রপ্তানি আয়ের প্রধান অঞ্চলগুলোতে চাহিদা কমে যাওয়ার পাশাপাশি তীব্র ডলার সংকটে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য বড় ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এতে করে রপ্তানি আয় কমে যাচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অধিকাংশ কোম্পানি লোকসানে পড়েছে। এমন সংকটাপন্ন অবস্থার মধ্যেই দেশে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে হরতাল-অবরোধের মতো সহিংস কার্যক্রম চলছে, যা সরবরাহ ব্যবস্থায় মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর বিরোধী দলের আন্দোলন আরও সহিংস হয়ে ওঠার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
এ অবস্থায় সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা আশা করছে দেশের বিভিন্ন মহল। তারা মনে করছেন, সমঝোতা না হলে দেশের অর্থনীতি আরও চাপে পড়বে। মানুষের জীবনযাত্রা আরও কষ্টকর হয়ে যাবে।
বর্তমানের আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে পরিবহন খাতে। রাজধানীর বাইরে জেলাগুলোর সঙ্গে যাত্রীবাহী পরিবহন প্রায় বন্ধ রয়েছে। রাতে পণ্যবাহী পরিবহন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করলেও এগুলোর ভাড়া এখন দ্বিগুণ হয়ে গেছে। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যয় বেড়ে গেছে। শুধু তাই নয়, সময়মতো রপ্তানি পণ্য পাঠানোও এখন কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে করে রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্প বিপাকে পড়েছে।
চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে শুধু হরতাল, অবরোধই নয়, বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান অঞ্চল যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকেও চাপের মধ্যে রয়েছেন ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ সফররত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল গত বুধবার সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন যে, বাংলাদেশকে জিএসপি প্লাস সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে মানবাধিকার পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া হবে। এ ছাড়া ইতিপূর্বে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র যে ভিসা নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল, পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে।
এদিকে আমদানি ব্যয় মেটাতে উচ্চমূল্যে ডলার কিনতে গিয়ে অধিকাংশ কোম্পানির উৎপাদন ব্যয় এমনিতেই অনেকটা বেড়ে গেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত দুই-তৃতীয়াংশ কোম্পানি হয় লোকসানে পড়েছে কিংবা মুনাফা কমে গেছে। বস্ত্র খাতের অনেক কোম্পানি গত বছর মুনাফায় থাকলেও চলতি বছর লোকসানে পড়েছে। হরতাল-অবরোধে দেশের উৎপাদনমুখী খাত এখন অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে।
গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার হাস বাংলাদেশের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে বিশ^ব্যাংক ও আইএমএফের ঢাকা কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেখানে বাংলাদেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিস্থিতিশ্ব এসব নিয়ে আলোচনা হয়। এটি নিয়মিত বৈঠক হলেও যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের অন্যতম বড় দুই উন্নয়ন সহযোগী বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এমন এক সময়ে বৈঠক করলেন, যখন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত অবস্থায় আছে। হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি চলছে, যা অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে চলমান ৫৬ প্রকল্পে ১৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ সহায়তা দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশকে ৪০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। আর আইএমএফ বাংলাদেশকে ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ দিচ্ছে। ইতিমধ্যে প্রথম কিস্তিতে ৪৭ কোটি ডলারের মতো ছাড় হয়েছে। আগামী মাসে পরের কিস্তি ছাড়ের কথা রয়েছে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোটার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হরতাল-অবরোধের কারণে আমাদের অভ্যন্তরীণ যেসব চলাচল, সেগুলো বেশি ব্যাহত হয়েছে। এখন পণ্য পরিবহন সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের।’ তিনি বলেন, বিশেষ করে, ডায়িং থেকে নিটিংয়ে ফেব্রিক্সে আনা-নেওয়া, নিটিং থেকে ডায়িংয়ে যাওয়া সাভার থেকে নারায়ণগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ থেকে গাজীপুর, গাজীপুর থেকে সাভারশ্ব অভ্যন্তরীণ এসব চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
হরতাল-অবরোধে পরিবহন ব্যয় দ্বিগুণ হয়েছে বলে জানান এই ব্যবসায়ী নেতা। তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জ থেকে চট্টগ্রামে পণ্য আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের পরিবহন ব্যয় ১২ হাজার থেকে বেড়ে ২৫ হাজার টাকা হয়ে গেছে। তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে উৎপাদন কম হচ্ছে, শিপমেন্ট দেরি হচ্ছে। এসব নিয়ে ক্রেতারা খুব উদ্বিগ্ন, তাদের সঙ্গে অনেক কথা হচ্ছে। যেসব ক্রয়াদেশ প্লেস হওয়ার কথা ছিল সেগুলো এখন হচ্ছে না। এখন ক্রয়াদেশ পাওয়ার পিক সিজন (মৌসুম)। কিন্তু এই সময় তারা ক্রয়াদেশের বিষয়ে ক্রেতাদের সঙ্গে আলোচনা করতে পারছেন না।
গত বছরের তুলনায় এবার ক্রয়াদেশ কম আসছে জানিয়ে হাতেম বলেন, ‘অন্য বছর এ সময় আমাদের পিক সিজন ছিল। গত বছরের নভেম্বরে বাংলাদেশের ইতিহাসে রেকর্ডসংখ্যক রপ্তানি হয়। গত বছরের নভেম্বর, ডিসেম্বর, জানুয়ারিতে রেকর্ড রপ্তানি হয়েছিল।’
ইতিমধ্যেই ডলার সংকটের কারণে শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমে গেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ঋণপত্র (এলসি) খোলা কমেছে ১৮ শতাংশ। একই সময়ে এলসি নিষ্পত্তি কমেছে ২৪ দশমিক ৪ শতাংশ। এ সময়ে শিল্প কাঁচামালের এলসি খোলা কমেছে ২২ দশমিক ৬ শতাংশ। আর এ পণ্যের এলসি নিষ্পত্তি কমেছে ৩৬ দশমিক ৬ শতাংশ। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে এলসি খোলা কমেছে প্রায় ২৪ শতাংশ। আর নিষ্পত্তি কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতায় হরতাল-অবরোধের কারণে সব সেক্টরেই প্রভাব পড়বে। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে পরিবহন সেক্টরের ওপর। এ কারণে পরিবহনের ভাড়া বাড়বে। যার প্রভাব পড়বে পণ্যের ওপর। এতে মূল্যস্ফীতিও বাড়বে। আবার পণ্য পরিবহনের সময় যদি গাড়িতে আগুন দেয় তাহলে প্রতিষ্ঠান লোকসানে পড়বে। এতে ব্যাংক ঋণেও সমস্যা তৈরি হতে পারে।
যদি পশ্চিমা দেশগুলো কঠোর অবস্থানে যায় তবে কী ধরনের প্রভাব পড়বে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয় তার ওপর নির্ভর করবে প্রভাব কেমন হবে। তবে যদি কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা আসে তাহলে ডলারের দর বাড়বে। এতে মূল্যস্ফীতিও বাড়বে। এ ছাড়া দেশের রপ্তানি বাণিজ্যে ধস নামতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।