চট্টগ্রাম জুড়ে ছোঁয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের

আপডেট : ১৪ নভেম্বর ২০২৩, ০২:২০ এএম

টানেল এবং দোহাজারি-কক্সবাজার রেললাইন উদ্বোধনের পর এবার পুরো নগরী এলিভেটেডের আওতায়। পতেঙ্গা থেকে ওয়াসা মোড় পর্যন্ত ১৬ কিলোমিটার চার লেনের এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের মাধ্যমে পুরো নগরী এলিভেটেডের আওতায় চলে আসছে। এই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে যুক্ত হচ্ছে মুরাদপুর থেকে লালখান বাজার পর্যন্ত আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভারের সঙ্গে। আর মুরাদপুর মোড়ের একটু পর থেকে শুরু হওয়া বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শাহ আমানত সেতু থেকে আসা সড়ক ও জনপথ বিভাগের ছয় লেনের সড়ক। এতে প্রায় ২৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে পাচ্ছে নগরবাসী। আজ মঙ্গলবার ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ওয়াসা মোড় থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যদিও প্রকল্পের কাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি, তারপরও পতেঙ্গা থেকে টাইগারপাস অংশে কাজ শেষ হয়েছে। বাকি আছে ১৪টি র‌্যাম্প নির্মাণের কাজ। এই এক্সপ্রেসওয়ে আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভারের সঙ্গে যুক্ত হলে নগরীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত ফ্লাইওভারের আওতায় চলে আসবে বলে উল্লেখ করেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা সবার আগে বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার নির্মাণ করেছিলাম। এম এ মান্নান ফ্লাইওভার নামের সেই ফ্লাইওভারটির মুরাদপুর থেকে লালখান বাজার পর্যন্ত আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভার নির্মাণ করি। আর এখন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মাধ্যমে বহদ্দারহাট থেকেই পতেঙ্গা বিমানবন্দর পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের আওতায়। ফলে মানুষ দ্রুত বিমানবন্দর, পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত ও টানেল হয়ে কক্সবাজারের দিকে যাতায়াত করতে পারবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ ছাড়া সাগর পাড় দিয়ে আউটার রিং রোড পতেঙ্গায় টানেলের সঙ্গে যোগাযোগ হয়ে যাওয়ায় এবং ফৌজদারহাট থেকে বায়েজীদ বোস্তামী পর্যন্ত একটি বাইপাস নির্মিত হওয়ায় এখন পুরো নগরী রিং রোডের আওতায় চলে এলো। ফলে আন্তঃজেলা রুটের গাড়িগুলোর এখন আর শহরে প্রবেশ করতে হবে না।’

কিন্তু নগরীর প্রধান সড়কের ওপর দিয়ে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করায় শহরে আগামীতে মেট্রোরেলের নির্মাণের সুযোগ নষ্ট হয়ে গেল বলে নগরবিদদের এমন অভিযোগ রয়েছে। এই অভিযোগ প্রসঙ্গে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক ও সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘মেট্রোরেল একটি রুট ধরে হবে এমন কোনো কথা নেই। আমরা তো একটি রুটে এলিভেটেড করেছি। এবার পুরো নগরীতে মেট্রোরেল করা যেতে পারে।’

কয়েক বছর আগে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে মেট্রোরেল নিয়ে একটি স্টাডি হয়েছিল। ওই স্টাডিতে চট্টগ্রামের প্রায় তিনটি রুটে মেট্রোরেল নির্মাণ করা যেতে পারে বলে উঠে এসেছে। বর্তমানে সরকারের পক্ষ থেকে একটি টিম প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে স্টাডি করেছে। চট্টগ্রামে মেট্রোরেল তৈরির সম্ভাব্যতা নিয়ে কাজ করছে সেই টিম। এদিকে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে চালু হলেও এখনই সেখানে গাড়ি চলাচল করতে পারবে না বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষ। তিনি বলেন, ‘এলিভেটেডের কাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। তাই কিছুদিন সময় লাগবে। আর প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন পয়েন্টে ১৪টি র‌্যাম্প নির্মিত হবে। তাই টোল রোডের এই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েটিতে পুরোদমে যান চলাচলে কিছুটা সময় লাগবে।’

এদিকে ৩ হাজার ৪৬২ কোটি টাকার প্রকল্পটি সরকারের রাজস্ব খাতের অর্থায়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে। ২০১৭ সালে ৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকায় তা একনেকে অনুমোদন পেলেও গত অক্টোবরে এর সংশোধিত বাজেট বেড়ে ৩ হাজার ৪৬২ কোটি টাকায় উন্নীত হয়।

এই রোডের কারণে চট্টগ্রামের যাতায়াত তথা অর্থনৈতিক উন্নয়নে কী প্রভাব বিস্তার করবে জানতে চাইলে বিজিএমইএর প্রথম সহসভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই এক্সপ্রেসওয়ে চট্টগ্রামে বিদেশি বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করবে এবং বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে চট্টগ্রামের বিকাশ ঘটবে। ইতিমধ্যে কর্ণফুলীর তলদেশে টানেল, কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দর প্রকল্পের কারণে চট্টগ্রাম কক্সবাজার আঞ্চলিক অর্থনীতির হাব হিসেবে গড়ে উঠছে।’

তবে এসব নতুন সড়কের পাশাপাশি ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় দৃষ্টি না দিলে এসব প্রকল্প থেকে শতভাগ সুফল পাওয়া যাবে না বলে মনে করেন বিশিষ্ট ট্রাফিক বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী সুভাস বড়ুয়া। তিনি বলেন, ‘এক সময় শহরের ভেতরে যানজট হতো। এখন শহরের বাইরের জংশনগুলোতে যানজট বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু যানজট থেকে মুক্তি নেই। এজন্য ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে হবে।’

এলিভেটেডের নামকরণ হচ্ছে মহিউদ্দিন চৌধুরী এক্সপ্রেসওয়ে : এদিকে ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নামকরণ করা হয়েছে ‘মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী সিডিএ এক্সপ্রেসওয়ে’। এর আগে মুরাদপুর থেকে লালখান বাজার পর্যন্ত ফ্লাইওভারের নামকরণ করা হয়েছিল ‘আখতারুজ্জামান চৌধুরী ফ্লাইওভার’ এবং বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারের নামকরণ করা হয়েছিল ‘এম এ মান্নান ফ্লাইওভার’। এই নামকরণের মাধ্যমে চট্টগ্রামের তিন রাজনীতিকের নামে ফ্লাইওভারের নামকরণ করা হলো।

উদ্বোধন হচ্ছে আরও দুই প্রকল্প : দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ বাকলিয়া এক্সসেস রোডের উদ্বোধন হচ্ছে আজ। প্রকল্পটি অনেক আগে শেষ হলেও এতদিন আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা যায়নি। এই রোডটি চালু হওয়ায় চট্টগ্রাম নগরের সঙ্গে শাহ আমানত সেতু হয়ে দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থা সহজতর হয়ে গেল। এই প্রকল্পের নামকরণ করা হয় ‘জানে আলম দোভাষ সড়ক’। বর্তমান চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষের বাবা জানে আলম দোভাষ।

বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সড়ক : বায়েজীদ বোস্তামী থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ পাহাড়ের ভেতর দিয়ে নির্মিত রোডের নামকরণ করা হয় ‘বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সড়ক’। কয়েক বছর আগেই চার লেনের এই সড়কের কাজ শেষ হলেও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্পটি উদ্বোধন করেনি। পাহাড় কেটে গড়ে তোলা এই সড়ক নিয়ে পরিবেশবাদীদের আপত্তি রয়েছে। পরে পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে এই রোডের পাহাড়গুলোকে কীভাবে ড্রেসিং করা যায় তা নিয়ে একটি নির্দেশনা আসার কথা। নির্দেশনা এলে সেই অনুযায়ী পাহাড় কেটে ঢালু করা হবে। অন্যথায় বর্ষাকালে পাহাড় ধসে যানবাহন ও মানুষের প্রাণহানি হতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত