দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বর্তমানে সহজেই ব্যাংকে টাকা জমা রাখা যাচ্ছে। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থও সহজে পৌঁছে যাচ্ছে সুবিধাভোগীদের কাছে। আবার ব্যাংকের শর্তাবলি পূরণের মাধ্যমে ঋণও পাচ্ছেন কেউ কেউ। হাতের নাগালে এসব ব্যাংকিং সুবিধা পেতে গ্রাহককে অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হচ্ছে না। একই সঙ্গে এজেন্ট ব্যাংকে পাওয়া যাচ্ছে ডেবিট কার্ডের সুবিধাও। সব মিলিয়ে গ্রামীণ জনপদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা, যা গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্র পাল্টাতে ভূমিকা রাখছে।
পরিচালন ব্যয় কম হওয়ায় ব্যাংকগুলোও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে বিশেষভাবে মনোযোগ দিচ্ছে। তাতে যেমন এজেন্ট, আউটলেটের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি অধিকসংখ্যক মানুষ আর্থিক সেবার আওতায় আসছে; তেমনি বাড়ছে লেনদেনের পরিমাণও। বছরের ব্যবধানে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে হিসাব বেড়েছে ৩৯ লাখ ২ হাজার ৩৭৭টি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৩১টি ব্যাংকে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম সেবা চালু রয়েছে। গত সেপ্টেম্বর শেষে এজেন্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৫৩৯টি, আর এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৪৪৮টি। ২০২২ সালের একই সময়ে এজেন্টের পরিমাণ ছিল ১৪ হাজার ৭১৬ এবং আউটলেট ছিল ২০ হাজার ২৩০টি। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে এজেন্টের সংখ্যা বেড়েছে ৮২৩টি এবং আউটলেট বেড়েছে ১ হাজার ২১৮টি। এসব এজেন্ট ও আউটলেটের প্রায় ৮০ শতাংশই গ্রামে। গ্রামীণ অঞ্চলে এসব ব্যাংকিং শাখা বৃদ্ধি পাওয়ায় বেড়েছে লেনদেন, চাঙা হচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতি।
এজেন্ট ব্যাংকিং বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, এজেন্ট ব্যাংকিং শুরু থেকেই গ্রামীণ মানুষের প্রতি ফোকাস করে আসছে। ব্যাংকিং সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় তারা ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিচ্ছে। এতে গ্রামীণ মানুষ সহজেই মূলধারার অর্থনীতিতে যুক্ত হচ্ছে। ব্যাংকিং খাতের বাকি নিয়ম মেনে এজেন্ট ব্যাংকিং এগিয়ে যেতে পারলে গ্রামীণ অঞ্চলের সামষ্টিক অর্থনীতিতে বেশ ভূমিকা রাখবে।
ব্যাংকিং শাখার পরিধি আরও বিস্তৃত করতে দেশে ২০১৪ এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের উদ্ভাবন ঘটে। ব্যাংকিং সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কাছে সীমিত পরিসরে ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবা পৌঁছানোই হয়ে ওঠে এই ব্যাংকিংয়ের মূল্য উদ্দেশ্য। তাতে যেমন ব্যাংকের অতিরিক্ত শাখা নির্মাণ, অবকাঠামো ব্যয়সহ নানা খরচ কমেছে; তেমনি দেশজুড়ে বেড়েছে ব্যাংকিং সহজলভ্যতা। ফলে হাতের নাগালে পাওয়া ব্যাংকিং সেবায় বেড়েছে গ্রামীণ মানুষের আমানত।
সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে আমানতের হিসাবসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৬ লাখ ৮৩ হাজার ৬২৮। এসব অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বরে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে আমানত জমেছে ৩৪ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা। যেখানে গত বছরের একই সময় পর্যন্ত এই খাতে আমানত ছিল ৩০ হাজার ৩২৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে ৪ হাজার ২০৮ কোটি টাকা আমানত বেড়েছে। অবশ্য আমানত বৃদ্ধিতে গ্রামের মানুষের অবদান বেশি। শহরের মানুষের তুলনায় গ্রামের মানুষের ডিপোজিট হিসাবের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৬ গুণ বেশি।
জানতে চাইলে ব্র্যাক ব্যাংকের অলটারনেট ব্যাংকিং চ্যানেলের প্রধান নাজমুর রহিম বলেন, গ্রামীণ এলাকায় দরিদ্র গ্রাহকদের কাছে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছানো আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রায় অসম্ভব, কারণ লেনদেনের সংখ্যা এবং পরিমাণ কম থাকায় শাখা স্থাপন করে খরচ বহন করা সম্ভব হয় না। এমন পরিবেশে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এজেন্ট নিয়োগ করে কম স্থাপনা খরচ ও পরিচালন ব্যয়ে নিম্ন আয়ের মানুষদের বিভিন্ন ধরনের ব্যাংকিং সেবা প্রদানের সুযোগ দানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মানুষ এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট থেকে খুব সহজেই ব্যাংকিং সেবা নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। তাদের নেই কোনো পরিবহন খরচ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে ব্যাংকিং করার জন্য শহরেও যেতে হচ্ছে না, বাড়ির পাশে খুব সহজেই ব্যাংকিং সেবা নিতে পারছে। আর এ চ্যানেলের মাধ্যমে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো খুব সহজেই কম খরচে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে পারছে।
অবশ্য আমানত বাড়লেও ঋণ বিতরণে বেশে পিছিয়ে এজেন্ট ব্যাংক। ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময় এগিয়ে থাকেন প্রাতিষ্ঠানিক গ্রাহকরা। ব্যক্তি গ্রাহকরাও ঋণ পেয়ে থাকেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে সাড়ে ৩৪ হাজার কোটি টাকা আমানতের বিপরীতে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে মাত্র ৬৭১ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ৬৮৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে ঋণ কমেছে ১৪ কোটি টাকা।
গ্রামীণ অঞ্চলে এজেন্ট ব্যাংকিং জনপ্রিয় হয়ে ওঠার পেছনের প্রধান কারণ রেমিট্যান্স সংগ্রহ। হাতের কাছে এই ব্যাংকিং সুবিধা পাওয়ায় মানুষ সানন্দে তা গ্রহণ করছে। তথ্যমতে, চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ৬ হাজার ৭৪৭ কোটি টাকা রেমিট্যান্স সংগ্রহ করা হয়। সেপ্টেম্বরে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে রেমিট্যান্স এসেছে ১ হাজার ৬৬১ কোটি টাকা। আগস্টে আসে ১ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা এবং গত জুলাই মাসে এজেন্টের মাধ্যমে রেমিট্যান্স এসেছিল ৩ হাজার ১০৯ কোটি টাকা।
