জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়া বা নিজে নিজে কিছু করার স্বপ্ন সবারই থাকে। কিন্তু সঠিক দিক নির্দেশনার অভাবে অনেক সুপ্ত প্রতিভা বিকশিত হয় না। তবে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে হলে চাই কঠোর পরিশ্রম, মনোবল এবং সঠিক দিক নির্দেশনা। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ‘জাতীয় যুব উদ্যোক্তা সম্মেলন ২০২৩’ আগত প্রতিষ্ঠিত উদ্যোক্তা, কর্পোরেট ব্যক্তিত্ব এবং সরকারি উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের বক্তব্যে এসব কথাই প্রতিফলিত হয়েছে।
আগত অতিথি বক্তাদের মধ্যে জীবনে সফলতা অর্জনের উপায় নিয়ে ভিন্ন মত ব্যক্ত করেন রূপায়ণ সিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এম মাহবুবুর রহমান।
তিনি বলেন, সফল উদ্যোক্তা বা প্রতিষ্ঠিত কর্পোরেট ব্যক্তিত্ব হতে হলে দৃঢ় সংকল্প নিয়ে এগোতে হয় ঠিকই, কিন্তু জীবনে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য নিজেকে ঢেলে সাজাতে হয়। আসলে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য স্বপ্নের জাল বুনতে হয়। নিজেকে যেভাবে দেখতে চাই, সেভাবে গড়তে হয়।
যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের এক উদ্ধৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘একজন হতাশাবাদী প্রতিটি সুযোগে অসুবিধা দেখেন; একজন আশাবাদী প্রতিটি অসুবিধায় সুযোগ দেখেন। অর্থাৎ সফলতা পেতে গেলে আশাবাদী হতে হবে এবং বিভিন্ন বিপর্যয়ের মধ্যেও সুযোগ খুঁজতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ঢাকাস্থ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে এগ্রিন ফাউন্ডেশনে আয়োজিত জাতীয় যুব উদ্যোক্তা সম্মেলন ২০২৩ এর ‘টেকসই রিয়েল এস্টেট আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে তরুণদের অনুপ্রাণিত করণ’ (Inspiring Youth to Lead the Sustainable Real Estate Movement) শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় প্যানেলিস্ট হিসেবে তিনি এসব কথা বলেন। দিনব্যাপী এ সম্মেলনের সার্বিক সহায়তা করেন সোসাইটি ফর বাংলাদেশ এগ্রিকালচারাল এক্সটেনশন নেটওয়ার্ক (বিএইএন)। আউটরিচ পার্টনার ছিল দিয়া আইএনসি।
এম মাহবুবুর রহমান বলেন, এখানে অনেক তরুণ উদ্যোক্তা বা অনেকে উদ্যোক্তা হবার বা জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবার বাসনা নিয়ে বসে আছে। তাদের চোখে আমি অনেক স্বপ্ন দেখতে পাচ্ছি। তারা এসেছে আমাদের কাছ থেকে কিছু না কিছু শুনতে যেটা তাদের জীবনে কোনো না কোনোভাবে কাজে লাগাতে পারে। কিছু উদাহরণ আমি সবার সাথে শেয়ার করতে চাই যাতে সবার জন্যে একটা ইতিবাচক অনুপ্রেরণা হতে পারে।
নিজের ক্যারিয়ার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে গিয়ে মাহবুবুর রহমান বলেন, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে ২০০১ সালে স্নাতক একই বিভাগ থেকে ২০০৩ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করি। তারপর ২০০৫ সালে জনপ্রিয় চাকরির বাইরে এসে চ্যালেঞ্জ নিয়ে আবাসন খাতে কর্মজীবন শুরু করি।
তিনি আরও বলেন, পড়াশোনা শেষ করে যখন চাকরির বাজারে প্রবেশ করি সেই সময়টাতে সরকারি চাকরি বা বহুজাতিক কোম্পানিগুলো চাকরি ছিল অনেক বেশি লোভনীয়। কিন্তু আমি অনাগত প্রজন্মের জন্য আরও ভালো সুযোগ তৈরি করার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে রিয়েল এস্টেট শিল্পের জন্য কাজ করা বেছে নিয়েছি।
মাহবুবুর রহমান বলেন, তাছাড়া আমার কাছে মনে হল এরকম একটা সেক্টরকে আমি বেছে নিই যে সেক্টরটা আসলে একটু পেছনের সারিতে আছে (সেই সময়ে)। যেখানে নিজেকে আমি একটা জায়গায় দেখতে পারব। আমি একটা লক্ষ্য স্থির করে নিলাম যে আগামী পনের থেকে ষোল বছরে আমি নিজেকে কোনো জায়গাই দেখতে চাই? অর্থাৎ নির্বাহী থেকে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। এই জায়গাটায় আসার জন্য আমার সময় লেগেছে ১৬ বছর। এই ষোলো বছরে রিয়েল এস্টেট সেক্টরের এমন কোনো বিভাগ নেই যে বিভাগে আমি হাতে কলমে কাজ করিনি বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, আমি সবসময় একজন ভালো দলের সদস্য, একজন ভালো সহকর্মী হতে চেয়েছি। সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া আদায় করে তিনি বলেন, বাবা-মার দোয়াও আমার জীবনে অনেক পাথেয়।
মাহবুবুর রহমান জানান, ২০২১ সালে রূপায়ণ সিটি উত্তরার দায়িত্ব নেওয়ার আগে রিয়েল এস্টেট সেক্টরের বিভিন্ন বিভাগ যেমন প্রশাসন, মানবসম্পদ, আবাসন প্রকল্পে লজিস্টিকস, বিজ্ঞাপন ও মুদ্রণ, ব্যবসা উন্নয়ন, ব্র্যান্ড এবং মার্কেটিং, গ্রাহকসেবা, অপারেশনস, বিক্রয় এবং রাজস্ব, আবাসনের নকশা উন্নয়নসহ বিভিন্ন বিভাগে তিনি কাজ করেছেন।
সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আপনাদের জন্য আমি আমার জায়গা থেকে যেটা বলতে চাই সেটা হলো পরিশ্রম করতে হবে। সাথে সাথে আপনি যেটা করবেন সেটার জন্য আপনাকে কৌশল অবলম্বন করতে হবে, এটাকে বলা হয় ‘ইন্সপাইর অ্যাকশন’ (Inspire action)। এর মানে হলো আপনি যেটা করতে চান সেটা আপনাকে কল্পনা বা সে জায়গায় যাওয়ার কল্পনা করার ক্ষমতা থাকতে হবে। আপনি প্রতিদিন অনুভব করবেন যে আপনি এটা হয়ে গেছেন। এই কল্পনাটা যখন আপনি খুব গতিশীল উপায়ে করতে পারবেন দেখবেন আপনি ওই জায়গাতে পৌঁছে গেছেন।
রিয়েলস্টেট শিল্পের সর্বকনিষ্ঠ সিইও মাহবুবুর রহমান বলেন, বর্তমান সময়ে আমাদের তরুণরা বাংলাদেশের রিয়েলস্টেট শিল্পে অন্যান্য বহুজাতিক কোম্পানির চেয়ে ভালো সুযোগ-সুবিধা অর্জন করতে পারছে। অর্থাৎ এই খাত সন্তোষজনক পেশায় পরিণত হয়েছে, নানা সুযোগ-সুবিধা বেড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও তাদের পাঠ্যসূচিতে এই বিষয় অন্তর্ভুক্ত করেছে। আমি বিশ্বাস করি, অদূর ভবিষ্যতে আবাসন শিল্প দেশে আরও বিকাশ লাভ করবে এবং তরুণদের এই শিল্পে উদ্যোগ নেওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে।’
উল্লেখ্য, দেশের একমাত্র প্রিমিয়াম মেগা গেটেড কমিউনিটি রূপায়ণ সিটি উত্তরার সিইও হিসেবে পদোন্নতি লাভের আগে তিনি একই প্রতিষ্ঠানের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এর আগে ২০১০-২০২১ সাল পর্যন্ত তিনি সানমার প্রোপার্টিস লিমিটেডে (ঢাকা ও চট্টগ্রাম) নির্বাহী পরিচালক পদে কর্মরত ছিলেন।
প্যানেল আলোচনায় প্যানেলিস্ট হিসেবে বিল্ডিং টেকনোলজিস অ্যান্ড আইডিয়াস লি. (বিটিআই) এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফয়জুর রহমান খান, জেসিএক্স ডেভেলপমেন্টস লি. এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এম. আরিফুর রহমান সজল বক্তব্য দেন। আলোচনা পর্বটি সঞ্চালনা করেন কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের স্কুল অফ বিজনেস এর প্রধান অধ্যাপক এস এম আরিফুজ্জামান।
‘যুব উদ্যোক্তা সম্মেলন ২০২৩’ মুখরত হয় ২০০ জনের অধিক উদীয়মান তরুণ উদ্যোক্তাদের আগমনে। দেশের ১৬টিরও বেশি সরকারি, বেসরকারি ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তা, বিজনেস এবং ক্যারিয়ার ক্লাব থেকে নির্বাচিত ২০০ সদস্য ও শিক্ষার্থীরা এতে অংশগ্রহণ করেন।
দেশের প্রতিষ্ঠিত উদ্যোক্তা, অভিজ্ঞ বক্তা এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ২০ আলোচক কৃষি, ই-কমার্স এবং রিয়েল এস্টেট সেক্টরের উপর তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। যেখানে এসএমই, টিম বিল্ডিং এবং নেটওয়ার্কিং, পরিবেশগত স্থায়িত্ব, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, ব্যবসা এবং অর্থায়নের সুযোগ, বিক্রয়ের বৃদ্ধির কৌশল এবং ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স প্রভৃতি বিষয়ে আলোচনা প্রাধান্য পায়।
এছাড়া বিজনেস ডেভেলপমেন্ট, লজিস্টিক, সাপ্লাই চেইন, কাস্টমার সার্ভিস, অর্থায়ন, ব্র্যান্ড, মার্কেটিং, জনসংযোগসহ বিভিন্ন বিষয়ে সম্যক ধারণা দিতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে এক্সপার্টদের অংশগ্রহণে প্লেনারি সেশন অনুষ্ঠিত হয়।
