আবাসিক শিক্ষকদের চেনেন না শিক্ষার্থীরা

আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০২৩, ১১:৫৩ এএম

বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাসহ সার্বিক বিষয়ের দেখভাল করার জন্য নিয়োগ দেওয়া হয় আবাসিক শিক্ষকদের। নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের অ্যাকাডেমিক, আবাসন সুবিধা নিশ্চিতকরণ, খাবারের মান পর্যবেক্ষণসহ যাবতীয় বিষয় দেখাশোনা করেন। বিনিময়ে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাও পেয়ে থাকেন। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের আবাসিক শিক্ষকদের বিরুদ্ধে এসব দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই চেনেন না তাদের। এবার বিষয়টিতে নজর দিয়ে কঠোর হওয়ার কথা জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শিক্ষকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীদের সার্বিক দেখভালের জন্য হলভেদে ১০-১৫ জন আবাসিক শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। যারা হলের বিভিন্ন ফ্লোর, ব্লক বা বিল্ডিংয়ের দায়িত্বে থাকেন। এসব শিক্ষকের জন্য বাসা বরাদ্দ থাকে, নির্ধারিত সম্মানী ও ভাতা পান, পদোন্নতির ক্ষেত্রেও প্রায়োরিটি পেয়ে থাকেন। এ ছাড়া পরবর্তী প্রভোস্টসহ প্রশাসনিক পদে যেতেও সহায়ক ভূমিকা রাখে এই অভিজ্ঞতা। আগে শিক্ষার্থীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অনেক কাজ করলেও বর্তমানে তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষার্থীরা; বিশেষ করে ছেলেদের হলগুলোতে পদটি যেন নামমাত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবাসিক শিক্ষকদের ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি নীতিমালা থাকলেও তা মেনে চলেন না বেশিরভাগ শিক্ষক। তবে ভিন্ন চিত্র দেখা যায় ছাত্রীদের সব হলে। দায়িত্বপ্রাপ্ত আবাসিক শিক্ষকরা নিয়মিত শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে থাকেন। কড়া নিয়ম ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় এই হলগুলোতে আবাসিক শিক্ষকদের ভূমিকা প্রশংসনীয়।

এ বিষয়ে অনীহার কারণ জানতে বিভিন্ন হলের বেশ কয়েকজন আবাসিক শিক্ষকের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা জানান, ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠন হলের মধ্যে এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছে, সেখানে শিক্ষকরা চাইলেও ভালোভাবে দায়িত্ব পালন করার পরিবেশ পান না। অনেক সময় অসম্মানিত হতে হয় তাদের। হল ব্যবস্থাপনাসহ সব জায়গায় তারা হস্তক্ষেপ করে। ফলে কাজ করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন শিক্ষকরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন আবাসিক শিক্ষক বলেন, আমরা হলে শিক্ষার্থীদের কাছে যেতে চাই কিন্তু সে ধরনের কোনো পরিবেশ নেই। আমরা কোনো রোল প্লে করতে পারি না। অনেক সময় অসম্মানিত হতে হয়। উল্টো আমাদেরই ম্যানেজ করে চলতে হয়। যার ফলে আস্তে আস্তে আগ্রহটা হারিয়ে যায়। হলের বৈধ প্রশাসনের পাশাপাশি ছায়া প্রশাসন (ছাত্রলীগ) আছে। অনেক সময় তাদের সঙ্গে আমরা পেরে উঠি না। এটাই হচ্ছে বাস্তবতা তবে এই সংস্কৃতির পরিবর্তন হওয়া জরুরি। এভাবে একটি হল চলতে পারে না।

শিক্ষার্থীরা জানান, হলের আবাসন ব্যবস্থাপনায় হল প্রশাসনের কোনো ভূমিকা নেই। হলে কারা উঠবেন, তা ঠিক করে দেন ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের নেতারা। তাই রাজনীতি না করলে থাকার সুযোগও হারান অনেকেই। আবাসিক শিক্ষকরা এতে কোনো ভূমিকা রাখেন না। পড়াশোনার পরিবেশ, খাবারের মান এসব বিষয়ে কোনো ধরনের তদারকি করেন না তারা। হলের কর্মসূচি কিংবা কোনো ঘটনা ঘটলে, তবেই কেবল দেখা যায় আবাসিক শিক্ষকদের। বিজয় একাত্তর হলের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার ব্লকের আবাসিক শিক্ষক কে, সেটা এখনো জানা নেই আমার। কখনো খোঁজখবর নিতেও দেখিনি। আবাসিক শিক্ষকরা আন্তরিক ভূমিকা রাখলে আমাদের অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যেত।’

তবে এক দশক আগেও ছিল ভিন্ন চিত্র। আবাসিক হলে শিক্ষকরা নিয়মিত মতবিনিময় সভার আয়োজন, ব্লক ভিজিট করতেন এবং পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জীবনমান উন্নয়নে আবাসিক শিক্ষকরা দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতেন। শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে আবাসিক শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন আহমেদ। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘আমরা যখন হাউজ টিউটর ছিলাম, তখন সপ্তাহে অন্তত দুইবার ব্লক ভিজিট করতাম। শিক্ষার্থীদের সুবিধা-অসুবিধা জানতাম। তাদের সঙ্গে আন্তরিক একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। তাদের যেকোনো সমস্যা আমাদের বলত। তবে এ জায়গাটা দিন দিন গ্যাপ হয়ে যাচ্ছে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন সূত্রে পাওয়া নির্দেশনায় দেখা যায়, হলগুলোতে আবাসিক শিক্ষকরা সপ্তাহে অন্তত দুদিন নিজ নিজ ব্লক বা ফ্লোরের শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন মেটানোর লক্ষ্যে অফিসে অবস্থান করবেন, সপ্তাহে অন্তত এক দিন নিজ নিজ ফ্লোর বা ব্লক পরিদর্শন করবেন। মাসে অন্তত একবার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করবেন, কক্ষভিত্তিক হালনাগাদ তালিকা সংরক্ষণ করা এবং মাসে অন্তত একবার আবাসিক শিক্ষকদের একযোগে গ্রুপ ভিজিট করার নির্দেশনা রয়েছে।

যেসব শিক্ষক এসব নির্দেশনা অমান্য করবেন কিংবা দায়িত্ব পালনে অনীহা প্রকাশ করবেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ইতিমধ্যে দুয়েকজন শিক্ষককে অব্যাহতিও দেওয়া হয়েছে বলে জানা যায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি হলের প্রভোস্ট দেশ রূপান্তরকে বলেন, হাউজ টিউটরদের দায়িত্ব অবহেলার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন বর্তমান উপাচার্য। প্রভোস্ট কমিটির মিটিংয়ে কড়া নির্দেশনাও দিয়েছেন। আগামীতে দায়িত্বে অবহেলা করলে সরাসরি হয়তো অব্যাহতি দেওয়া হতে পারে।

বিজয় একাত্তর হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. আব্দুল বাছির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের যেসব হাউজ টিউটর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ইন্টারেকশন করে না, তাদের প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দেশনা হচ্ছে এ ধরনের হাউজ টিউটর থাকার দরকার নেই। যারা শিক্ষার্থীদের সময় দেয় এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি আন্তরিক তারাই দায়িত্বে থাকবেন। এ ধরনের একটি মৌখিক নির্দেশনা আছে।’

জগন্নাথ হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মিহির লাল সাহা বলেন, ‘এটা প্রভোস্টের দায়বদ্ধতার মধ্যেও পড়ে। যতটুকু সম্ভব আমাদের সম্মানিত হাউজ টিউটরদের দায়িত্ব পালন করা উচিত। সপ্তাহে দুদিন বসা, ভিজিট করা, শিক্ষার্থীদের সমস্যা দেখা এবং সমাধান করা আমাদের আবাসিক শিক্ষকদের দায়িত্ব। তাহলে শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে বুস্টআপ হবে। আমাদের মিটিংয়েও বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।’

প্রভোস্ট স্ট্যান্ডিং কমিটির আহ্বায়ক ও সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মো. ইকবাল রউফ মামুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উপাচার্য আবাসিক শিক্ষকদের দায়িত্ব পালনের বিষয়ে বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়েছেন। সপ্তাহে অন্তত দুদিন অফিস এবং ব্লক ভিজিট করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আশাকরি আমাদের আবাসিক শিক্ষকরা এখন থেকে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের সার্বিক খোঁজখবর রাখবেন।’

 তবে এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে মন্তব্য করতে রাজি হননি উপাচার্য অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত