এজেন্টের মাধ্যমে পল্লী বিনিয়োগ

আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০২৩, ০২:১৪ পিএম

ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি প্রায় ২৪ বছর আগে ব্রাজিলে চালু হয়েছিল এজেন্ট ব্যাংকিং, যার সফলতায় ৯ বছর আগে বাংলাদেশেও যাত্রা শুরু হয়। মূলত প্রত্যন্ত অঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে আর্থিক সেবার আওতায় আনতেই এমন ব্যাংকিংয়ের প্রচলন। দেশে এজেন্ট ব্যাংকিং কীভাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে আর্থিক সেবার আওতায় আনছে, তার আদ্যোপান্ত দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন মনিরুল মওলা

ইসলামী ব্যাংকে প্রথম কবে, কোথা থেকে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু হয়েছিল?

একটি সুদবিহীন ও কল্যাণমুখী ব্যাংকিং ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি যাত্রা শুরু করে। ইসলামী ব্যাংক এই উদ্দেশ্য সামনে রেখে ৪০ বছর ধরে প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রান্তিক জনসাধারণকে অর্থনৈতিক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে তাদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে, যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ ইসলামী ব্যাংকের পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প। ২০১৩ সালে এজেন্ট ব্যাংকিং অনুমোদনের সুবাদে ইসলামী ব্যাংকের ব্যাংকিং কার্যক্রম সম্প্রসারণের ব্যাপক সুযোগ তৈরি হয়। ইসলামী ব্যাংক ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রমের উদ্যোগ নেয়। ২০১৮ সালে সাভারের বিরুলিয়ায় প্রথম এজেন্ট ব্যাংকিং চালু করে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং সারা দেশে ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করে। এজেন্ট ব্যাংকের কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাংকিং সুবিধা পৌঁছানো, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে আর্থিক সিস্টেমে অন্তর্ভুক্তি করা, স্বল্প পরিচালন ব্যয়, বর্ধিত গ্রাহক সুবিধা, প্রযুক্তি উন্নয়ন, দ্রুত বাজার অনুপ্রবেশ, সর্বোপরি জাতীয় উন্নয়নের লক্ষ্যে এই সেবা চালু হয়।

এজেন্ট ব্যাংকিং শুরুর চ্যালেঞ্জগুলো কেমন ছিল?

ইসলামী ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের আস্থা ও জনপ্রিয়তার কারণে এজেন্ট ব্যাংক শুরু থেকেই বেশ সাড়া পেয়েছে। গ্রাহক আস্থার সঙ্গে শুরু থেকেই এজেন্ট ব্যাংকে লেনদেন করে আসছে। মাত্র ছয় বছরের মধ্যে ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট আউটলেটের সংখ্যা ২ হাজার ৭৪১ উন্নীত হয়েছে। আরও প্রায় ৭০টি নতুন এজেন্ট আউটলেট প্রক্রিয়াধীন আছে। এজেন্ট মালিক হতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রণীত আইন ও শর্তাবলি মেনে যাবতীয় কাজ স¤পাদন করতে হবে।

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে গ্রাহকদের নিরাপত্তা কতটুকু?

এজেন্ট ব্যাংকে গ্রাহকের আমানত শতভাগ নিরাপদ। লেনদেনের সময় টু ফ্যাক্টর অথেনটিকেশনের মাধ্যমে লেনদেন নিশ্চিত করা, জাতীয় পরিচয়পত্র, পিন কোড, বায়োমেট্রিক ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে গ্রাহকের আমাতন ও লেনদেন শতভাগ নিশ্চিত করা হয়। ইসলামী ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রদত্ত সব নিয়মকানুন মেনে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করে।

এখন পর্যন্ত দেশের কতটি উপজেলায় আপনাদের এজেন্ট ছড়িয়ে পড়েছে? দৈনিক কেমন লেনদেন হচ্ছে ?

ইসলামী ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং দেশব্যাপী ৪৬৮টি উপজেলায় আধুনিক ব্যাংকিং সেবা প্রদান করছে। আমাদের এজেন্ট আউটলেটগুলোতে এখন পর্যন্ত ৪২ লাখ ১০ হাজার হিসাব খোলা হয়েছে, যেখানে জমার পরিমাণ ১৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা। ইতিমধ্যে ৫৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ বিতরণ করা হয়েছে ইসলামী ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। রেমিট্যান্স আহরণ ও আমানতের পরিমাণ বিবেচনায় ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং দেশের শীর্ষ অবস্থানে। তৃণমূল ব্যাংকিং সেবার অন্য একটি মাধ্যম হলো এজেন্ট ব্যাংকিং ব্যবস্থা। ইসলামী ব্যাংকের এজেন্টগুলোর দৈনিক লেনদেন প্রায় এক হাজার কোটি টাকা এবং দৈনিক রেমিট্যান্স সরবরাহ প্রায় ৮০ কোটি টাকা।

ভবিষ্যতে এজেন্টরা আর কী কী সেবায় যুক্ত হতে পারেন?

সূচনালগ্ন থেকে ইসলামী ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং গ্রাহকদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন সেবা প্রদানে প্রতিনিয়ত নতুনত্ব নিয়ে আসছে। সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিভিন্ন প্রোডাক্ট চালু করা হয়েছে। ক্ষুধা ও দরিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ গঠনে গ্রাম ও শহরাঞ্চলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে এজেন্ট ব্যাংকিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ইতিমধ্যে এজেন্ট ব্যাংকের সেবার মান ও কার্যক্রমের পরিসর বাড়ানোর লক্ষ্যে ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নানান পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এজেন্ট ব্যাংকিং সেবার আধুনিকায়ন, এটুআইয়ের সঙ্গে স¤পৃক্ত হয়ে সব ধরনের ইউটিলিটি বিল ও পেমেন্ট সেবা প্রদান, পার্সোনাল রিটেইল অ্যাকাউন্ট চালু এবং বাংলা কিউআর কোডের মাধ্যমে সেবা নিশ্চিত, গ্রাহকদের শতভাগ ডিজিটাল কানেকটিভিটি বৃদ্ধি, ফার্স্ট মুভিং কনজুমার গুডস কো¤পানি ও অন্যান্য কো¤পানির এপিআইকেন্দ্রিক অনলাইন লেনদেনের উদ্যোগসহ বিভিন্ন প্রকল্প এজেন্ট ব্যাংকিং জগতে নতুন দ্বার উন্মোচন করবে।

ডিজিটাল ব্যাংক কি এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের গুরুত্ব কমিয়ে দিতে পারে?

কাগজে-কলমের ঝামেলাবিহীন এক নতুন যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে ব্যাংক। তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নে অনেকটাই বাস্তবায়ন হয়েছে লেনদেন কার্যক্রম ডিজিটাল করার উদ্যোগ। প্রান্তিক পর্যায়ের জনগণকে ব্যাংক নেটওয়ার্কের মধ্যে নিয়ে আসতে ইতিমধ্যে ডিজিটাল ব্যাংক স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আমাদের দেশে অনেক মানুষ আছে, যাদের ছোট আকারের ঋণের প্রয়োজন হয় কিন্তু কাগুজে ঝামেলার কারণে ব্যাংকে যেতে চান না। এই জনগোষ্ঠীকে স্মার্টফোন ব্যবহারের মাধ্যমে সহজ সেবা দেবে ডিজিটাল ব্যাংক। যেহেতু ডিজিটাল ব্যাংকের ফিজিক্যাল কোনো অবস্থান নেই, সে ক্ষেত্রে লেনদেনের জন্য কাস্টমারকে অবশ্যই যেকোনো ব্যাংকিং পয়েন্টে যেতেই হবে। ব্যাংকের মূল শাখা-উপশাখাগুলোর দূরবর্তী অবস্থানের কারণে গ্রাহকের তাৎক্ষণিক সেবা নিশ্চিত হয় না। ডিজিটাল ব্যাংকের কাস্টমারদের তাৎক্ষণিক সেবা পেতে নিকটবর্তী এজেন্ট আউটলেটগুলোর শরণাপন্ন হতে হবে। আমরা মনে করি, ডিজিটাল ব্যাংকিং সিস্টেম বিকাশের ফলে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের কার্যক্রম ও ব্যাপ্তি আরও বেগবান হবে।

এজেন্টদের মাধ্যমে এসএমই ঋণ কার্যক্রম বাড়ানোর পরিকল্পনা আছে কি?

এজেন্টদের মাধ্যমে এসএমই ঋণ কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্যে ইসলামী ব্যাংকের কার্যকর পরিকল্পনা চলমান রয়েছে। পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প (আরডিএস) একটি জনপ্রিয়, জনকল্যাণমূলক এবং সফল প্রকল্প। এর মাধ্যমে এজেন্ট আউটলেটগুলো দেশব্যাপী ক্ষুদ্র বিনিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে ১৩৮টি এজেন্ট আউটলেটে এ প্রকল্পের আওতায় আমরা বিনিয়োগ বিতরণ শুরু করেছি। ২০২৪ সালে দেশের সব এজেন্ট আউটলেটের মাধ্যমে পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের বিনিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বড় সফলতার জন্য আর কী কী পদক্ষেপ নেওয়া দরকার?

ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংক সাত বছর ধরে বাংলাদেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। এর পেছনে এজেন্ট আউটগুলোর গুণগতমান রক্ষার প্রচেষ্টা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, আন্তরিকতা এবং নিরলস পরিশ্রম অনন্য শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। ২০২৩ সালে আমাদের এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে গ্রাহকদের ১২ হাজার ১০০ কোটি টাকা রেমিট্যান্স পাঠানো হয়েছে, যা বাংলাদেশের এজেন্ট ব্যাংকের মাধ্যমে আহরিত রেমিট্যান্সের ৬০ শতাংশের বেশি। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে দেড় লাখ গ্রাহক ইসলামী ব্যাংকের এজেন্টের মাধ্যমে সেবা গ্রহণ করছে। পজ মেশিন দিয়ে অন্য ব্যাংকের কার্ডে নগদ টাকা উত্তোলন, ই-কেওয়াসি কার্যক্রমকে জোরদার, সেলফিনের মাধ্যমে ক্যাশ ইন ও ক্যাশ আউট সামাজিক সুরক্ষা ভাতাসহ বিভিন্ন ইউটিলিটি বিল ও ইন্স্যুরেন্স প্রিমিয়াম সংগ্রহের ব্যাপক সম্প্রসারণ, পার্সোনাল রিটেইল অ্যাকাউন্ট বা মাইক্রো মার্চেন্ট হিসাব খোলা, কিউআর কোডসহ অন্যান্য লেনদেন পরিচালনার সক্ষমতা ইত্যাদি পদক্ষেপগুলো বাংলাদেশের এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত