নির্বাচন নিয়ে ফের যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া পাল্টাপাল্টি

আপডেট : ২৬ নভেম্বর ২০২৩, ০৫:৩৭ এএম

বাংলাদেশের আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ফের রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাল্টাপাল্টি শুরু হয়েছে। এই নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয়তা এবং সাম্প্রতিক সময়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের ভূমিকা রয়েছে বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে রাশিয়ার পক্ষ থেকে। গত বুধবার রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে গত ২৮ অক্টোবর বিএনপির মহাসমাবেশ ও পরবর্তী আন্দোলন কর্মসূচির আগে রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের বিরোধীদলীয় এক নেতার সঙ্গে বৈঠক নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র পাল্টাবিবৃতি দিয়ে বলেছে, রাশিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য উপস্থাপন করেছে।

বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার পাল্টাপাল্টি বক্তব্য নিয়ে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনও সরব। এরই মধ্যে রাশিয়ার বক্তব্যের সমালোচনা করে বিবৃতি দিয়েছে বিএনপি। যাতে বলা হয়েছে, ‘রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের অনুভূতিতে আঘাত করেছে। মুখপাত্রের মন্তব্য একটি স্বচ্ছ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের জন্য বাংলাদেশের জনগণের আকাক্সক্ষা ও অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’

রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি লে. কর্নেল (অব) ফারুক খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে বিশ্বাসী। আমরা পর্যবেক্ষকদের আহ্বান জানিয়েছি। আশা করি যুক্তরাষ্ট্রও নির্বাচন দেখবে। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তারা তাদের বক্তব্য-বিবৃতি দিচ্ছে। তবে কোনো দেশের নির্বাচন অনুষ্ঠান তাদের নিজেদের বিষয়। এটা অবশ্যই বন্ধু দেশগুলো বুঝতে পারবে। তাদের বিরোধ বা বিবাদ নিয়ে আমাদের কোনো মন্তব্য নেই।’

কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো এবং রাশিয়া, চীন, ভারত বা অন্য অনেক দেশেরই আগ্রহের মূলে রয়েছে ভূ-রাজনৈতিক নানা স্বার্থ। এখানে বড় স্বার্থ হলো ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল। এ কারণেই বাংলাদেশের নির্বাচন তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন নিয়ে যেহেতু বিরোধী পক্ষের সব সময় অভিযোগ থাকে ফলে বিশ্বমোড়লরা কথা বলার সুযোগ পায়। তবে এর সমুচিত জবাব হলো শান্তিপূর্ণ, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দেওয়া।

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ওয়ালিউর রহমান বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার অবস্থান তাদের নিজস্ব গণতান্ত্রিক চর্চার প্রকাশ। যখন কোনো একটি দেশ আরেকটি দেশের নির্বাচন নিয়ে বেশি হস্তক্ষেপ করবে, তখন আরেকটি দেশ সে ব্যাপারে তাদের পর্যবেক্ষণ দিতেই পারে। বাংলাদেশের গণতন্ত্রও ৫৩ বছরে শক্তিশালী হয়েছে। বাংলাদেশ নিয়ে সবার এখন আগ্রহ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের চাপের বিষয়ে এর আগেও রাশিয়া মন্তব্য করেছিল। তারা বিষয়টি পছন্দ করেনি। চীন, ভারতও বলছে বাংলাদেশের নির্বাচন তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এবার যুক্তরাষ্ট্র অন্যবারের চেয়ে বেশি সক্রিয় ভূমিকায় গিয়েছে।’

এর আগেও বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে ওয়াশিংটনের সক্রিয়তার বিরুদ্ধে পরোক্ষভাবে মন্তব্য করেছে রাশিয়া। তারা (রাশিয়া) বলে এসেছে, বাংলাদেশের নির্বাচন তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। অন্য কোনো দেশের এতে নাক গলানো অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের শামিল।

কিন্তু গত বুধবার রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, রাষ্ট্রদূত পিটার হাস অক্টোবরের শেষের দিকে সরকারবিরোধী সমাবেশ আয়োজনের পরিকল্পনা নিয়ে বিরোধী পক্ষের একজন সদস্যের সঙ্গে দেখা করেন। তিনি বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে স্থূল হস্তক্ষেপের চেয়ে কম কিছু নয়।

রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই বক্তব্যের পর গতকাল শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে বলা হয়েছে, ইচ্ছাকৃতভাবে মারিয়া জাখারোভা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও পিটার হাসের বিভিন্ন বৈঠকের বিষয়াদি ভুলভাবে উপস্থাপন করেছেন। বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দলকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করে না। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের কোনো দলকে অগ্রাধিকার দেয় না।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘বাংলাদেশের জনগণ যা চায়, আমরও তাই চাই। আমরা চাই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন এবং শান্তিপূর্ণ একটি নির্বাচন। আমাদের ও বাংলাদেশের জনগণ উভয়ের লক্ষ্য হচ্ছে শান্তিপূর্ণ উপায়ে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তারা সরকার, বিরোধী দল, সুশীল সমাজ এবং অন্য অংশীজনদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলবে।’

গত বুধবার রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ের পর তাদের এক্স ও ফেসবুক অ্যাকাউন্টে জাখারোভার ব্রিফিংয়ের বিষয়টি তুলে ধরা হয়। এরপর গতকাল রাশিয়ার মুখপাত্রের পুরো বক্তব্য প্রকাশ করেছে ঢাকার রুশ দূতাবাস। যাতে উল্লেখ করা হয়, ব্রিফিংয়ে মারিয়া জাখারোভা বলেন, ‘খবর পাওয়া যায় যে, মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও বিরোধী দলের নেতা ওই বৈঠকে সরকারবিরোধী বড় প্রতিবাদ সমাবেশ করার পরিকল্পনা করেছেন। পিটার হাস ওই নেতাকে যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও অন্যান্য কয়েকটি দেশের পক্ষ থেকে সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেন। যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্ররা স্বচ্ছতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করার অজুহাতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে এবং এ বিষয়টি আমরা অনেকবার বলেছি। আমি আবার বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছি।’

মারিয়া জাখারোভা আরও বলেন, ‘মার্কিন রাষ্ট্রদূতের আচরণ নগ্নভাবে ভিয়েনা কনভেনশনের লঙ্ঘন। মার্কিন রাষ্ট্রদূতের আচরণ এটিকে ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের পক্ষ থেকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। রাশিয়ার মনে কোনো সন্দেহ নেই যে আগামী ৭ জানুয়ারির নির্বাচন বাংলাদেশ কর্র্তৃপক্ষ আইন অনুযায়ী, স্বাধীন এবং বিদেশিদের সহায়তা ছাড়াই করতে পারবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত