আরও প্রান্তিকে যাবে আর্থিক সেবা

আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০২৩, ০২:১১ পিএম

ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও, মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসি অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া এবং সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে যারা গ্রামীণ পরিবেশে এবং ব্যাংকিং অবকাঠামো থেকে অনেক দূরে বসবাস করে তাদের ব্যাংকিং পরিষেবার আওতাভুক্ত করার লক্ষ্যে, বাংলাদেশে ২০১৩ সালে প্রথমবারের মতো ‘এজেন্ট ব্যাংকিং’ নামক যুগান্তকারী এই ব্যাংকিং ব্যবস্থাটি চালু হয়। সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই, ‘হাতের নাগালে ব্যাংকিং’ঠান্ডা স্লোগানে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে আমরা পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম এ সেবার উদ্বোধন করি। করোনার থাবায় যখন পুরো বিশ্ব টালমাটাল, ঠিক এমন একটি সময়ে অর্থাৎ ২০২০ সালের জুন মাসে আমরা এ সেবা পুরোপুরিভাবে চালু করি। আমাদের এজেন্ট ব্যাংকিং বিভাগের নিরলস প্রচেষ্টায় আমরা এখন পর্যন্ত ১৮৭টি এজেন্ট আউটলেট উদ্বোধন করতে পেরেছি।

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের শুরুর দিকে মূলত গ্রাহকদের আস্থা অর্জন করাই অন্যতম চ্যালেঞ্জ ছিল। যেহেতু তৃতীয়পক্ষ দিয়ে ব্যাংকিং সেবা দেওয়া হবে। পাশাপাশি ব্যাংকের সুনামের দিকটিও মাথায় রেখে যথাযথ এজেন্ট নিয়োগ করাটাও একটা বিশাল চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া কমপ্লায়েন্স ইস্যুটাও সতর্কতার সঙ্গে মাথায় রাখতে হয়, যেহেতু এই ব্যাংকিং ব্যবস্থাটা প্রথাগত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে, সীমিত পরিসরে, একটা বিকল্প ব্যাংকিং অবকাঠামো।

যেকোনো নির্বাচিত এলাকার স্বনামধন্য, সচ্ছল এবং ন্যূনতম দুই বছরের ব্যবসায় অভিজ্ঞতাসম্পন্ন যেকোনো ব্যক্তি এজেন্ট ব্যাংকিং ব্যবসায় পরিচালনার জন্য আবেদন করতে পারেন। পাশাপাশি এনজিও অথবা ক্ষুদ্র এবং মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোও আমাদের এজেন্ট হওয়ার জন্য আবেদন করতে পারেন।

এজেন্ট ব্যাংকিং নিয়ে একটা প্রশ্ন এসে যায়। সেটা হলোঠান্ডা ব্যাংক থাকার পরও কেন তৃতীয়পক্ষ দিয়ে সেবা চালু হলো। এমন প্রশ্নে আমরা যেটা বলে থাকি তা হচ্ছে, আপনার যদি অর্ধশত জাহাজ থাকে তবু কি আপনার ডিঙি নৌকার প্রয়োজন পড়বে না? অবশ্যই পড়বে। জাহাজ যেখানে পৌঁছাবে না সেখানে ডিঙি নৌকার দরকার হবে এবং সেই ডিঙি নৌকা আপনাকে ভাড়া করতে হবে, কারণ যারা জাহাজ তৈরি করে তাদের ডিঙি নৌকা তৈরি করার সম্ভাবনা ক্ষীণ। প্রয়োজন শুধু জাহাজ এবং ডিঙি নৌকাগুলোকে একই দিকনির্দেশনায় কাজ করা। ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশনের বা আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ব্যাপারটা তেমনি। কারওয়ান বাজারে সবজির আড়ত আছে বলেই আপনার বাসার পাশে বাজারের কোনো প্রয়োজন নেই ব্যাপারটা কিন্তু তা নয় অথবা আপনার বাসার পাশে বাজার আছে বলে আপনার গলির মুখে ভ্যানে করে কেউ সবজি বিক্রি করবে না, তাও কিন্তু ভাবা ঠিক নয়। প্রয়োজন ও ব্যবহারিক উপযোগিতার ভিন্নতা অনুযায়ী ব্যাংকিং অবকাঠামোরও ভিন্নতা দরকার।

পরিচালন ব্যয় কমাতে সহায়তা করছে

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে একদিকে যেমন সুবিধাবঞ্চিতদের সেবা দেওয়া যাচ্ছে, অন্যদিকে এ সেবায় ব্যাংকগুলোর পরিচালন ব্যয়ও কমে যাচ্ছে। যেসব এলাকায় ব্যাংকের শাখা বা উপশাখা স্থাপন কস্ট ইফেক্টিভ না, সেসব এলাকায় এজেন্ট আউটলেট প্রতিষ্ঠা করে ব্যাংকগুলো তাদের পরিচালন ব্যয় কমাতে পারে। আর এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মডেলটি এমনভাবে তৈরিঠান্ডা চলো ব্যয় ভাগ করি এবং আয় ভাগ করি। ফলে ব্যাংক ও এজেন্ট আউটলেট মালিকরা সব সময় হয়তো ‘উইন-উইন’ নয়তো ‘লুজ-লুজ’ কন্ডিশনে থাকে। এখানে ‘উইন-লুজ’ কোনো কম্বিনেশন হয় না। তাই এটি ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামো, রক্ষণাবেক্ষণও অন্যান্য উচ্চমূলধন জাতীয় বিনিয়োগে খরচ কমাতে সহায়তা করছে।

আরও যেসব সেবায় যুক্ত হতে পারে

আমরা গ্রাহকসেবার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে অচিরেই ইসলামি ব্যাংকিং সেবা চালু করতে যাচ্ছি। পাশাপাশি কৃষিঋণ বিতরণের কার্যক্রম শুরু করা হবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী এবং জননেত্রী শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নকে আরও বেশি বেগবান করার লক্ষ্যে, ভবিষ্যতে আমাদের এজেন্ট ব্যাংকিং গ্রাহকদের, আমাদের ডিজিটাল ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্ম এমবিএল রেইনবোতে সংযুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। যদি আমরা তা সফলভাবে সংযুক্ত করতে পারি, তবে আমাদের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর হাতের মুঠোয় চলে আসবে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের এক নতুন দিগন্ত।

তখন গ্রাহকরা স্মার্টফোনের অ্যাপস ব্যবহারের মাধ্যমে ঘরে বসেই বিইএফটিএন এবং আরটিজিএস সেবার মাধ্যমে দেশের যেকোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা জমা করতে পারবেন। পাশাপাশি অনলাইনে কেনাকাটা করতে পারবেন, মোবাইল ফোনে টপআপ করতে পারবেন, ঘরে বসেই দেশের যেকোনো প্রান্তে টাকা পাঠাতে পারবেন, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের যেকোনো অ্যাকাউন্টে টাকা জমা করতে পারবেন, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের যেকোনো শাখা থেকে এজেন্ট ব্যাংকিং গ্রাহকরা এই ডিজিটাল অ্যাপস ব্যবহার করে টাকা উত্তোলন করতে পারবেন, ডিপিএসের কিস্তি পরিশোধ, ক্রেডিট কার্ডের বিল পরিশোধসহ নানা রকম ইউটিলিটি বিল পরিশোধ করতে পারবেন। সুবিধাবঞ্চিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ডিজিটাল ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্ম-এমবিএল রেইনবোতে সংযুক্তি ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের জন্য একটা বড় মাইলফলক হবে!

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে গ্রাহক নিরাপত্তা

এজেন্ট ব্যাংকিং মূলত আঙুলের ছাপে ব্যাংকিং অর্থাৎ এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের কার্যক্রম সম্পূর্ণ বায়োমেট্রিক পদ্ধতির মাধ্যমে পরিচালিত হয়, ফলে গ্রাহকদের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। কারণ সবকিছু নকল করা সম্ভব হলেও আঙুলের ছাপ নকল করা খুবই কষ্টসাধ্য। এ ছাড়া আমাদের সিস্টেমে রয়েছে টু ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন, যা গ্রাহকদের দেবে একটি সম্পূর্ণ নিরাপদ ব্যাংকিংয়ের অভিজ্ঞতা। যদি গ্রাহক এজেন্টদের সঙ্গে ব্যাংকিং নিয়মবহির্ভূতভাবে কোনো লেনদেনে না জড়ায় এবং প্রতিটি লেনদেন সিস্টেম জেনারেটেড প্রিন্টেড সিøপের সঙ্গে এসএমএসের ট্রানজেকশন আইডি মিলিয়ে নেয়, তবে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে লেনদেন সম্পূর্ণ নিরাপদ। মনে রাখতে হবে, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে লেনদেনের ক্ষেত্রে হাতে লেখা কোনো রসিদ গ্রহণযোগ্য নয়, সেটাতে যে সিলই ব্যবহার করা হোক না কেন।

