মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের জন্য আলাদা কর্তৃপক্ষ গঠন করা হবে বলে জানা গেছে। সেজন্য আইনের খসড়াও প্রস্তুত করা হয়েছে। মাতারবাড়ী বন্দর কর্তৃপক্ষ হলে তা হবে চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রার পর চতুর্থ সমুদ্রবন্দর কর্তৃপক্ষ।
কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের আওতায়। কিন্তু গত শনিবার মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের চ্যানেল উদ্বোধন ও টার্মিনালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে এর জন্য নতুন বন্দর কর্তৃপক্ষ কিংবা গভীর সমুদ্র কর্তৃপক্ষ গঠন করা যায় কি না, তা বিবেচনায় রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়ে বক্তব্যের একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেহেতু দেশে কোনো গভীর সমুদ্রবন্দর নেই তাই আলাদা আইন করে গভীর সমুদ্রবন্দর কর্তৃপক্ষ করা যায় কি না, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইতিমধ্যে মাতারবাড়ী বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার জন্য ২৪ পৃষ্ঠার একটি খসড়া আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। সেই আইনের ভিত্তিতে মাতারবাড়ী বন্দর প্রতিষ্ঠা কার্যক্রম এগিয়ে যাবে।
দেশে বর্তমানে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনে তিনটি বন্দর কর্তৃপক্ষ রয়েছে। ১৩৬ বছরের পুরনো এবং দেশের প্রায় ৯৩ শতাংশ আমদানি রপ্তানি বাণিজ্য যে বন্দরের মাধ্যমে হয় তা হলো চট্টগ্রাম বন্দর। ১৮৮৭ সালে কর্র্ণফুলী নদীর তীরে পোর্ট কমিশনার গঠনের মাধ্যমে এ বন্দরের যাত্রা শুরু হলেও এটি আরও পুরনো বন্দর। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পর ১৯৫৪ সালের ২০ জুন খুলনায় মোংলা সমুদ্রবন্দর এবং ২০১৬ সালের ১৩ আগস্ট পটুয়াখালীতে পায়রা সমুদ্রবন্দরের গোড়াপত্তন হয়। একই বছরের কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ীতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে বিনিয়োগে এগিয়ে আসে জাপান সরকার। শুধু এগিয়ে আসাই নয়, এর আগে ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান সফরের সময় সে দেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজারকে কেন্দ্র করে শিল্পায়নের একটি পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ (বিগ-বি) ইনিশিয়েটিভ বা বিগ-বি নামে পরিচিত সেই পরিকল্পনা ওপর ভিত্তি করেই মাতারবাড়ীতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। আর এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য কয়লার আনতে বড় আকারের জাহাজ ভেড়ানোর দরকার হয়। তাই ১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ কৃত্রিম চ্যানেল তৈরি করা হয়। সেই চ্যানেলের গভীরতা আরও দুই মিটার বাড়িয়ে ১৮ মিটার ও চওড়া ১০০ মিটার বাড়িয়ে ৩৫০ মিটার করার মাধ্যমে গভীর সমুদ্রবন্দর উপযোগী করার প্রস্তাব দেয় জাপান। জাপানের সেই প্রস্তাবের পর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ‘মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প’ নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৭ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকার সেই প্রকল্পের আওতায় টার্মিনাল নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন গত শনিবার।
ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যের একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী এটাও বলেন, সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেখানে প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্যের অনেক উপাদান রয়েছে। গভীর সমুদ্রবন্দর করা হলে সেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই মাতারবাড়ীতে এ গভীর সমুদ্রবন্দর করা হয়েছে।
তবে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে এবং নৌ মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের আওতায় এখন মাতারবাড়ী বন্দর চালু হতে পারে। ২০২৬ সালে বন্দরের নির্মাণকাজ শেষে অপারেশনাল কার্যক্রমে যাওয়ার পর হয়তো তা আলাদা বন্দর কর্তৃপক্ষ হতে পারে। এ ছাড়া পায়রা সমুদ্রবন্দর গড়ে তোলার সময়ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ অর্থায়ন করেছিল এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা প্রেষণে গিয়ে ওই বন্দরের কার্যক্রম পরিচালনা করেছিলেন। মাতারবাড়ীর ক্ষেত্রেও এমন হতে পারে। মাতারবাড়ী বন্দরের জন্য ভূমি অধিগ্রহণসহ এ পর্যন্ত সব ব্যয়ভার চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বহন করে আসছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (উন্নয়ন) ড. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম খান গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ খরচ করলেও সমস্যা নেই। পরবর্তী সময়ে যদি মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নামে আলাদা কতৃপক্ষ হয়, তাহলে এ খাতে খরচ হওয়া সব অর্থ মাতারবাড়ীর নামে যুক্ত হবে। একই সঙ্গে ঋণ থাকলেও তা মাতারবাড়ী বন্দরের নামে হবে।’
বিশে^র যেসব দেশে একাধিক বন্দর রয়েছে সেসব দেশে কীভাবে বন্দরগুলো পরিচালিত হয় তা জানতে চাইলে বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট খায়রুল আলম সুজন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশে মোংলা, পায়রা ও চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য পৃথক কর্তৃপক্ষ রয়েছে। একইভাবে মাতারবাড়ীর জন্য পৃথক কর্তৃপক্ষ হলে কাজে গতি আসবে, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং বন্দরগুলোর মধ্যে এক ধরনের প্রতিযোগিতা কাজ করবে।’
এদিকে মাতারবাড়ী বন্দরের কাজের অগ্রগতি ও পরবর্তী লক্ষ্যমাত্রা সম্পর্কে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ সোহায়েল বলেন, ‘আমার মাতারবাড়ী বন্দরের টার্মিনাল নির্মাণের কাজ শুরু করার পাশাপাশি ইকুইপমেন্ট সংগ্রহের জন্য দরপত্র এবং বন্দরের টার্মিনাল অপারেটরের জন্য টাগবোট, পাইলট বোটসহ উপকরণ সংগ্রহের জন্য দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এগুলো ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে একসঙ্গে প্রস্তুত হয়ে যাবে এবং আমরা অপারেশনে যেতে পারব।’
মাতারবাড়ী বন্দরে যেকোনো দৈর্ঘ্যরে ১৬ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভিড়তে পারবে। সাধারণত ১২ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভিড়তে পারলে তাকে গভীর সমুদ্রবন্দর হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া হয়। ইতিমধ্যে এ বন্দরের জেটিতে ১২ মিটার বেশি ড্রাফটের জাহাজ ভিড়েছে।
