এমপিদের ‘কর্মকান্ডে’ বিব্রত জামায়াত

আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২৬, ০১:৫৩ এএম

ফ্যাসিবাদবিরোধী দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম এবং জুলাই আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার জন্য ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে রেকর্ড ৬৮টি আসনে জয়লাভ করে প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের আসনে বসেছে জামায়াতে ইসলামী। তবে এরপর কিছু সংসদ সদস্য ও নেতার স্বজনপ্রীতির কারণে বিব্রতকর পরিস্থিতি পড়েছে দলটি। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া এমন কয়েকটি ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করেছে জামায়াত ইসলামী। পাশাপাশি কিছু জায়গায় ‘অতি রঞ্জিত’ করে প্রচারের অভিযোগও করেছে দলটি। এমন অবস্থায় দলের সব এমপিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে জামায়াত ইসলামী। নির্দেশনা গেছে তৃণমূলেও।

জানা গেছে, সম্প্রতি ঐচ্ছিক অনুদানের তালিকায় নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য আতাউর রহমানের (বাচ্চু) মেয়ের নাম থাকা নিয়ে সমালোচনা হয়। এর প্রেক্ষিতে ব্যক্তিগত সহকারীকে বরখাস্ত করেন এমপি। এ বিষয়ে দল থেকে সতর্ক করা হয় এমপিকে। অবশ্য বিষয়টি অগোচরে ঘটেছে দাবি করে ব্যাখ্যা দিয়েছেন আতাউর রহমান।

রংপুর-৬ আসনের এমপি মো. নুরুল আমিনের বিরুদ্ধেও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ ওঠে। পীরগঞ্জ উপজেলার সদর ইউনিয়নের তুলারামপুর গ্রামে ওয়াক্তিয়া নামাজঘর উন্নয়ন ও মাঠে মাটি ভরাটকরণের কাবিখা প্রকল্পে সভাপতি করা হয় তার চাচাতো বোনের স্বামী ইয়াকুব আলীকে। অপর একটি প্রকল্পে সভাপতি করা হয় ইয়াকুব আলীর ছেলে সালমান শরিফকে। তারা দুজনই সম্পর্কে এমপির ভগ্নিপতি-ভাগনে। এ ঘটনায় এমপি নুরুল আমিনকে সতর্ক করেছে জামায়াত। তবে ঘটনাটিকে অতিরঞ্জিত হিসেবেও দেখছেন জামায়াত নেতারা। গ্রাম পর্যায়ে উন্নয়নকাজ করতে গেলে এর সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে আত্মীয়স্বজনের নাম চলে আসবে। কেন না, তারাও সমাজেরই মানুষ।

এদিকে, সরকারি বরাদ্দের সাইকেল নাতিকে দিয়ে পদ হারিয়েছেন ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা তাজুল ইসলাম। জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আব্দুল আওয়াল জানান, নৈতিক পদস্খলন ও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে তাজুল ইসলামকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সমালোচনার মুখে সাইকেলটি উপজেলা প্রশাসনকে ফেরত দেওয়া হয় এবং তা অন্য একজন উপকারভোগীকে দেওয়া হয়। গেল ঈদুল আজহায় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের টাকা বিতরণে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ ওঠে খুলনা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে। উপকারভোগীর তালিকায় আহসান হাবিব নামে এমপির একজন ভাগ্নে এবং তার ব্যক্তিগত সহকারী আবু ওবাইদার নাম ছিল। আরেক এমপি সংসদে বক্তব্য দিতে গিয়ে পর্দা, ওয়াশিং মেশিন ও ওভেন চান। স্পিকার মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদ এ নিয়ে বলেন, বিষয়টি সংসদে না বললে ভালো হতো। তবে এটি বলা এমন কোনো অপরাধ হয়নি। এটি তিনি নিজের জন্য চাননি, সব সংসদ সদস্যদের জন্যই বলেছেন।

এসব ঘটনায় বেশ সমালোচনার মুখে পড়ে জামায়াত। সংসদে সরকারি দলের সদস্যরা এ নিয়ে বক্তব্য দেন। ঘটনাগুলো নিয়ে সভা-সেমিনার, টিভি টকশো কিংবা সামাজিক মাধ্যমে সব জায়গায় আলোচনা-সমালোচনার খোরাক জোগায়। এর মধ্যে দুটি ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়েছে জামায়াত। সরকারি সাইকেল নাতিকে দেওয়া উপজেলা আমিরকে পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছে। আর নড়াইলের ঘটনায় এমপির পিএসকে বরখাস্ত করার পাশাপাশি এমপিকেও সতর্ক করা হয়েছে। পর্দা, ওভেন চাওয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট এমপিকে মৌখিকভাবে সতর্ক করেছে। তবে এটাকে ‘বড় ভুল’ হিসেবে দেখেনি দলটি।

জামায়াত নেতারা বলছেন, এমপির চাচাতো বোনের জামাতা আগে থেকেই সংশ্লিষ্ট মসজিদের সভাপতি। সেই মসজিদে পুকুর ভরাট-সংক্রান্ত একটা বরাদ্দ সভাপতি হিসেবে তার নামে গেছে। মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে এমপিদের সুনাম ক্ষুন্নের চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।

আলাপকালে জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুটি ঘটনায় আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। এর বাইরে অনেক জায়গায় অতিরঞ্জিত করে অপ্রয়োজনীয় বিষয়ও আনা হয়েছে। সেগুলোও আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। তিনি বলেন, আমাদের এমপিদের দেওয়া বরাদ্দের টাকায় কেমন কাজ হয়েছে, তা অন্যদের সঙ্গে তুলনা করলেই বিষয়গুলো পরিষ্কার হয়ে যাবে। অনেক সময় কাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিতের জন্য নিজস্ব ও বিশ^স্ত লোকের প্রয়োজন হয়। বাইরের একটা লোক দিয়ে কাজ করানোর পর যদি কোনো অনিয়ম হয়, সেই দায় কে নেবে?

এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে দলীয় এমপিদের বিশেষ বার্তা দিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বিশেষ এই বার্তায় এমপিদের নৈতিক অবস্থান, স্বচ্ছতা ও জনআস্থা আরও সুদৃঢ় করার নির্দেশনা দিয়েছেন। সেখানে বলা হয়েছে, ‘সরকারি কোনো অনুদান, ঐচ্ছিক তহবিল, আর্থিক সহায়তা বা এ ধরনের যে কোনো সরকারি সুযোগ-সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে নিজের পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, পিএ-পিএস কিংবা তাদের আত্মীয়স্বজনদের প্রদান থেকে বিরত থাকবেন।’

এতে আরও বলা হয়, ‘সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অনুদান পাওয়ার যোগ্য বা প্রকৃত অর্থে অভাবগ্রস্ত হলেও সংসদ সদস্য হিসেবে আপনার সুপারিশ বা উদ্যোগে তাদের জন্য সরকারি অনুদান প্রদান না করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হচ্ছে। তবে, যদি এমন কোনো ব্যক্তি প্রকৃত অর্থেই সহযোগিতা পাওয়ার উপযুক্ত হন, তাহলে বিষয়টি সংগঠনের মাধ্যমে উপস্থাপন করলে দল যথাযথ ব্যবস্থা নেবে। এ প্রসঙ্গে আরও উল্লেখ্য যে, আপনার (এমপি) কোনো প্যাড বা ডিও লেটার অন্যের দ্বারা লিখিত হলে, কোনো কিছু সম্পূর্ণ না পড়ে স্বাক্ষর করবেন না।’

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের দেশ রূপান্তরকে বলেন, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্র থেকে শুরু করে সব পর্যায়ের নেতাকর্মী শৃঙ্খলা মেনে চলেন। এ নিয়ে আমরা প্রশিক্ষণও দিই। এরপরও দুয়েক জায়াগায় কিছু ঘটনা ঘটেছে। আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। এর ফলে অন্যরাও সতর্ক হবেন, তাদেরকে আলাদাভাবে চিঠিও দিয়েছি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত