’৭৫-এ বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারবর্গ এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে হত্যার মধ্য দিয়ে যে বা যারা ক্ষমতায় আসীন হলেন, তারা কারা? হাঁ-না ভোটের ছলচাতুরীতে জিয়াউর রহমান পাকাপোক্তভাবে ক্ষমতায় আরোহণ করলেন রাজাকার শাহ আজিজকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়ে। সঙ্গে জুটল আরও সব দেশবিরোধী রাজাকার। পাকিস্তান থেকে নিয়ে আসা হলো রাজাকার শিরোমণি গোলাম আযমকে। আর উচ্ছিষ্টভোগীরা তো সবসময় আশপাশেই থাকে। পাকিস্তানি ভাবধারায় ফিরে গেল দেশ। পাকিস্তানে যেমন স্বাধীনতার পর থেকে অদ্যাবধি মিলিটারি শাসন চলছে। তেমনি আমরাও মিলিটারি শাসনেই ফিরে গেলাম। জে. জিয়ার পথ ধরে এলো লে. জে এরশাদ। তারপর ’৯০-এর গণ-আন্দোলন। স্বাধীনতার পর গণ-আন্দোলন কেমন হয়, কেন হয় আমরা দেখলাম, জানলাম। এও জানলাম, মিলিটারি শাসকের তৈরি কথিত রাজনৈতিক দল ‘বিএনপি’ কতটা কদর্য ও অমানবিক হতে পারে। ১৫ ফেব্রুয়ারির তামাশার নির্বাচনে খালেদা জিয়া, বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের পবিত্র সংসদে বিরোধী দলের আসন পেতে দিল। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর পুরো জাতি যেমন এতিম হয়ে গেল, তেমনি মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগও ছন্নছাড়া হয়ে গেল। মোশতাকের বিনাশী শয়তানি ছায়ায় পুড়ল, দগ্ধ হলো, কণ্টকিত হলো দেশ। ছিটকে পড়ল ২১ বছর পেছনে। প্রকারান্তরে ২৯ বছর। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা খালেদার ১৫ ফেব্রুয়ারির তামাশার নির্বাচন এবং নির্যাতনের বিরুদ্ধে গড়ে তুললেন দুর্বার আন্দোলন। এ আন্দোলনে দেশের মানুষও স্বতঃস্ফূর্ত যোগ দিলেন। খালেদার মসনদ ভেঙে পড়ল। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা হলো। ‘ইনডেমনিটি’র মাধ্যমে যা জিয়া, খালেদা চিরতরে বন্ধ করে দিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের বিচার করা হলো। খুনিদের কজন পালিয়ে রইল বিদেশে। তারপর থেকে দেশ সুযোগ্য নেতৃত্বে সামনে এগোতে থাকল। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দেশের সার্বিক উন্নয়ন সবই ঘটতে থাকল। মাঝে ভয়াবহ ‘করোনা’র থাবায় সারা বিশ্ব থমকে গেলেও বাংলাদেশ থামল না। এর মধ্যে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ বিশ্বের অর্থনীতিকে কাবু করে দিল। সারা পৃথিবীতে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেল। স্বাভাবিক নিয়মে বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়ল। এরপর আবার ফিলিস্তিন-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হলো। সময়টা আরও কঠিন হয়ে উঠল।
কেন, কী কারণে বিএনপির আন্দোলন? আন্দোলনের জন্য জন-সম্পৃক্ততা থাকতে হয়। বিএনপি, জামায়াত আর কথিত সমমনাদের কি আছে তা? আমরা কি তা দেখতে পাই? যাদের আমরা দেখি এরা কারা? মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী, রাজাকার, আল-বদরের জ্ঞাতি-গোষ্ঠী, যাদের বংশবৃদ্ধি ঘটেছে কেবল, তারা-ই নয় কি? আর এদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে একটি চক্র। ঘোঁট পাকানোই যাদের কাজ। দেশে-বিদেশে এরা ঘোঁট পাকাচ্ছে। শুধু ব্যক্তিস্বার্থে নিজ দেশের বিরুদ্ধে এরা সক্রিয় দেশে এবং বিদেশে। বিভেদ-বিভাজনই এদের একমাত্র চাওয়া। এতে ব্যক্তিস্বার্থের সুবিধা ষোলো আনা। দেশের ভেতর অতটা সহজ না হলেও বিদেশে এরা বেশ জাঁকিয়ে বসেছে। দেশের বিরুদ্ধে যত রকম অপপ্রচার করা যায় এরা করছে। সার্বিক অর্থে দ্রুত বর্ধনশীল একটি দেশের দুর্নাম করতে একটুও কুণ্ঠিত নয় এই চক্রটি। পৃথিবীতে এ রকম একটি দেশ বা একটি জাতিও আর খুঁজে পাওয়া যাবে না, যারা নিজেরাই নিজেদের দুর্নাম করে, ক্ষতি করে। দেশকে ভালো না বাসলে, দেশের মানুষের মঙ্গল না চাইলে কি আর আন্দোলন হয়? কথাটা এরাও জানে কিন্তু মানে না। এরা আন্দোলনের নামে, নৈরাজ্যের হরতাল-অবরোধ দিয়ে মানুষকে ভয় দেখাতে চাইছে। আগুন-সন্ত্রাস আর মানুষ খুন করে গণতন্ত্রের বুলি আওড়াচ্ছে।
সেই ২০১৩-১৪ সাল থেকে বিএনপি, জামায়াত যে অবরোধ দিয়েছিল তা এখন পর্যন্ত উঠানো না হলেও, অবরোধের ওপর অবরোধ দিয়ে চলছে এই উল্লম্ফন। কিছুদিন অহিংস আন্দোলনের মুখোশ পরে, ২৮ অক্টোবর থেকে স্বরূপে ফিরে, উল্লম্ফনের এই নতুন যাত্রার শুরু। গণমাধ্যম থেকে জানা, ছাত্রদল নেতার ভাষ্য, ‘এই চিত্রনাট্য আগে থেকেই তৈরি করা। সমাবেশে বক্তৃতা চলাকালীন গোলমাল সৃষ্টি করতে হবে। প্রধান বিচারপতির বাসভবনে হামলা, আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিবাদ-মারামারি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে হাঙ্গামা। এর মধ্যে বিএনপির পল্টন অফিসে বাইডেনের সাজানো উপদেষ্টার উত্তেজক বিভ্রান্তিকর বক্তব্য। এসবই আগে থেকেই সাজানো।’ কিন্তু সমস্যা হয়ে গেল ‘চিত্রনাট্য’র মতো কিছু ঘটল না বলেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যকে পিটিয়ে, কুপিয়ে মেরে ফেলা হলো, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ধৈর্য দেখালো। আওয়ামী লীগের সঙ্গে তেমন কিছু ঘটল না। কিন্তু বাকি সব ঘটে গেল। বাইডেনের সাজানো উপদেষ্টার বিভ্রান্তিকর উত্তেজক বক্তব্যে সমাবেশের মানুষ উদভ্রান্ত হয়ে উঠল। সন্ত্রাস ছড়ালো চারদিকে। ঘোষণা দেওয়া হলো হরতালের। এরপর অবরোধ-অগ্নিসন্ত্রাস। কিন্তু কেন এই জনবিচ্ছিন্ন আন্দোলন? কি চায় আগুন-সন্ত্রাসীরা? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতন, সরকারের পতন! কিন্তু কেন? কী করেছে শেখ হাসিনা সরকার? দরিদ্র দেশটিকে উন্নত বিশ্বের কাতারে দাঁড় করিয়েছে বলে? শেখ হাসিনা নিজেকে বিশে^র একজন অন্যতম ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মর্যাদাশীল নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে বলে?
হরতাল, অবরোধকারীরা শেখ হাসিনার পতনের পাশাপাশি ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যাপারটিও জুড়ে দিয়েছে। সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার যা আমরা ১/১১-তে দেখেছি? এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার আর এ দেশে হবে না। দেশের সর্বোচ্চ আদালত, দেশের সংবিধান সে পথ বন্ধ করে দিয়েছে। ’১৪ সালে নির্বাচনে না এসে এবং ’১৮ সালে নির্বাচনের নামে নমিনেশন বাণিজ্য করে, ভোট কারচুপির ধুয়া তুলে তত্ত্বাবধায়কের এই আব্দার। আব্দার বৈকি। বিরোধীদের যারা নির্বাচনে এসেছিলেন ’১৮ সালে দুপুর পর্যন্ত তারা সবাই বলেছেন, নির্বাচন ভালো হচ্ছে। দুপুর গড়াতেই সে বক্তব্য উল্টো হয়ে গেল! ভোট কারচুপির কথা বলা হলেও তখন ‘রাতে ভোট হয়ে গেছে’ এ রকমটি কেউ বলেননি। কথাটি পরবর্তী সময় নতুন সংযোজন। কিন্তু এর সপক্ষে একটি প্রমাণও কেউ দেখাতে পারেননি। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে অডিও, ভিডিও বা কোনো মাধ্যমেই কেউ এর অকাট্য প্রমাণ দিতে পারেননি। শুধু মুখে বলে বলেই এই মিথ্যাকে যেমন সত্য প্রমাণ করা যায় না। তেমনি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তনও নিতান্তই অর্থহীন দাবি।
খালেদা জিয়া দুর্নীতির দায়ে কারাবাসে (প্রধানমন্ত্রীর দয়ায় জামিনে), তারেক দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী। রাজনীতি থেকে মুচলেকা দিয়ে দেশ থেকে বিতারিত। বিএনপি-জামায়াত সন্ত্রাসী, জঙ্গি সংগঠন। এদের হয়ে তাই কারা এখন মাঠে? এই প্রশ্ন এখন নিঃসন্দেহে প্রণিধানযোগ্য। মাঠ-কর্মীরা যাদের হয়ে প্রাণপাত করছেন, তারা কেবল ক্ষতিগ্রস্তই হচ্ছেন না, প্রতারিতও হচ্ছেন। খালেদা, তারেক বাদে মধ্যখানের নেতা যারা আছেন তারা সবাই আপাদমস্তক মতলবি। কর্মী-সমর্থকদের সন্ত্রাস নৈরাজ্যের ভেতর ঠেলে দিয়ে গা-ঢাকা দিলেন গা-বাঁচাতে। যাদের অবরোধের নামে অগ্নিসন্ত্রাস নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দেওয়া হলো, তাদের পরিণতি কী? এই প্রশ্নের উত্তর তাদেরই দিতে হবে নিজেদের কৃতকর্মের মাশুল গুনে। সবচেয়ে বড় কথা, রাজনীতি যদি হয় দেশের মানুষের জন্য, আন্দোলনও হবে দেশের মানুষের জন্যই। দেশের মানুষের জন্যই গণতন্ত্র। গণমানুষের সম্পৃক্ততা ছাড়া রাজনীতি, আন্দোলন কোনোটাই সফলতা নেই। এই অগ্নিসন্ত্রাস, নৈরাজ্য দেশের মানুষকে ভোগান্তির মধ্যে যেমন ফেলেছে তেমনি দেশের অর্থনীতিকেও সাময়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অর্থনৈতিক ও মানবিক এই সাময়িক ক্ষতি সরকার কাটিয়ে উঠবে ঠিকই। আন্দোলনের নামে এই নৈরাজ্য-সন্ত্রাস কখনোই টিকবে না, টিকতে পারে না।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন বিরোধীদলীয় নেতা, তখনই তাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলা চালানোসহ অসংখ্যবার হত্যাচেষ্টা চালানো হয়। হত্যাচেষ্টা এখনো অব্যাহত বলে প্রধানমন্ত্রী নিজেই কদিন আগে জানালেন। শেখ হাসিনাকে হত্যা করা, উৎখাত করা একই সুতোয় বাঁধা। একই সূত্রে গাঁথা বঙ্গবন্ধুসহ তার পরিবার-স্বজনদের হত্যাকাণ্ডও। এর পেছনের কারণ খুবই সহজ-সোজা। বাংলাদেশকে যারা মেনে নিতে পারেনি, দেশি-বিদেশি চক্র তারাই এসবের অন্তরালের কারিগর। আর এখন যখন শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, অকপট সত্য উচ্চারণের পাশাপাশি নিজেকেও সম্মানের উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত করছেন, তখন এই কুচক্রীদের তা সইবে কেন? সুতরাং বর্তমান আন্দোলনের কোনো পরিণতি নেই। নির্বাচন সুষ্ঠুভাবেই হবে। সেই সঙ্গে বলতে হয়, জনগণের রায় নিয়ে বর্তমান সরকারই আবার ক্ষমতায় আসবে। সময়ের অপেক্ষা মাত্র। যারা দিবাস্বপ্ন দেখছেন, অচিরেই তা পরিণত হবে দুঃস্বপ্নে।
লেখক: সাংবাদিক ও লেখক