ডিজিটাল ব্যাংকের পরিপূরক হবে

আমরা মনে করি ডিজিটাল ব্যাংকের সঙ্গে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের সম্পর্ক পরিপূরক হবে, পরিবর্তক নয়। আপনারা হয়তো জেনে থাকবেন, ডিজিটাল ব্যাংকের কোনো শাখা, উপশাখা, এটিএম কিংবা স্বতন্ত্র কোনো এজেন্ট চ্যানেল থাকবে না। তাহলে ডিজিটাল ব্যাংকের গ্রাহকদের অর্থ জমা এবং উত্তোলনের জন্য বর্তমানে প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকগুলোর শাখা, উপশাখা, এজেন্ট আউটলেট এবং এটিএম নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভর করতে হবে। তাই আমি মনে করি, ডিজিটাল ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের জন্য একটা নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

উপজেলা ছাড়িয়ে আরও প্রান্তিকে যাবে সেবা

আমরা এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরুর ক্রমানুসারে ২৩তম ব্যাংক হিসেবে যাত্রা শুরু করি। সে হিসেবে আমরা বাজারে এখনো নবীন, তবে সম্ভাবনাময়। কারণ এই অল্প কয়েক বছরেই আমাদের কাস্টমারদের দৈনিক লেনদেন গড়ে তিন কোটি টাকা অতিক্রম করেছে। বর্তমানে সারা দেশে আমাদের ৫০ হাজারের বেশি গ্রাহক রয়েছে।

আমাদের এজেন্টগুলো সব এক্সক্লুসিভ আউটলেট। মানে আমাদের শপ ইন শপ কোনো আউটলেট নেই, পাশাপাশি ৪০০ বর্গফুটের নিচে এবং পাকা ছাদ না হলে আমরা সাধারণত এজেন্ট আউটলেট অনুমোদন করি না। তবু, বর্তমানে আমাদের ১১০টি উপজেলায় এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের এজেন্ট রয়েছে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে চাই, বর্তমানে আমাদের পার্বত্য জেলাতেও এজেন্ট রয়েছে এবং আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হচ্ছে দেশের প্রতিটি হাটবাজার এবং মৌজায় পৌঁছে যাওয়া।

আরও যেসব পদক্ষেপ নিতে হবে

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ক্ষুদ্র, মাঝারি এবং কৃষিঋণ প্রদানকে আরও বেগবান করতে হবে। এতে করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী মহাজনদের হাত থেকে রক্ষা পাবে এবং অর্থনীতি আরও বেগবান হবে। পাশাপাশি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা প্রদানের মাধ্যমে সঞ্চয়ে উৎসাহিত করতে হবে। এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয়ই, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালিকণা ও বিন্দু বিন্দু জলের মতো গঠন করবে আমাদের দেশের সামগ্রিক সঞ্চয়কে এবং এই সঞ্চয় বৃদ্ধি আবার ত্বরান্বিত করবে সামগ্রিক মূলধন গঠন ও বিনিয়োগকে। তা ছাড়া এজেন্ট ব্যাংকিংকে পুরোপুরি ব্যাংকিং সুবিধাসহ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া এখন সময়ের দাবি। ৯ বছরে ব্যাংক গ্রাহকদের একটি বড় অংশ এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে যুক্ত হয়েছে। কারণ এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের অধিকাংশ গ্রাহকই ব্যাংকিং সুবিধাবঞ্চিত। তারা এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমেই ব্যাংক বা ব্যাংকিং বুঝতে পারে। তাই এটা বলা যায়, গত ৯ বছরে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের গ্রাহকদের একটা বড় অংশ মূল ব্যাংকিং অবকাঠামোতে যুক্ত হয়েছে, যাদের আমরা প্রথাগত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যুক্ত করতে পারতাম না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত