হাসপাতাল ঘিরে ইসরায়েলি নাটকের শঙ্কা ফিলিস্তিনিদের

আপডেট : ১৬ নভেম্বর ২০২৩, ০৩:০৯ এএম

গাজার সবচেয়ে বড় হাসপাতাল আল-শিফার ভেতরে ঢুকে অভিযান শুরু করেছে ইসরায়েলি সেনারা। গত মঙ্গলবার মধ্যরাতে হাসপাতালটিতে অভিযান শুরু হয়। তবে গতকাল বুধবার দুপুর পর্যন্ত সেখানে হামাসের কোনো সদস্য বা ইসরায়েলি জিম্মিদের হদিস পাওয়া যায়নি। অবশ্য হাসপাতালের অভ্যন্তরের কিছু সূত্রের বরাতে আলজাজিরা জানিয়েছে, প্রায় ৩০ জনকে ভবনের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তাদের পোশাক খুলে নেওয়া হয়েছে। তাদের চোখ বেঁধে হাসপাতালের সামনে ট্যাংক দিয়ে ঘেরাও করে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া বিশেষায়িত সার্জারি ভবনের ভেতরে ইসরায়েলি কমান্ডোরা সমস্ত পার্টিশন ছিঁড়ে ফেলছে, ঘরের মধ্যে সমস্ত দেয়াল ধ্বংস করেছে। সেনারা বেসমেন্টে যাচ্ছে এবং একের পর এক লোককে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।

গাজার বাসিন্দাদের বরাতে, আলজাজিরা বলছে, হাসপাতালে হামাসের কোনো কার্যক্রম না থাকলেও মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করতে পারে ইসরায়েল। যদিও এখনো পর্যন্ত, জিম্মি বা হাসপাতালে হামাসের ‘কমান্ড সেন্টার’ হিসেবে ব্যবহারের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

আলজাজিরা আরও জানিয়েছে, হাসপাতালের ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের গুদাম উড়িয়ে দিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। সেনারা লাউডস্পিকার ব্যবহার করে যুবকদের আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিচ্ছে। আলজাজিরা বলছে, ফিলিস্তিনিরা আশঙ্কা করছে যে এই হাসপাতালে হামাসের কোনো কার্যক্রম না থাকলেও মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করতে পারে ইসরায়েল।

এদিকে বিবিসি জানাচ্ছে, আল-শিফা হাসপাতালের ভেতরে রোগী, স্বাস্থ্যকর্মী এবং বেসামরিক নাগরিক মিলিয়ে কয়েক হাজার মানুষ আটকে পড়েছে। অভিযান শুরুর আগ থেকেই পুরো হাসপাতাল এলাকা ঘিরে রেখেছিল ইসরায়েলি সেনারা।

আল-শিফা হাসপাতালের ভেতর থেকে কাদের আল জানুন নামে এক প্রত্যক্ষদর্শী বিবিসিকে বলেন, ‘আমি হাসপাতালের ভেতরে ছয়টি ট্যাংক এবং শতাধিক কমান্ডো সেনাকে দেখেছি। তারা জরুরি বিভাগে প্রবেশ করেছে। তাদের কারও কারও মুখে মুখোশ পরা ছিল এবং তারা আরবি ভাষায় কেউ নড়বেন না, কেউ নড়বেন না বলে চিৎকার করছিল। অবশ্য বিবিসির পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে তার এই দাবিটি যাচাই করা সম্ভব হয়নি।’

তবে হাসপাতালটিতে হামাসের ঘাঁটি রয়েছে বলে দাবি করেছে ইসরায়েল। ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষ থেকে এটি নিশ্চিত করা হয়েছে, সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তারা আল-শিফা হাসপাতালের একটি নির্দিষ্ট এলাকায় হামাসের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সের (সাবেক টুইটার) একটি পোস্টে ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী জানিয়েছে, ‘আমরা বারবারই সতর্ক করে বলেছি, আল-শিফা হাসপাতালটিকে হামাস সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করছে, যেটি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। তাদের এই বেআইনি কার্যক্রম বন্ধ করার জন্যই সেখানে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।’

ইসরায়েলের এই দাবিকে সমর্থন করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও জানিয়েছে, তাদের কাছেও আল-শিফা হাসপাতালের নিচে সুড়ঙ্গে হামাসের একটি ‘কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল সেন্টার’ থাকার তথ্য রয়েছে। তবে এ দাবি অস্বীকার করেছে হামাস ও হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ।

আল-শিফা হাসপাতালে ইসরায়েলি অভিযানের নিন্দা জানিয়ে একে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ বলে অভিহিত করেছে ফিলিস্তিনি কর্র্তৃপক্ষ। গতকাল ফিলিস্তিনের সংবাদমাধ্যম ওয়াফা-তে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মাই আল-কাইলা বলেছেন, আল-শিফা হাসপাতালে অবস্থানরত রোগী, স্বাস্থ্যকর্মী এবং উদ্বাস্তু নাগরিকদের কোনো ক্ষতি হলে তার জন্য ইসরায়েলি দখলদার বাহিনী সম্পূর্ণরূপে দায়ী থাকবে।

গাজার উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত এই আল-শিফা হাসপাতাল কয়েক দিন ধরেই হামাস ও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর মধ্যকার যুদ্ধের ফ্রন্টলাইন বা সম্মুখসারিতে পরিণত হয়েছে। গাজা শহরের চারপাশে কয়েক দিনের প্রচণ্ড হামলা ও তীব্র লড়াইয়ের পর এই প্রথম ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী সরাসরি আল-শিফা হাসপাতালে প্রবেশ করল। অভিযানের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষ থেকেই কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, গাজার সবচেয়ে বড় এই হাসপাতালে এখন অন্তত সাতশ রোগী, চারশ স্বাস্থ্যকর্মী এবং প্রায় তিন হাজার বেসামরিক নাগরিক অবস্থান করছেন। তারা সবাই এখন ইসরায়েলি বাহিনীর অবরোধের মধ্যে পড়েছেন।

অভিযান শুরুর কয়েক ঘণ্টা পর হোয়াইট হাউজ ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের একজন মুখপাত্র বলেছেন, ‘হাসপাতালে যেখানে অসুস্থ ও নিরীহ মানুষ, মানুষ চিকিৎসা নিতে এসেছে, সেখানে আমরা কোনো ধরনের বিমান হামলা কিংবা গোলাগুলি দেখতে চাই না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত