ফের প্রতিবাদ সংঘর্ষ গুলিতে প্রাণ গেল নারী শ্রমিকের

আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০২৩, ০২:২৪ এএম

সরকারের নির্ধারণ করে দেওয়া ন্যূনতম মজুরি প্রত্যাখ্যান করেছে তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের বেশ কয়েকটি সংগঠন। গত মঙ্গলবার সরকারের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৫৬ দশমিক ২৫ শতাংশ বাড়িয়ে সাড়ে ১২ হাজার টাকা করার ঘোষণা আসার পরপরই তৈরি পোশাকশ্রমিকদের ১১টি সংগঠন নিয়ে গঠিত গার্মেন্টস শ্রমিক আন্দোলন প্ল্যাটফর্ম তা প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দিয়ে শুক্রবার প্রতিবাদ সমাবেশের ডাক দেয়। তবে তার আগেই গতকাল বুধবার গাজীপুর ও ঢাকার সাভারের শ্রমিকদের একাংশ বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে। সংঘর্ষে জড়িয়েছেন পুলিশের সঙ্গে। গাজীপুরে নিহত হয়েছেন এক নারী শ্রমিক, পুলিশসহ আহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন। সাভারে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বেশ কয়েকটি কারখানা। অবরোধ, বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের কারণে সংশ্লিষ্ট এলাকার সড়ক-মহাসড়ক দিয়ে বন্ধ হয়ে যায় যান চলাচল।

দেশ রূপান্তরের গাজীপুর, সাভার ও ঢামেক প্রতিনিধি পাঠানো তথ্যে বিস্তারিত

নারী শ্রমিক নিহত, পুলিশসহ আহত বহু : গাজীপুর জেলার একাধিক জায়গায় বিক্ষোভ করেছেন শ্রমিকরা। এর মধ্যে মহানগরীর কোনাবাড়ীতে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষে এক নারী শ্রমিক নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ১০ শ্রমিক। এ ছাড়া মহানগরীর নাওজোর এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কেও অবরোধ, বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে পাঁচ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ জানিয়েছে, কোনাবাড়ীতে সংঘর্ষে নিহত ওই নারীর নাম আঞ্জুয়ারা খাতুন (২৪)। তিনি কোনাবাড়ী জরুন এলাকার ইসলাম গার্মেন্টস ইউনিট-২-এর সেলাই মেশিন অপারেটর পদে চাকরি করতেন। তার বাড়ি সিরাজগঞ্জ জেলার কাজীপুর থানার চরগিরিশ এলাকায়। নিহতের স্বামী জামাল বাদশা জানান, তিনি ইসলাম গার্মেন্টসের সুপারভাইজার পদে চাকরি করেন। তার স্ত্রীও ওই কারখানার শ্রমিক। সকালে অফিসে যাওয়ার সময় পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষের সময় তার স্ত্রী আহত হন। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনার পর তার স্ত্রীকে মৃত ঘোষণা করা হয়। তিনি জানান, তাদের এক ছেলে ও এক মেয়েসন্তান রয়েছে।

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার খায়রুল আলম বলেন, ন্যূনতম বেতন ২৩ হাজার টাকা করার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে গাজীপুরের কোনাবাড়ী, কাশিমপুর, সফিপুর ও মৌচাকসহ আশপাশের বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা আন্দোলন করে আসছেন। মঙ্গলবার ন্যূনতম মজুরি সাড়ে ১২ হাজার টাকা ঘোষণা করার পর তা প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন শ্রমিকদের একাংশ। প্রতিদিনের মতোই বুধবার সকাল থেকে কোনাবাড়ী এলাকার সকাল ৮টার দিকে কয়েকশ শ্রমিক কাশিমপুরের জরুন মোড়ের সামনে স্ট্যান্ডার্ড গার্মেন্টস লিমিটেড, রিপন নিটওয়্যার লিমিটেড, ইসলাম গার্মেন্টস ও বেস্টাল সোয়েটারসহ আরও কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা কাজে যোগ না দিয়ে কারখানার সামনেই বিক্ষোভ শুরু করলে কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে কর্র্তৃপক্ষ। একপর্যায়ে শ্রমিকরা বিভিন্ন সড়ক অবরোধ করে কাঠ ও টায়ারে আগুন ধরিয়ে দেন। এ ছাড়া বিভিন্ন যানবাহন ভাঙচুরের চেষ্টা করেন। পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তারা রাবার বুলেট, টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

সে সময় বেশ কয়েকজন আহত হন। এর মধ্যে আঞ্জুয়ারা খাতুন ও জামাল উদ্দিন (৪২) নামের দুজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর আঞ্জুয়ারাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।

এদিকে মহানগরীর নাওজোর এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে পাঁচ পুলিশ আহত হয়েছে। এর মধ্যে তিনজনের অবস্থা গুরুতর। তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। গতকাল বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় পুরো নাওজোর এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।

গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক রফিকুল ইসলাম জানান, আহত অবস্থায় পাঁচজন পুলিশ সদস্যকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে। তাদের মধ্যে গুরুতর আহত পুলিশ সদস্য প্রবীর (৩০), ফুয়াদ (২৮) ও খোরশেদকে (৩০) উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। আশিকুল (২৭) ও বিপুলকে (২৪) হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ফুয়াদের অবস্থা বেশি গুরুতর।

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মো. মাহবুব আলম বলেন, বুধবার সকাল থেকে বেশিরভাগ কারখানায় কাজ চললেও কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা আন্দোলনে নামেন। আমরা তাদের নিজেদের জায়গায় থাকতে বলেছিলাম। কারখানায় ঢুকতে বলেছিলাম। অন্য কোনো কারখানায় ভাঙচুর না করতে বলেছিলাম। কিন্তু তারা আমাদের নির্দেশনা না শুনে অন্য কারখানার শ্রমিকদের নামানোর চেষ্টা করলে সংঘর্ষ শুরু হয়। তিনি বলেন, বুধবার শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে মোট আটজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছে। এর মধ্যে সকালে সংঘর্ষের ঘটনায় তিন ও বিকেলে নাওজোর এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনা পাঁচজন হয়েছে। বিকেলে যে পাঁচজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছে তাদের শ্রমিকদের সঙ্গে সংঘর্ষ ও এপিসি কারে বিস্ফোরণেও আহত হওয়ার ঘটনা আছে।

আশুলিয়ায় কারখানা ছুটি ঘোষণা : সাভারেও ন্যূনতম মজুরি প্রত্যাখ্যান করে বিক্ষোভ করেছেন পোশাকশ্রমিকরা। শ্রমিকরা বিভিন্ন কারখানায় ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে ভাঙচুর চালান। এ সময় পরিস্থিতি সামাল দিতে কারখানা কর্র্তৃপক্ষ শ্রমিকদের ছুটি দিয়ে দেয়। বুধবার দুপুরের পর থেকে আশুলিয়ার জামগড়া, নরসিংহপুর, জিরাব কাঠগড়া এলাকায় এসব ঘটনা ঘটেছে।

প্রত্যক্ষদর্শী শ্রমিক ও শিল্প পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বুধবার সকাল থেকে শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ার কারখানাগুলোতে শ্রমিকরা শান্তিপূর্ণভাবে কাজে যোগদান করেন। একপর্যায়ে বেলা ১১টার পর নরসিংহপুর এলাকার কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা মজুরি বোর্ড ঘোষিত ন্যূনতম মজুরি প্রত্যাখ্যান করে কাজ বন্ধ করে দেন। এ সময় শ্রমিকরা কাজ না করায় বেশ কয়েকটি পোশাক কারখানা সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে কর্র্তৃপক্ষ। পরে কারখানা থেকে বের হয়ে এসব শ্রমিকের বড় একটি অংশ নিজ নিজ বাসায় চলে গেলেও আরেকটি অংশ আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকার বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কের শারমিন গ্রুপের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। শ্রমিকরা সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের ধাওয়া দিয়ে ও কয়েক রাউন্ড টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

পরে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা মিছিল করতে করতে কাঠগড়া ও জিরাব এলাকার বিভিন্ন তৈরি পোশাক কারখানার মূল ফটকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এ সময় ওই এলাকার অন্তত ৩০টি কারখানার শ্রমিকদের ছুটি দিতে বাধ্য হয় কর্র্তৃপক্ষ। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের ধাওয়া দিয়ে তাড়িয়ে দেন শিল্প পুলিশের সদস্যরা। আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহমুদ নাসের জনি বলেন, শ্রমিকরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে ভাঙচুর চালিয়েছে বলে খবর পেয়ে আমাদের লোকজন গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। কারখানাগুলোর নিরাপত্তার স্বার্থে এলাকার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টসহ বিভিন্ন কারখানার সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত