নিকলী উপজেলার প্রথম আলেম মাওলানা নূরুদ্দীন (রহ.)

আপডেট : ২৮ নভেম্বর ২০২৩, ০৯:১৫ এএম

নীরবে-নিভৃতে থেকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেসব আলেম কাজ করে গেছেন, তাদের অন্যতম হলেন- মাওলানা নূরুদ্দীন রহমাতুল্লাহি আলাইহি। নিজ এলাকা কিশোরগঞ্জের নিকলীতে তিনি বড় হুজুর নামে অধিক পরিচিত ছিলেন। তার হাত ধরে হাওর অঞ্চলে দূর হয়েছিল বিদাত-শিরকি কার্যকলাপ।

কিশোরগঞ্জ জেলার নিকলী উপজেলার পূর্ব-দক্ষিণ কোণে জলমগ্ন হাওরের বুক চিরে আবহমানকাল ধরে শির উঁচিয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে শ্যামলিমার আকার ছাতিরচর গ্রাম। ঘোড়াউত্রার অববাহিকায় অবস্থিত এই প্রত্যন্ত লোকালয়ে ভাটি এলাকার গৌরব এবং ছাতিরচর গ্রামের তথা নিকলী উপজেলার প্রথম ও প্রবীণ আলেমে দ্বীন মাওলানা নূরুদ্দীন বড় হুজুর (রহ.)। ২১ মার্চ ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে সম্ভ্রান্ত বংশে কাজী বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। বাবার নাম নোয়া গাজী, মায়ের নাম আলেকজান। এই দম্পতির ১২ সন্তানের (৮ ছেলে ৪ মেয়ে) সন্তানের মধ্যে মাওলানা নূরুদ্দীন (রহ.) ছিলেন দশম।

জীবনের শুরুতে প্রাথমিক পর্যায়ে বড় হজুর (রহ.) গ্রামের মক্তবে মৌলভী ইদ্রিছ আলী (রহ.)-এর কাছে পড়াশোনা করেন। ১৯৭৬ সালে ইটনা উপজেলায় ওস্তাদ মরহুম ছাইদুর রহমান কর্র্তৃক প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসায় ভর্তি হন। সেখানে আনুমানিক কিছুদিন পড়াশোনার পর উত্তরপাড়া জামে মসজিদের ইমামের মাধ্যমে তিনি উত্তর মির্জানগর কওমি মাদ্রাসা, রায়পুরা, নরসিংদীতে ভর্তি হন। সেখানে ২ বছর পড়াশোনা করে ভর্তি হন জামিয়া ইমদাদিয়া কিশোরগঞ্জে। ১৯৮৫ সালে তিনি জামিয়া ইমদাদিয়া থেকে দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেন। ১৯৮৬ সালে চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে ফুনূনাত সম্পন্ন করেন।

শিক্ষাজীবন শেষে নিজ গ্রামে ফিরে এসে এলাকাবাসীর সমর্থনে এবং সর্বোচ্চ সহযোগিতার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৮৭ সালে তিনি নিকলী উপজেলার প্রথম মাদ্রাসা ছাতিরচর মাদ্রাসায়ে ইমদাদিয়া দারুল উলুম প্রতিষ্ঠা করে মোহতামিমের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৮৮ সালের ১৭ জুন তিনি ছাতিরচরে হাজি দৌলত বেপারীর বাড়িতে ইব্রাহিম মিয়ার বড় মেয়ে নাছিমা আক্তারের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি ৪ মেয়ে ১ ছেলের জনক।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে ছাতিরচর মাদ্রাসায় ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সালে নদীভাঙনের কবলে পড়লে পাড়াবাজিতপুর স্থানান্তরিত হন। তখন তিনি দৌলতপুর মসজিদে কয়েক মাস ইমামতি করেন। পরে শাহপুর মাদ্রাসার মুহতামিমের দায়িত্ব নেন। এখানে বছর দুয়েক দায়িত্ব পালন শেষে করগাঁওয়ে আব্দুল জব্বার সাহেবের মাদ্রাসায় ১ বছর শিক্ষকতা করেন। ১৯৯৯ সালে কটিয়াদী উপজেলার চর মান্দালিয়ায় কর্নেলের মাদ্রাসায় যোগদান করে সেখানে ২০০৮ সাল পর্যন্ত টানা ৯ বছর সুনামের সঙ্গে মুহতামিমের দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালে পুনরায় ছাতিরচর মাদ্রাসায় মোহতামিম হিসেবে যোগদান করেন এবং আমৃত্যু তিনি নিজ হাতে প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসার খেদমতে নিয়োজিত ছিলেন।

ব্যক্তিজীবনে তিনি অত্যন্ত নম্র, ভদ্র, সৎ, নিষ্ঠাবান এবং পরোপকারী ছিলেন। খুব সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। তার চারিত্রের বৈশিষ্ট্যের অন্যতম দিক হলো- সততা। আমৃত্যু তিনি সৎ জিন্দেগি কাটিয়েছেন। তার এলাকার লোকজনের মুখে মুখে শোনা যায়, বড় হুজুর (রহ.) একজন পরোপকারী মানুষ ছিলেন।

মায়ের প্রতি সন্তানের সম্মান, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশে তিনি ছিলেন অনন্য স্বভাবের। বড় হুজুর (রহ.) মৃত্যুর আগ পর্যন্ত জন্মদাত্রী মাকে নিজের কাছে রেখেছেন। এভাবে শুধু নিজের পরিবারের প্রতি নয়, আমৃত্যু সব আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গেই সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন। আপাদমস্তক একজন নিরহংকারী মানুষ ছিলেন। নিকলী উপজেলার প্রথম আলেমে দীন হওয়া সত্ত্বেও তাকে কোনো প্রকারের অহংকার স্পর্শ করতে পারেনি। ছাতিরচর মাদ্রাসায়ে ইমদাদিয়া দারুল উলুম মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করার কারণে গ্রামের মানুষ তাকে প্রতিষ্ঠাতা বলে থাকেন। এক সাক্ষাৎকারে তাকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি প্রতিউত্তরে অকপটে জানান যে, ছাতিরচর মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা হলেন আমার গ্রামের আপামর জনসাধারণ। আমি কেবল একজন উদ্যোক্তা ছিলাম। গ্রামের সব মানুষ এবং আমিসহ আমার বন্ধু ও সহযোগীরা মিলে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছি।

ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি মেধা, বিচক্ষণতা ও সাহসিকতার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। মাদ্রাসা পরিচালনার পাশাপাশি সমাজে বিদ্যমান বিদআত ও শিরকি কর্মকা-সমূহ তিনি অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে মোকাবিলা করেন। ভ- পীরদের অনৈসলামিক কার্যকলাপসমূহকে সমাজ থেকে একেবারে নিশ্চিহ্ন করতে তিনি সাহসী ভূমিকা রাখেন। সমাজে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় তিনি সর্বদা সোচ্চার ছিলেন।

পরকালীন চিন্তা তাকে সবসময় দুনিয়াবিমুখ করে রাখত। দুনিয়ার সুখশান্তি, আরাম আয়েশি জীবনের চাকচিক্যময়তা তাকে কখনোই স্পর্শ করতে পারেনি। কথাবার্তায়, পোশাকে, আচরণে এমনকি আলোচনায়ও তা স্পষ্ট বুঝা যেত। তিনি দুনিয়াবি সবকিছুর ওপরে পরকালীন বিষয়কে প্রাধান্য দিতেন।

২০০৮ সালে তিনি ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত হন। ২০২০ সালে তিনি কিডনিসহ নানা রোগে আক্রান্ত হন। তখন থেকেই আমৃত্যু তিনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অধীনে চিকিৎসাধীন ছিলেন। চলতি বছরের ৬ সেপ্টেম্বর তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে কিশোরগঞ্জের সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ সেপ্টেম্বর রাত ১২টার দিকে ইন্তেকাল করেন। আল্লাহতায়ালা তার কবরকে জান্নাতের বাগানে পরিণত করুন। আমিন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত