আশ্বাসে ভোটের মিছিলে জাপা

আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০২৩, ১০:১০ পিএম

নানা জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে নির্বাচনে যাওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি। গতকাল বুধবার বিকেলে বনানীতে জাপার চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দেন দলটির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু।

জাতীয় পার্টির দায়িত্বশীল সূত্রে জানা যায়, কয়েক দিন ধরে তারা সরকারের সঙ্গে বিভিন্নভাবে আলাপ-আলোচনা করেছে। যেহেতু বিএনপি নির্বাচনে যাচ্ছে না তাই দলটি এককভাবে ৩০০ আসনে লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করবে। সরকারের সঙ্গে আসন ছাড়ের বিষয়ে তাদের একটি সমঝোতা হয়েছে বলে দাবি করছেন তারা। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম সংসদ নির্বাচনের মতো এবারও বেশ কিছু আসনে ছাড় পাওয়ার নিশ্চয়তায় নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে দলটি।

জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন ও সরকারের সঙ্গে আমাদের আলোচনা হয়েছে। তারা স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের নিশ্চয়তা দিয়েছে। এর বাইরেও বিভিন্ন মহলে আমাদের আলোচনা হয়েছে, সবাই আশ^স্ত করেছেন নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে। তাদের আশ্বাসে আমাদের চেয়ারম্যান জি এম কাদের দলের নেতাদের সঙ্গে মিটিং করে নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’

বিভিন্ন মহলের পরিচয় জানতে চাইলে তিনি নাম উল্লেখ করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘তারা যদি আশ্বাস রক্ষা না করে তাহলে আমরা তো সিদ্ধান্ত নিতে পারব। আমাদের হাতে সেই সুযোগ আছে। কোনো জোট কিংবা মহাজোটে নয় আমরা এককভাবে ৩০০ আসনে প্রার্থী দেব।’ এ ক্ষেত্রে অনেকের জামানাত বাজেয়াপ্তের আশঙ্কা থাকে কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে জনগণ এবার জাপাকে ভোট দেবে। বাকিটা সময় বলে দেবে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জি এম কাদেরের ঘনিষ্ঠ এক নেতা বলেন, ‘সরকারের সঙ্গে বেশ কিছু আলোচনা চলছে। আমাদের নির্দিষ্ট কিছু আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী দেবে না। আমাদের দাবি ছিল ৪০-৫০টা কিন্তু এ ক্ষেত্রে ২০-২৫টায় ছাড় পাওয়া এবং বাকি আসনে প্রতিদ্বন্ধীতা করা হতে পারে। এখনো কোনো আলোচনাই চূড়ান্ত নয়। এ ক্ষেত্রে আরও আলোচনা হবে।’

২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে ২০১৪ ও ২০১৮-এর নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা করেই নির্বাচন করছে জাতীয় পার্টি। কখনো মহাজোট গঠন হয়েছে আবার কখনো সমঝোতার ভিত্তিতে আলাদা নির্বাচন করছে। ২০১৪ সালে দশম সংসদ নির্বাচন বিএনপি বর্জন করলে জাপা ১৪ দলের বাইরে থেকে নির্বাচন করে। এ ক্ষেত্রে জোটে না থাকলেও তারা প্রার্থী হয়েছে, এমন ৩৪টি আসনে প্রার্থী দেয়নি আওয়ামী লীগ। এরপর তারা বিরোধী দলের আসনে বসে। একই কায়দায় এবারও সমঝোতার একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু যেকোনো নাটকীয়তায় যদি শেষ মুহুর্তে বিএনপি নির্বাচনে আসে তাহলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে মহাজোটে যাবে জাতীয় পার্টি।

দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে একটা কথা প্রচলিত, যখনই নির্বাচন সামনে আসবে, তখন জাতীয় পার্টির অভ্যন্তরীণ দ্ব›দ্ব বাড়বে এবং রাজনীতিতে জাতীয় পার্টি ফ্যাক্টর হয়ে উঠবে। অনেকেই উপহাস করে বলেন, কী করে ‘সরকারি বিরোধী দল’ হতে হয় তার নজির স্থাপন করেছে জাতীয় পার্টি। জাতীয় পার্টির ধারাবাহিক এই নাটকীয়তা দ্বাদশ নির্বাচনেও চলমান। নির্বাচনে যাওয়ার চ‚ড়ান্ত ঘোষণা দিলেও গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত মনোনয়ন ফরম কেনেননি জাতীয় পার্টির প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ ও তার ছেলে সাদ এরশাদ। শেষ মুহুর্তে চলছে তাদের উভয় গ্রুপের নানা হিসাব-নিকাশ।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে রওশনপন্থি এক নেতা জানান, জিএম কাদের-রওশন এরশাদের মধ্যে সমঝোতার ফলে নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে জাপা। নির্বাচনে যাওয়ার বিষয়ে একমত হলেও রংপুর-৩ আসনে সাদ নাকি জিএম কাদের নির্বাচন করবেন এবং জাতীয় পার্টি থেকে বহিষ্কৃত নেতাদের ফিরিয়ে নেওয়ার প্রশ্নে মতৈক্যে পৌঁছাতে পারছেন না তারা। দ্রুত সময়ের মধ্যেই সমঝোতা হবে বলে নিশ্চিত করেন তিনি।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৫১০টি মনোনয়ন ফরম বিতরণ করা হয়েছে। ২০ নভেম্বর ৫৫৭টি, ২১ নভেম্বর ৬২২টি এবং ২২ নভেম্বর ৩৩১টি মনোনয়ন ফরম বিতরণ করা হয়েছে। আজ জাপার মনোনয়ন বিক্রির শেষ দিন। তবে জাপা ইতিমধ্যে রওশন এরশাদের জন্য ময়মনসিংহ-৪  আসনের একটা মনোনয়ন ফরম তুলে রেখেছে।

জানতে চাইলে জাতীয় পার্টির সংরক্ষিত আসনের এমপি ও রওশন এরশাদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত অধ্যক্ষ রওশন আরা মান্নান বলেন, দুই-তিন দিনের মধ্যে একটা সমঝোতা হতে পারে। ইতিমধ্যে রওশন-জিএম কাদের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করছেন। 

জাপা সূত্রে জানা যায়, দ্বাদশ নির্বাচনে রংপুর-৩ আসন থেকে প্রার্থী হতে চান জিএম কাদের। কেননা এ আসন থেকে সব সময় এরশাদ নির্বাচন করেছেন। এরশাদের বাড়ির আসন হওয়ায় এখানকার সাধারণ ভোটাররাও লাঙ্গলে ভোট দেন। ফলে তুলনামূলকভাবে সহজে জেতা যাবে। অন্যদিকে জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে এ আসনে নির্বাচন করা গৌরবের। জিএম কাদের মূলত এই আসনে নির্বাচন করে দলের চালিকাশক্তি নিজের হাতে নিতে চান। ইতিমধ্যে রংপুর-৩ ও ঢাকা-১৭ আসন থেকে মনোনয়ন কিনিছেন জিএম কাদের। কিন্তু রওশন এরশাদ চান এরশাদ-রওশনপুত্র সাদ এরশাদকে এই আসন থেকে প্রার্থী করতে। কেননা সাদের পক্ষে অন্য কোনো আসন থেকে নির্বাচন করে জয়লাভ করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে রওশনকে রংপুরের অন্য যেকোনো আসন থেকে বা ময়মনসিংহ থেকে সাদকে প্রার্থী করতে হবে। এ নিয়ে তারা কোনো সমঝোতায় আসতে পারেননি।

এ ছাড়া তাদের মধ্যে বহিষ্কৃত নেতাদের দলে ফেরানো নিয়েও তারা কোনো সমঝোতায় যেতে পারছেন না। জিএম কাদের মনে করেন, রওশনের সঙ্গে তার দ্ব›দ্ব ও জাতীয় পার্টির বিভক্তির মূলে এই গ্রুপটা কাজ করেছে। ফলে তাদের দলে ফেরালে মূল্য দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে তিনি ছাড় দিতে নারাজ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত