। মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি। পাশের দেশ ভারতে বাংলাদেশের মতোই জলবায়ু, অনেক রোগী। কিন্তু মৃত্যুর সংখ্যা অনেক কম। ব্রাজিলে আমাদের চেয়ে জনসংখ্যা অনেক বেশি, অনেক রোগী। কিন্তু মৃত্যুর সংখ্যা হাজারো পার হয়নি। যত দিন না আমরা ধাপে ধাপে সুসংগঠিত চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে না পারব, শুধু ডেঙ্গু কেন, যেকোনো রোগের ক্ষেত্রে পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সি এবং রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাবে, মৃত্যু কমানো যাবে না।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জনস্বাস্থ্য উপদেষ্টা কমিটির সদস্য ও জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, ডেঙ্গুতে এবার বেশি মৃত্যু হচ্ছে, কারণ আমরা মশাকে নিধন করতে পারলাম না। মশা নির্মূল করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। মশা মারাটা যদি খুবই সক্রিয়ভাবে করতাম, তাহলে আজ অবস্থা খারাপ হতো না। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাও ঠিকমতো হচ্ছে না। অসুস্থরা হাসপাতালে গেলে ঠিকমতো চিকিৎসা পাচ্ছে না। চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার মধ্যেও ঘাটতি আছে।
