যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনে ভূতের আঁচড়

আপডেট : ১২ নভেম্বর ২০২৩, ০৬:৩৩ এএম

‘মেরেছে কলসির কানা, তাই বলে কি প্রেম দিব না’। এই বিখ্যাত বাক্যটির উদ্ধৃত হয়, শ্রীকৃষ্ণ ভক্ত শ্রী নিত্যানন্দ ও হরিদাস ঠাকুর নবদ্বীপের রাস্তায় নগরকীর্তনকালে যারা জগাই-মাধাই নামের দুই ভাইয়ের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন। কলসির কানার আঘাতে শ্রী নিত্যানন্দের কপাল কেটে রক্ত ঝরে। কিন্তু তাতে বিন্দুমাত্র রাগ না করে উল্টো তিনি মাধাইকে তৎক্ষণাৎ আলিঙ্গন করে বলেছেন, কলসির কানা মেরেছিস, তাই বলে কি তোকে প্রেমভক্তি দেব না? কী তাদের প্রেমভক্তি ও মানবিকতা!

পৃথিবীতের সেই প্রেম ও শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার দিন আর নেই। অনেক কিছুর মতোই শান্তি এখন কৌশলগত এবং গালভরা শব্দ ভূ-রাজনৈতিক চক্রে আবদ্ধ। দুর্ভাগ্য যে, আমরা এমন এক পৃথিবীতে বসবাস করছি যেখানে শান্তিকেও কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে দেখতে হয়। এর উদ্দেশ্য একটাই, শান্তির সঙ্গে আপস করা যাবে, কিন্তু কৌশলগত গুরুত্ব ও প্রভাব বলায় ধরে রাখার সঙ্গে আপস করা যাবে না। শুনতে নির্মম হলেও, তার নমুনা আমরা দেখতে পাচ্ছি বর্তমান ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যকার সংঘাতে। ভাবা যায়, বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলো যুদ্ধ বিরতি চায় না? তারা চায়, হামাসের ধ্বংস ও ফিলিস্তিনিদের নির্মূল করতে! মৃত্যু এখানে একটি সংখ্যা মাত্র। কী হামাস যোদ্ধা, কী বেসামরিক ব্যক্তি, কী নারী, কী শিশু কে রক্ষা পাচ্ছে? জাতিসংঘ মহাসচিব বলছেন ‘গাজা দ্রুত শিশুদের কবরস্থানে পরিণত হচ্ছে’। সেটাই হয়তো ইসরায়েলের উদ্দেশ্য। কারণ ইসরায়েল জানে, ফিলিস্তিনিদের সবাই হয়তো এই মুহূর্তে সশস্ত্র সংগ্রামে নেই কিন্তু দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও দাসত্ব এদের সবার মধ্যে বিদ্রোহের যে বীজ বপন করে দিয়েছে তার বহির্প্রকাশ হতে কতক্ষণ। তাই হামাস যোদ্ধাদের বেসামরিক নাগরিকদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করার যুক্তি এখানে কতটুকু খাটে? বেলফোর প্রকল্পের বাস্তবায়নের শুরুর পর থেকেই ফিলিস্তিনিরা যে নরকে আছে তা নিয়ে বিতর্কের কোনো সুযোগ আছে বলে মনে হয় না।

তবে পৃথিবী মধ্যযুগে নেই। একই সঙ্গে ঔপনিবেশিকতা জয়জয়কারও এখন অতীত। আধুনিক ইতিহাসে যুদ্ধের পাশাপাশি যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনও বেশ প্রবল। ছোট হলেও বিশ্বব্যাপী স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শান্তিকামী মানুষের চেষ্টা অব্যাহত আছে। আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময় আব্রাহাম লিংকনের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন ডেমোক্র্যাট জর্জ বি. ম্যাকালাম। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জীবন ও সম্পদের ধ্বংস রোধে ব্রিটেন ও ইউরোপে যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন দানা বাঁধে, যদিও অতটা জোরদার ছিল না। উল্টো ১৯১৭ ও ১৮তে আমেরিকায় দুটি আইন করা হয় যেখানে যুদ্ধবিরোধী অবস্থানের কারণে সংবাদপত্র বন্ধ ও দোষী ব্যক্তিকে জেল-জরিমানার কথা বলা হয়েছে। তবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ত্রিশের দশকে ইউরোপে যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন আবারও দানা বাঁধতে থাকে এবং যুদ্ধের সঙ্গে ব্যবসায়িক স্বার্থসংশ্লিষ্টার বিরুদ্ধে সচেতন মহল কথা বলতে শুরু করে। মূলত প্রবীণ অভিজ্ঞদের স্বার্থ সুরক্ষায় তুলনামূলক কম বয়সীদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ ও জীবন বিসর্জনের বিরুদ্ধে জনমত প্রবল হতে থাকে। ভুক্তভোগীদের যুদ্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করার বিষয়টি একটি ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়, কারণ অভিজাতরা যুদ্ধে বাধ্যতামূলক সামরিক অংশগ্রহণকে পাশ কাটাতে পারলে অপেক্ষাকৃত দরিদ্রদের পক্ষে তা সম্ভব ছিল না। এ সময় ইংল্যান্ডে ১৯৩৩ সালে অক্সফোর্ড ইউনিয়নও একটি প্রস্তাবনা পাস করে, যাতে উল্লেখ করা হয়, তারা কোনো অবস্থাতেই রাজা ও দেশের জন্য যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে না।

তবে যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে সোশ্যালিস্ট আন্দোলনের কিছুটা যোগসূত্র আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতেও যুদ্ধবিরোধী অবস্থানের একটা আবহ ছিল। বিশেষ করে প্রথমদিকে সোশ্যালিস্টরা যুদ্ধের বিরুদ্ধে সরব থাকলে পরবর্তী সময় যুদ্ধ গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই ধারাবাহিকতা আর থাকেনি। স্নায়ুযুদ্ধের সময়ও যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের ধারাবাহিতা ছিল। যার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আমেরিকার ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়। ১৯৬৪ সাল থেকেই আমেরিকায় ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে আন্দোলন দানা বাঁধতে থাকে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী আর কলেজ ক্যাম্পাসগুলোতে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনের তীব্রতাও বাড়তে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় যুদ্ধ বন্ধের দাবিতে আমেরিকায় আন্দোলনকারী সংগঠনের সমন্বয়ে একটি জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি পরবর্তী সময়ে আমেরিকা জুড়ে কয়েকটি বড় বড় সমাবেশের আয়োজন করে। সেই সময় যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের মধ্যে একটি বড় কৌশল ছিল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে যুদ্ধের বিরোধিতা। পাশাপাশি শান্তি, সংহতি প্রভৃতি বিষয় নিয়ে জনমত তৈরি। যুদ্ধবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এ সময় নাগরিক অধিকার আন্দোলনের হাত ধরে আরও গতি লাভ করে এবং প্রায় সব বয়সী ও শ্রেণির জনগণ এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়।

আমেরিকায় যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনে আমেরিকার যুদ্ধে জড়ানোর বিরুদ্ধে একটি অবস্থান তৈরি হয়েছিল। অনেক ভিয়েতনামফেরত যোদ্ধা যুদ্ধের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। ভিয়েতনামীদের প্রতিরোধ ও যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনাম থেকে সৈন্য প্রত্যাহারে বাধ্য হয়। পরবর্তী সময় যুগোশ্লাভিয়া যুদ্ধ, ইরাক যুদ্ধ ও আফগানিস্তান যুদ্ধে এই আন্দোলন দানা বেঁধেছে বটে, তবে তা ছিল বেশ ক্ষীণ। আমেরিকার ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র। তিনি যুদ্ধের সমালোচনা করে বলেছিলেন, ‘আমার সচেতনতা অন্য কোনো পথ খোলা রাখেনি’। লুথার কিং মার্কিন দরিদ্র ও ভিয়েতনামি কৃষক উভয়ের ক্ষেত্রে যুদ্ধের ক্ষতিকর প্রভাব বর্ণনা করেছিলেন। তিনি অহিংস পদ্ধতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধ বন্ধের জন্য সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণের জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন। একই সময় জনপ্রিয় গানের দল বিটল্স যুদ্ধবিরোধী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারা বিটল্স যুদ্ধের বিরুদ্ধে ও শান্তির সপক্ষে বেশ কিছু গান রচনা করে। যার মধ্যে রয়েছে ‘গিভ পিস এ চান্স’, ‘রেভল্যুশন’, ‘অল ইউ নিড ইজ লাভ’।  গানগুলো বিটল্স ভক্তদের মধ্যে যুদ্ধবিরোধী মনোভাব গঠনে প্রচণ্ডভাবে সাড়া জাগায়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এতদিন পরে বিটল্স একটি নতুন গানের ট্রাক প্রকাশ করে। বলা বাহুল্য, পৃথিবীর অনেক কিছুর পরিবর্তনের মতো তারাও যুদ্ধবিরোধী গানের পরিবর্তে প্রেমের স্মৃতি রোমন্থন করছে। শুরু করেছিলাম, নবদ্বীপে নগরকীর্তনে প্রেমের আহ্বান জানানোর উদ্ধৃতি দিয়ে। একটি হচ্ছে মানবপ্রেমের নিদর্শন, অন্যটি বর্তমান স্টাবলিসমেন্টের সঙ্গে প্রেম। পৃথিবী থেকে যেন বিদ্রোহ হারিয়ে গেছে। আজ সবাই কোনো এক অদৃশ্য জাদুমন্ত্রে বশীভূত, এখন পুরো পৃথিবীটাই যেন হীরক রাজার দেশের ‘যন্তর মন্তর’।

এবার ফিরে আসা যাক ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের যুদ্ধের বর্তমান গতি-প্রকৃতি নিয়ে। বিভিন্ন সূত্রমতে, এখন পর্যন্ত ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় দশ হাজারের বেশি। কিন্তু এর প্রতিক্রিয়ায় বিশ্বব্যাপী যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের ধারা খুবই ম্রিয়মাণ। বিভিন্ন পশ্চিমা দেশে আরব বংশোদ্ভূতরা এর প্রতিবাদ করছেন বটে, কিন্তু তাদের সঙ্গে তথাকথিত বিশ্ব প্রগতিশীলদের একই অবস্থানে দেখা যাচ্ছে না। সবাই যেন এই হত্যাকাণ্ডকে নীরবে মেনে নিচ্ছে! আসলে বিশ্বে এখন রাজনৈতিক ও দার্শনিক ভিন্নমতাবলম্বিতার দারুণ এক খরায় ভুগছে। সব যেন খুবই একরৈখিক, বর্তমান বিশ্ব স্টাবলিসমেন্টের রাজনৈতিক চিন্তা ও দর্শনের আজ্ঞাবাহী। সমাজতন্ত্রের পতনের পর এখন পর্যন্ত এমন কোনো বিকল্প রাজনৈতিক চিন্তাধারা ও দর্শন পৃথিবীতে আসেনি যে, তার অনুসারীরা চলমান হত্যাকাণ্ডকে বিরোধিতা করতে পারে বা সেই বিরোধিতা করার মতো সাহস তাদের আছে। ইতিহাস বলে যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের সবচেয়ে বড় সমর্থক ছিল বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন, নাগরিক অধিকার আন্দোলন ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রগতিশীল সমাজতান্ত্রিকরা। তবে বর্তমানে একরৈখিক বিশ্ব ক্ষমতা কাঠামোর কাছে এই রাজনৈতিক ধারণাগুলো আজ পরাজিত। সঙ্গে সঙ্গে পরাজিত যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনও। যতদিন না পর্যন্ত বিশ্ব রাজনীতির এই দৈন্যদশা ও তমসাচ্ছন্ন অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত এই হত্যাকাণ্ড বন্ধ হওয়ার আপাত কোনো সম্ভাবনা নেই। পৃথিবীবাসী এখন অন্য একটি মোহে অচ্ছন্ন। যে মোহ যতটা না সমতা ও ন্যায্যতাকে গুরুত্ব দেয় তার থেকে অনেক বেশি ভান করে, নিজেদের স্বার্থ হাসিলের আশায়। এখন পর্যন্ত এই শক্তি তার বিরোধী সব কিছুকেই পরাস্ত করতে সক্ষম হয়েছে। শান্তির প্রশ্নে বিশ্ব এখন যতটা না মানবপ্রেম তার থেকে অনেক বেশি প্রেমে ছলনার আশ্রয় নেয়। সবকিছু দেখে, শুনে, বুঝে কীভাবে অন্যায়কে যৌক্তিক আবরণে মোড়কজাত করা যায় সেটাই যেন এ সময়ের শিল্প। এই শিল্প শেখাচ্ছে ক্ষমতাবানদের অন্যায়ের কোনো ধরনের প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ না করা, ন্যায্যতার জন্য আন্দোলন না করা এবং শান্তির জন্য আর্তনাদকে বিসর্জন দেওয়া। যে মানবতাকে আমরা ঐতিহাসিকভাবে অর্জন করেছি, সেই মানবতা আজ বিলীন হওয়ার পথে এরই ধারাবাহিকতায়।

লেখক: উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত